ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন – গবেষণা পদ্ধতির এক অব্যর্থ হাতিয়ার

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

গবেষণা একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। গবেষণা করার ক্ষেত্রে গভীরভাবে পড়ার পাশাপাশি তথ্য উপাত্তও সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষত সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করার প্রয়োজনীয়তা বেশি।  এই তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করার একটি উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন।

এজন্যই নিয়ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করার বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার পর একটা ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল।

নিয়ন একদিন তার বন্ধু তাকিকে বললো, “বুঝলি তাকি, একটা ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করা লাগবে। নাহলে গবেষণা আগাচ্ছে না।”

তাকি বললো, “ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে আসলে কী হয়?”

নিয়নঃ “একটি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে সাধারণত আট-দশজন আলোচক এবং একজন মডারেটর থাকেন। অনেক সময় মডারেটরের সাথে একজন সহযোগীও থাকেন। ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে কোন একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের মতামত গ্রহণ করা।”

১। যথাযথ পরিকল্পনা করাঃ

  • লক্ষ্য সুনির্দিষ্টকরণঃ

তাকি বললো, “আচ্ছা, তাহলে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন শুরু করার আগে তো বিস্তারিত পরিকল্পনা করে রাখতে হয়।”

নিয়নঃ “হ্যাঁ, সেটা অবশ্যই করতে হয়।”

তাকিঃ “তুই তো সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফল নিয়ে আলোচনা করতে চাস। এখন ধর, আলোচনার সময় কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। তখন কী হবে?”

নিয়নঃ “ফোকাস গ্রুপ আলোচকদের বৈচিত্র্যময় মতামত জানার একটি উৎকৃষ্ট সুযোগ। আলোচনা যদি একইসাথে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়, তাহলে ফোকাস গ্রুপের মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না। এজন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা হওয়া দরকার। তাই, এরকম কিছু যেন না হয়, সেজন্য আগেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিতে হবে।”

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

 

  • টার্গেট অডিয়েন্স ঠিক করাঃ

তাকিঃ “আচ্ছা, বুঝলাম। এই ফোকাস গ্রুপে কারা অংশ নেয়?”

নিয়নঃ “ফোকাস গ্রুপ এবং গবেষণাটি কাদেরকে নিয়ে করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। যদি গবেষণাটি সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে হয়, তাহলে সাধারণত তরুণ-তরুণীরা টার্গেট অডিয়েন্সের অংশ হবে। এক্ষেত্রে তাদের নিয়েই আলোচনাটি হবে।”

  • কন্ট্রোল গ্রুপের ব্যবস্থা রাখাঃ

তাকিঃ “ধর, তরুণ-তরুণীদের মাঝে তুই এক ধরণের ব্যবহার দেখলি। কিন্তু এখন তো সব বয়সী মানুষই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। তাদের মতামত তো তুই জানতে পারছিস না।”

নিয়নঃ “আমার গবেষণার টার্গেট অডিয়েন্স যেহেতু তরুণ-তরুণীরা, সেহেতু আমার সবার মতামত না জানলেও চলবে। তবে একের অধিক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের আয়োজন করা গেলে একটি আলোচনা মূল টার্গেট অডিয়েন্স নিয়ে করে অপরটিতে সাধারণ মতামতের একটা চিত্র পাওয়া যায়। এর ফলে টার্গেট অডিয়েন্স আর সাধারণ মানুষের মতামতের পার্থক্যও বোঝা যায়।”

  • ফোকাস গ্রুপের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকাঃ

তাকিঃ “ধর, ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের সময় মানুষ তর্ক করতে শুরু করলো। সেক্ষেত্রে তো মডারেটরকে চেষ্টা করতে হবে যেন সবাই একমত হয়?”

নিয়নঃ “না, না। ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের লক্ষ্য ঐক্যমতে পৌঁছানো নয়। এটার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে ভিন্ন ভিন্ন মত সম্বন্ধে জানা। তাই, সবাইকেঐক্যমতেনিয়েআসারকোনপ্রয়োজননেই।

তাকিঃ “ফোকাস গ্রুপে যেহেতু এত কম মানুষ থাকে, তাহলে তো তুই এখান থেকে কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাচ্ছিস না?”

