একুশের যত প্রথম

একুশের ইতিহাস :

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায় ভারত আর পাকিস্তান। ভারতের সাথে দেশ ভাগের পর ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুধু মাত্র ধর্মীয় সংখ্যা গরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। সংষ্কৃতি,ভাষা, শিক্ষা, আচার আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে অমিল থাকার কারণে দুই প্রদেশের জনগণকে একই কাতারে কল্পনা করা যাচ্ছিলো না। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও সিভিল সার্ভিস, মিলিটারী ও গুরত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রীয় পদে তাদের আধিপত্য বেশী ছিল। ক্রমে তারা নিজেদের শাসনকর্তা ও বাঙ্গালীদের প্রজা ভাবতে শুরু করলেন।

এতোকিছু করেও ক্ষ্যান্ত হননি তারা। নব গঠিত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তারা উর্দূ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে থাকে। এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে ঢাকায় “তমদ্দুন মজলিশের” সেক্রেটারী অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে এক প্রতিবাদ সভা ও র‍্যালি বের করা হয়। সভায় বাংলাকে উর্দূর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা করার দাবী করা হয়। এবং এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ এর ডিসেম্বর মাসে “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয়। এভাবে চলতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার শীতল যুদ্ধ।

পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন আত্নকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারনে আবারো সোচ্চার হয়ে উঠে বাঙ্গালী। ফলে ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবীতে পুনরায় মিছিল করা হয়। মিছিল করার অপরাধে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবর রহমান, কাজী গোলাম মাহাবুব, অলি আহাদ, শওকত আলী, সামসুল হকসহ অনেকে।



২১শে মার্চ, ১৯৪৮ সাল। ঢাকার রেসর্কোস ময়দান তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দৃঢ় ভাষায় ঘোষনা করেন “উর্দূ, এবং উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”। এমন ঘোষণায় আবারো সোচ্চার হয়ে উঠে সমগ্র বাংলা। মায়ের মুখের ভাষা ছেড়ে অন্যভাষায় কথা বলার প্রশ্নই আসেনা।

এভাবে অতিবাহিত হয় আরও ৪ বছর।

২৭শে জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের নব নিযুক্ত গর্ভণর জেনারেল খাজা নাজিম উদ্দিন ঢাকায় এসে পুনঃরায় ঘোষনা দেন “উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”। এই ঘোষনা শুনার পর আবার গর্জে উঠে বাঙ্গালী জাতি, প্রতিবাদে জ্বলে উঠে সারা বাংলা। ২১শে ফেব্রুয়ারী সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ র্কতৃক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল। সকাল হতে না হতেই  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হতে লাগলো ছাত্র জনতা। পাকিস্তান সরকার ঐ দিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা ঘোষনা করেন। একসময় সমবেত ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন এবং গাজীউল হকের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সবাই মিছিল নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মিছিল যখন ঢাকা মেডিক্যালের কাছাকাছি আসে তখন শুরু হয় পুলিশের এলোপাতাড়ি গোলাগুলি।

গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রফিক, জব্বার, সালাম ও বরকত। বুলেটের আঘাতে রফিকের মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে জব্বার ও বরকত ঐ দিন রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়নে। আহত অবস্থায় ২৫শে ফেব্রুয়ারী রাতে মারা যান সালাম।

এই ২১শে ফেব্রুয়ারী বর্তমানে প্রতি বছর আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পৃথিবীর সব দেশে একযোগে পালিত হয়। ১৭ই নভেম্বর, ১৯৯৯ সালে ইউনোস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারীকে ‘আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা’ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্ব এই দিবসটিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু করেন।

আজ আমরা যে ভাষায় কথা বলছি, যে ভাষায় গান গাইছি, যে ভাষাকে ভালোবাসছি, যে ভাষায় কথা বলা আমাদের আত্মতৃপ্তি দান করছে, সেই ভাষা আমরা পেয়েছি কিছু আত্মত্যাগী মানুষের জন্যে। বিনম্র শ্রদ্ধাভরে আমরা স্মরণ করছি তাদের। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমরা সবাই কমবেশি জানি। আজকে আমরা জানবো ভাষা আন্দোলনে যতোসব প্রথম :

একুশের প্রথম ভাষা শহীদ

একুশের প্রথম ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ। মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি। ঘটনার সময় শহীদ রফিকের বয়স ছিলো২৬ বছর। ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গনে পুলিশ গুলি চালালে সেই গুলি রফিকউদ্দিনের মাথায় লাগে। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রথম শহীদ মিনার
প্রথম শহীদ মিনার হয়েছিলো রাজশাহীতে। ১৯৫২ সালের ২২ই ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা এবং ২৩শে ফেব্রুয়ারি তারিখ দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন এলাকায় এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাইদ হায়দার। এর দৈর্ঘ্য ছিলো দশ ফিট এবং প্রস্থ ছয় ফিট। এই মিনারটি উদ্বোধন করেন ভাষা শহীদ সফিউর রহমানের পিতা মৌলভী মাহাবুবুর রহমান। কিন্তু পরে পাকিস্তানি আর্মি-পুলিশরা এই মিনারটি ভেঙ্গে ফেলে।

ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার
২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাক হোস্টেলের ১২নং গেটের সামনে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সম্মিলিত শ্রমে নির্মিত হয়েছিল প্রথম শহীদ মিনার।এর নকশাকার ছিলেন ডা. বদরুল আলম।

প্রথম শহীদ দিবস

১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ দিবস এই দিনে প্রথমবারের মতো পালন করা হয় শহীদ দিবস। দীর্ঘ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় সেদিন। শোভাযাত্রীরা শোকজ্ঞাপক কালো ব্যাজ,কালো পতাকা ধারণ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে অগ্রসর হতে থাকে। সেবারই প্রথম উৎযাপিত হয় শহীদ দিবস।

 

প্রথম লিফলেট

ভাষা আন্দোলনের প্রথম লিফলেট প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি বর্ষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।  গুলি বর্ষণের অল্প কিছুক্ষণ পরই হাসান হাফিজুর রহমান, আমীর আলীসহ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টোদিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যান। সেখানে গিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটের খসড়া তৈরি করেন। দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই লিফলেটটি ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়। হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসেন। প্রায় দুই/তিন হাজার লিফলেট ছাপানো হয়েছিল। উৎসাহী ছাত্ররাই এ লিফলেটগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। আশেপাশের সমগ্র এলাকায় পৌঁছে যায় লিফলেটগুলো।


প্রথম কবিতা
১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে প্রথম কবিতা রচনা করেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। নাম ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’।  পাকিস্তান সরকার সে কবিতা বাজেয়াপ্ত করল। হুলিয়া জারি হলো মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ওপর। তিনি এবং তাঁর কবিতা হয়ে গেল ইতিহাসের অংশ। ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি- একুশের প্রথম কবিতা।

প্রথম গান
একুশের গান হিসেবে অধিক সমাদৃত “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গানটি।তবে এটি একুশের প্রথম গান নয়। ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম গানটির প্রথম চরণ ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’। যার রচয়িতা ভাষা সৈনিক আ ন ম গাজিউল হক। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আর্মানিটোলা ময়দানের জনসভায় গানটি গাওয়া হয়।

প্রথম গল্প
১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা হত্যার পর রচিত একুশের প্রথম গল্পের নাম ‘মৌন নয়ন’। গল্পটির রচয়িতা বিশিষ্ট কবি ও কথাশিল্পী শওকত ওসমান। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ গ্রন্থে গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

প্রথম সংকলন

১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে একুশের প্রথম সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম কৃতী পুরুষ কবি হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকাশক ছিলেন অন্যতম ভাষাসৈনিক মুহাম্মদ সুলতান। পুঁথিপত্র প্রকাশনার মাধ্যমে প্রকাশিত এই সংকলনের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আমিনুল ইসলাম। রেখাচিত্র এঁকেছিলেন মর্তুজা বশীর। সংকলনটি পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষ ছাপা হয়। এই সংকলনে স্থান পেয়েছিল একুশের প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, গান, নকশা ও ইতিহাস।

প্রথম নাটক
মুনির চৌধুরী এবং তার রচিত নাটক ‘কবর’ এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বিরল। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ ’৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন মুনির চৌধুরী, রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেক লেখক- সাংবাদিক। মুনীর চৌধুরী ’৫৩ সালে জেলে বসেই কবর নাটকটি রচনা করেন । ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি, রাত ১০টায় জেলকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর হ্যারিকেনের আলো- আঁধারিতে মঞ্চস্থ হয় কবর।

প্রথম উপন্যাস
একুশের প্রথম উপন্যাস জহির রায়হান রচিত ‘আরেক ফাল্গুন’। শহীদ দিবস পালন, শহীদ মিনার নির্মাণ ভাষা আন্দোলনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয় এই উপন্যাসে। ৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার মাত্র তিন মাস পর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে রচিত হয় এই উপন্যাসটি।

প্রথম সিনেমা
একুশের চেতনা নিয়ে প্রথম নির্মিত সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে জহির রায়হান সিনেমাটি পরিচালনা করেন। সিনেমাটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তিতে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে সিনেমাটি।

প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘের ১৮৮টি দেশ একসঙ্গে প্রথম ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। এর আগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে  দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রস্তাবটির খসড়া পেশ করে। বাংলাদেশকে সমর্থন জানায় ২৭টি দেশ।

অমর একুশে আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব।

বিশ্বের কোন দেশের মানুষ মাতৃভাষার জন্য এভাবে আন্দোলন করেনি, অকাতরে প্রাণ দেয়নি।সে অবস্থান থেকে বাংলাভাষার একটি বিশেষ স্থান আছে এবং সবসময় থাকবে। বাঙ্গালি হিসেবে আমাদের উচিত ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।আসুন আজকের এই দিনে আমরা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করি।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Sultana Trisha

Sultana Rajia Trisha is having her graduation on Business Administration at Noakhali Science and Technology University. She believes in practicing writings as her passion and exploring new people and places.
Sultana Trisha
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?