নিয়নঃ “না, পাচ্ছি না। এখান থেকে মূলত গুণগত তথ্য পাওয়া যায়, পরিমাণগত তথ্যের জন্য  ফোকাস গ্রুপ কোনভাবেই উপযুক্ত না। সেজন্য জরিপ চালাতে হয়।”

  • সহযোগী নিয়োগ দেওয়াঃ

তাকিঃ “ফোকাস গ্রুপ একা একা চালানো তোর জন্য কঠিন হয়ে যাবে না?”

নিয়নঃ “হ্যাঁ, ফোকাস গ্রুপে মডারেটরের অনেক কাজ থাকে। সেক্ষেত্রে একজন সহকারী যদি আলোচনার নোট নেয় এবং রেকর্ডারটার দায়িত্ব নেয়, তাহলে মডারেটরের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।”

তাকিঃ “তাহলে, তোর ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে আমিই সহকারী হতে চাই।”

নিয়নঃ “বাহ! অসংখ্য ধন্যবাদ, বন্ধু! তাহলে ডিসকাশনের সময় কিছু জিনিস মাথায় রাখিস। তুই আলোচনায় সরাসরি অংশ নিবি না। কারণ, সেক্ষেত্রে দেখা যাবে যে মডারেটরের পক্ষে আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া, তুই আলোচনায় অংশ নিলে আলোচকদের থেকে তোর দিকে বেশি ফোকাস পড়বে।”

তাকিঃ “আচ্ছা, এগুলো মাথায় রাখব। আর কী কী করতে হয় সহকারীর?”

নিয়নঃ “আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই একজন সহকারীর নিজের পরিচয় দিয়ে নেওয়া উচিত। তাহলে, আলোচকরা সহকারীকে দেখে আর অস্বস্তি বোধ করবে না। আলোচকদের সুবিধার জন্য আলোচনার সময় রুমে কাজ নেই এমন কারো রুমে থাকা উচিত হবে না।”

  • আরামদায়ক জায়গা এবং উপযুক্ত রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করাঃ

তাকিঃ “ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন নিশ্চয়ই নিরিবিলি একটা জায়গায় করা উচিত?”

নিয়নঃ “হ্যাঁ, এমন একটা জায়গায় আলোচনাটা করতে হবে যেখানে আলোচকরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে মার্কেট রিসার্চের জন্য অনেক সময় রেকর্ডিং করা হয়। তবে কোন স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে ভিডিও করার চেয়ে অডিও রেকর্ড করলে আলোচকরা খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকেন। আলোচনার সময় সবাই গোল হয়ে বসলে আলোচকরা নিজেদের সমকক্ষ মনে করেন। তাই, গোল টেবিলে বসে আলোচনা করা সমীচীন।”

  • প্রশ্ন প্রস্তুত করাঃ

তাকিঃ “ধর, তুই জিজ্ঞেস করলি, ‘আপনার কি মনে হয় আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটান?’ সেক্ষেত্রে আলোচক একটা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তর দিয়েই আলোচনা শেষ করে দিবে। ফোকাস গ্রুপের লক্ষ্য তো এভাবে অর্জন করতে পারবি না।”

নিয়নঃ “এজন্য প্রশ্নগুলো এমনভাবে করতে হবে যার উত্তরে আলোচকরা তাদের মতামত বিস্তারিত বলবে। এক্ষেত্রে দুটো বিপরীত মতের মধ্যে কোনটির সাথে আলোচকরা একমত, সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়। যেমন, ‘আপনার মতে সোশ্যাল মিডিয়ার কী উপকারিতা বেশি নাকি অপকারিতা বেশি?’”

তাকিঃ “একটা গবেষণার কাজে তো অনেক কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ ধরণের শব্দ ব্যবহার করে প্রশ্ন করলে কি আলোচকরা বুঝবে?”

নিয়নঃ “না, বুঝবে না। এজন্য প্রশ্ন খুব সহজ ভাষায় ছোট করে করতে হবে। যে সকল প্রশ্ন করলে আলোচকরা বিব্রত হতে পারেন, সে ধরণের প্রশ্ন থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে, আলোচকরা ভালোমত উত্তর দিতে পারবেন।”

আর নয় ইংরেজি ভীতি!
দেখে নাও ইংরেজির অতি পরিচিত ভুলগুলো নিয়ে বানানো ভিডিওর ২য় পর্ব।  

 

তাকিঃ “আচ্ছা, আলোচনার শুরুতেই কি কঠিন কঠিন প্রশ্ন করা শুরু করে দিবি?”

নিয়নঃ “না, প্রথমে কিছু সহজ প্রশ্ন করে শুরু করতে হয়। তাহলে, আলোচকদেরও বিষয়টা নিয়ে কথা বলার জড়তা কেটে যায়। যেমন, প্রথমে জিজ্ঞেস করতে পারি, ‘আপনাদের কি সোশ্যাল মিডিয়া আইডি আছে?’ এরপর জিজ্ঞেস করতে পারি, ‘কোন কোন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের আইডি আছে?’ আস্তে আস্তে আলোচনার মূল প্রশ্নগুলোর দিকে জোর দিতে হবে। আলোচনার শেষে আলোচকদের জিজ্ঞেস করতে হবে তারা আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে আর কিছু বলতে চায় কবি  না।”

  • যথাযথভাবে তথ্য সংরক্ষণ করাঃ

তাকিঃ “আলোচনার শেষে তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করবি?”

নিয়নঃ “রেকর্ডিং থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য এক্সেল স্প্রেডশীটে রেকর্ড করবো। কারণ, এক্সেল স্প্রেডশীটে উত্তরগুলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করতে পারবো। পরবর্তীতে সেখান থেকে একই ধরণের উত্তর কয়টি পাওয়া গেল, সেটা বোঝা যাবে। তাছাড়া, কোন বিষয়ের উল্লেখযোগ্য উক্তি খুঁজে পাওয়াও অনেক সহজ হবে।”

২। অংশগ্রহণকারী জোগাড় করাঃ

এমন সময় নিয়ন আর তাকিকে ডাক দিল রাফি।

রাফিঃ “এই নিয়ন, তাকি। এদিকে আয়।”

নিয়ন আর তাকি দেখল রাফি একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানের সামনে গেল।

রাফিঃ “এই তাকি, চা খাওয়া।”

তাকিঃ “ঠিক আছে, কিন্তু এরপরের দিন তুই খাওয়াবি। মামা, তিনটা মাল্টোভা চা দিয়েন।”

রাফিঃ “তারপর, কী খবর তোদের?”

নিয়নঃ “খবর ভালোই। তাকির সাথে আমার ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন নিয়ে আলোচনা করছিলাম।”

  • বিজ্ঞপ্তি দেওয়াঃ

রাফিঃ “আচ্ছা, তোর ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের জন্য আলোচক কোথা থেকে পাবি?”

নিয়নঃ “আলোচক পাওয়ার জন্য একটা বিজ্ঞপ্তি তৈরি করেছি। সেখানে ফোকাস গ্রুপের লক্ষ্য, তারিখ এবং সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। এসব ক্ষেত্রে টার্গেট অডিয়েন্সের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করে দেওয়া উচিত। তাহলে, উপযুক্ত আলোচক পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।”

  • সঠিক জায়গায় বিজ্ঞপ্তিগুলো প্রচার করাঃ

রাফিঃ “বিজ্ঞপ্তিগুলা কোথায় কোথায় লাগাচ্ছিস?”

নিয়নঃ “আমার গবেষণার টার্গেট অডিয়েন্স যেহেতু তরুণ সমাজ, এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডগুলোতে লাগাচ্ছি। কারণ, এখান থেকেই আমি উপযুক্ত অডিয়েন্স পেতে পারি। সামনে কিছু স্কুল-কলেজেও লাগাবো।”

  • মানুষকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করাঃ

তাকিঃ “আচ্ছা, এই আলোচনায় মানুষ আসবে কেন? এমনি এমনি তো কারো আসার কথা না।”

নিয়নঃ “মানুষকে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরণের উপহার, সম্মানী, নাস্তার ব্যবস্থা রাখাসহ বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে হয়। আমার পক্ষে হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করা ছাড়া অন্য কিছু করা আসলে সম্ভব নয়। তাই, আমি বিজ্ঞপ্তিতে হালকা নাস্তার ব্যবস্থার কথাই বলেছি।”

  • ছয়-দশজন নিয়ে আলোচনা করাঃ

রাফিঃ “ফোকাস গ্রুপে কয়জন থাকবে আসলে?”

নিয়নঃ “ছয়-দশজন থাকাই শ্রেয়। তাহলে, বিভিন্ন ধরণের মতামত পাওয়া যায়। আবার, গ্রুপটা এত বড়ও নয় যে কেউ কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করবে। সাধারণত ১০-২০% মানুষ আলোচনায় শেষ পর্যন্ত আসবে না। আবার কোন কারণে দশজন থেকে বেশি মানুষ হয়ে গেলেও সমস্যা। এজন্য আট-দশজনকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।”

  • আলোচনার সময় এবং স্থান নির্ধারণ করাঃ

রাফিঃ “কবে করবি আলোচনা?”

নিয়নঃ “এখনো ঠিক করিনি। আগে বিজ্ঞপ্তিগুলো দেই, দেখি কয়জন রাজি হয়। তারপর সবার সুবিধা অনুযায়ী সময় এবং স্থান ঠিক করে আলোচনার দুইদিন আগে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে। সেখানে তাদেরকে অংশ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে স্থান, তারিখ, সময়, নাস্তার ব্যবস্থার কথা, সবই আরেকবার বলে দিতে হবে। এখন যেতে হবে, বুঝলি? বাসায় গিয়ে সব ঠিকঠাক করব।”

রাফিঃ “আচ্ছা, যা। আলোচনা কেমন হল, বলিস।”

৩। ফোকাস গ্রুপ পরিচালনা করাঃ

নিয়ন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আটজন আলোচক পেল। তাদের নিয়ে ওর বিভাগের সেমিনার রুমে তাকিকে সঙ্গে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা শুরু করল। আলোচনা শুরু হবে দুপুর ১২ টায়, সবাই এগারটা পঁয়তাল্লিশের মাঝেই এসে গেছে। ফলে, আলোচনার আগের কাজগুলো করার জন্য ওরা যথেষ্ট সময় পাবে।

  • অনাপত্তি পত্রে সই নেওয়াঃ

প্রথমেই নিয়ন আলোচকদের বলল, “আমরা আজকের ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কুফল নিয়ে আলোচনা করব। আমার সাথে রয়েছে তাকি, ও আলোচনায় অংশ নেবে না। তবে পুরো আলোচনার নোট নেবে এবং রেকর্ড করবে। আলোচনাটি রেকর্ড করার জন্য আপনাদের অনুমতি প্রয়োজন। অনাপত্তি পত্রে আলোচনার বিষয়ে এবং রেকর্ডিং কেন করা হবে, তা বিস্তারিত লেখা আছে। আপনারা একটু লেখাটা পড়ে সই করে দেবেন দয়া করে।”

আলোচকরা লেখাটা পড়ে সই করে দিলেন। এরপর নিয়ন বলল, “এবার আপনাদের নাম, বয়স, পেশা প্রভৃতি তথ্য সংরক্ষণের জন্য আমরা একটি ছোট ফর্ম রেখেছি। পূরণ করতে ২-৩ মিনিটের বেশি লাগবে না। আপনারা একটু দয়া করে ফর্মটি পূরণ করে দিন।”

  • একে অপরের সাথে পরিচিত হওয়াঃ

নিয়নঃ “মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগে আমরা সকলে একে অপরের সাথে পরিচিত হলে আলোচনা আরো প্রাণবন্ত হবে। আমিই শুরু করছি। আমি শিহাব হাসান নিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি।”

এরপর একে একে সকলে নিজের পরিচয় দিল।

  • আলোচনার লক্ষ্য তুলে ধরাঃ

নিয়নঃ “আমাদের আজকের আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের কুফল সম্বন্ধে তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে, সে বিষয়ে একটি গুণগত ধারণা পাওয়া। তবে এক্ষেত্রে আসলে কোন সঠিক বা ভুল উত্তর নেই। আমরা মানুষের মতামতটা জানতে চাচ্ছি। সেক্ষেত্রে কেউ যদি মনে করে সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নেই, সেটিও বলতে পারেন। সব ধরণের মতামত তুলে নিয়ে আসাটাই আজকের লক্ষ্য।”

  • প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচনা এগিয়ে নেওয়াঃ

নিয়ন জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের কী কখনো মনে হয় যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকা সত্ত্বেও আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে আছেন?”

আলোচক ১-“হ্যাঁ।”

আলোচক ২-“প্রায়ই মনে হয়।”

আলোচক ৩-“এরকম সবারই হয়।”

নিয়ন দেখল যে সবাই খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে, ভালো মতামত পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়টার ওপরেই আরও কিছুক্ষণ আলোচনা চালাতে হবে। আনুষঙ্গিক কিছু প্রশ্ন করা যাক এই বিষয়ে! ও বলল, “যখন দেখেন যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে উঠতে পারছেন না। তখন কী করেন?”

আলোচক ২-“আমি কিছুদিন আগে আমার মোবাইলে কিছু অ্যাপ নামিয়েছি সময় নষ্ট করা কমাতে। সেই অ্যাপগুলোর কারণে বেশ উপকার হচ্ছে। কাজের সময় অ্যাপ চালু করে রাখি, চাইলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকতে পারি না।”

নিয়নঃ “অন্য কেউ কি এরকম অ্যাপ নামিয়ে উপকৃত হয়েছেন?”

আলোচক ১-“আমি নামিয়েছিলাম কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তবুও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থেকেছি।”

আলোচক ৪-“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিজের ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি না থাকলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকা কঠিন।”

নিয়নের মনে হল এই বিষয়ে যথেষ্ট মতামত পাওয়া গেছে। এবার বিষয়টার একটা সারমর্ম দিয়ে অন্য প্রশ্নে চলে যেতে হবে। নিয়নঃ “তাহলে, সবাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট করেন। কেউ কেউ অ্যাপ ব্যবহার করে সময় অপচয় করা কমিয়েছেন কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাপ কোন কাজেই আসেনি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিজের ইচ্ছাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়েও মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে।”

  • নিরপেক্ষ থাকাঃ

নিয়নের নিজের রাতের ঘুম কমে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে। অহেতুক ফেসবুক ব্রাউজ করতে করতে ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়। তাই ওর একটা প্রশ্ন ছিল, “আপনার কি মনে হয় না সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে রাতে আপনার ঘুম আরও ভালো হত?”

কিন্তু এখন প্রশ্নটা দেখে নিয়নের মনে হল প্রশ্নটা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের ক্ষেত্রে মডারেটর হিসেবে নিয়নকে সবসময় নিরপেক্ষ থাকতে হবে। এজন্য নিয়ন অন্যভাবে প্রশ্ন করল, “সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কী আপনাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে কোন পরিবর্তন এসেছে?”

আলোচক ৭-“এসেছে। এখন ঘুমাতে যেতে অনেক দেরি হয়।”

আলোচক ৮-“হ্যাঁ, আমারও ঘুমাতে যেতে অনেক দেরি হয়। আর ঘুমাতে দেরি হয় দেখে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হয়।”

নিয়ন খেয়াল করল যে আলোচক ৫ কোন কথাই বলছে না। সবাই যেন কথা বলে, এটা নিশ্চিত করাও একজন মডারেটরের কর্তব্য। এজন্য ও তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার রুটিনেও কি কোন পরিবর্তন এসেছে?”

আলোচক ৫-“আমার রুটিনে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। কারণ, আমার বহু আগে থেকেই ইনসোমনিয়া ছিল। আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকতাম না, এখন থাকি, পার্থক্য শুধু এটুকুই।”

  • আলোচনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে না দেওয়া এবং ঝগড়া নিয়ন্ত্রণ করাঃ

আলোচনার এ পর্যায়ে হঠাৎ করেই ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।

আলোচক ১-“না, না। আমারও ইনসোমনিয়া আছে। তবুও আমার রুটিনেও ঠিকই পরিবর্তন এসেছে। আগে দিনের মধ্যে ৩-৪ ঘণ্টা পড়তাম, এখন ১ ঘণ্টা পড়ার সময়ও পাই না। আপনি ভুল বলছেন!”

আলোচক ৫-“আপনার রুটিনে পরিবর্তন আসতেই পারে কিন্তু আমার রুটিনে পরিবর্তন আসেনি। আমি সোশ্যাল মিডিয়া এত বেশি ব্যবহার করি না।”

আলোচক ১-“নিজেকে অনেক বেশি মহান ভাবেন, না? ঠিকই সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকেন, এখানে স্বীকার করছেন না!”

আলোচক ৫-“আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন? ভদ্রভাবে কথা বলুন!”

আলোচনায় এভাবে ঝগড়া শুরু হয়ে গেলে অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে। নিয়ন তাই ব্যাপারটা সামাল দিতে বিষয় পরিবর্তন করল।

নিয়নঃ “আচ্ছা, এবার পরবর্তী প্রশ্নে যাওয়া যাক। আপনাদের বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা আসলে কী?”

  • সব বিষয় লিপিবদ্ধ করাঃ

তাকি আলোচনার সব কিছু টেপ রেকর্ডার দিয়ে রেকর্ড করছে এবং সাথে সাথে নোট নিচ্ছে। সে নোট নেয়ার সময় সকলের অঙ্গভঙ্গির দিকেও লক্ষ্য রাখছে।

  • আলোচনা দীর্ঘ না করাঃ

নিয়ন খেয়াল করল যে আলোচনার এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এজন্য ও বলল, “আমরা আমাদের আলোচনার প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আলোচনার শুরুতেই বলেছিলাম আমরা এক ঘণ্টা আলোচনা করব। দেখতে দেখতে কীভাবে এক ঘণ্টা কেটে গেল, টেরও পেলাম না! আজকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলের বিষয়ে অনেক ধরণের মতামত পেয়েছি। এই মতামত পরবর্তীতে আমার গবেষণার সিদ্ধান্ত নির্ধারণে কাজে আসবে। আপনাদের সকলকে আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।”

  • আলোচকদের প্রতিক্রিয়া জানাঃ

নিয়নঃ “ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন নিয়ে আপনাদের প্রতিক্রিয়া জানা প্রয়োজন। আপনাদের প্রতিক্রিয়া পরবর্তী ডিসকাশনগুলোকে আরও ফলপ্রসূ করতে সাহায্য করবে। তাকি আপনাদের ফর্মগুলো দিচ্ছে, বের হবার আগে অনুগ্রহ করে সেগুলো একটু পূরণ করে যাবেন।”

  • পুনরায় আয়োজন করাঃ

তাকিঃ “রেকর্ডারে আজকের আলোচনাকে গ্রুপ ১ নাম দিয়ে আজকের তারিখ আর সময় দিয়ে সেভ করে রাখলাম।”

নিয়নঃ “ঠিক আছে। সামনে আরও কয়েকটা ফোকাস গ্রুপ আয়োজন করতে হবে, বুঝলি?”

তাকিঃ “কেন? আজকে তো আলোচনা ভালো হল।”

নিয়নঃ “হ্যাঁ, কিন্তু বারবার এ ধরণের আয়োজন করলে বিভিন্ন ধরণের মতামত পাওয়া যাবে। যতক্ষণ নতুন মতামত পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন গ্রুপ নিয়ে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করা উচিত।”


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?