চোখের চশমাটা আবিষ্কারের ইতিহাস

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

ছোটবেলা কিংবা বড়বেলা – কখনো যদি চোখের ডাক্তার দেখিয়ে থাকো তাহলে নিশ্চয়ই জেনে থাকবে যে চোখের ডাক্তারের কাছে যাওয়া মানে নির্দিষ্ট পাওয়ারের একটা চশমার কার্ড ধরিয়ে দেয়া! আর তোমাকেও কিনে নিতে হবে ঐ পাওয়ারের একটা চশমা। কারও কাছে বিষয়টা একটু বিরক্তির আবার কারও কাছে একটু মজাদার। বিরক্তির এই ভেবে যে নাকের উপর এখন থেকে কাঁচের তৈরি আলাদা একটা বস্তু থাকবে যা কিনা আবার দুই কানের সাথে লাগানো থাকে।

আচ্ছা, কখনো কি মনে হয় না, “কিভাবে এলো অদ্ভুত আবার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই চশমা?”

চলো তো একটু জেনে নেয়ার চেষ্টা করি!

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!



চশমা আবিষ্কারের ইতিহাস :

চশমা আবিষ্কারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। সেই প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার চিত্রিত প্রমাণ, হায়ারোগ্লিফিকসে মানুষের চশমার ব্যবহার আবিষ্কার করেছেন ইতিহাসবিদেরা। সাধারণত কোনো জিনিসকে পরিষ্কার দেখার জন্য ওই সময় বিভিন্ন ধরনের কাচের প্রচলন ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য চোখে কাচের ব্যবহারের লিখিত প্রমাণ রয়েছে। রোমান সম্রাট নিরোর একজন শিক্ষক ওই সময়ের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনার সঙ্গে দূরের জিনিস পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য জলমিশ্রিত এক ধরনের কাঁচ চোখে লাগানোর কথা বলেছেন। রোমান গ্ল্যাডিয়েটরসদের লড়াই উপভোগ করতে গিয়ে নিজের আসনে বসে রোমান সম্রাট নিরো বিশেষ কাঁচ চোখে লাগাতেন।

 

বর্তমানে UK এর অন্যতম একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি হলো NERO GLASS DESIGN (নিরো গ্লাস ডিজাইন)।



মানুষ প্রথমে কাঁচ আবিষ্কার করে, তারপর লেন্স। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালের মানুষ কাঁচের লেন্স ব্যবহার করতো বিবর্ধক হিসেবে, আগুন জ্বালাতে।

চল স্বপ্ন ছুঁই!

 

সত্যিকারের চশমা বলতে আমরা যা বুঝি, তা প্রথম দ্বাদশ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইতালিতে প্রচলিত হয়। ওই সময় চোখে আতশী কাচ লাগিয়ে ছোট জিনিসকে দৃষ্টিসীমায় নিয়ে আসার জন্য চোখে চশমা ব্যবহার করার নজির রয়েছে ইতিহাসে।

১২৮০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে প্রথম চোখের চশমা আবিষ্কার করেন আলেস্যান্দ্রো ডেল্লা স্পিনা এবং স্যালভিনো ডেলগি আরমাটি। পিসার হেলানো মন্দিরের কথা শুনেছো কেউ? স্পিনা সেই পিসা অঞ্চলের লোক ছিলেন। স্পিনা চশমা বানিয়ে নিজেও ব্যবহার করেছেন, মানুষকেও ব্যবহার করতে দিয়েছেন।


আরমাটি আলোর প্রতিসরন বা রিফ্রাকশান নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এতে তার চোখে কিছুটা সমস্যা হয়। তিনি এক পর্যায়ে আবিষ্কার করেন দুই খন্ড কনভেক্স লেন্স বা উত্তল লেন্সের ভিতর দিয়ে তাকালে বেশ ভালো ভাবে দেখা যায়।


উত্তল লেন্স বস্তুর আকার বিবর্ধিত করে দেখতে সাহায্য করে। তিনি ক্ষীনদৃষ্টির চিকিৎসায় উত্তল লেন্স ব্যবহার করতে পরামর্শ দিতে শুরু করলেন। ১৪০০ সালের দিকে ক্ষীনদৃষ্টির চিকিৎসায় উত্তল লেন্স পুরোদমে ব্যবহার হতে লাগলো। পোপ দশম লিও চশমা পরিধান করতেন। ১৫১৭ সালে রাফালেলের আঁকা প্রতিকৃতিকে দেখা যায় পোপ লিও দশমের চোখে চশমা।

প্রথম দিকে কোয়ার্টজ কাঁচকে ঘষে উজ্জ্বল করে চোখের চশমা তৈরী করা হত। ষোড়শ শতাব্দীতে কাঁচশিল্পে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। ফলে চশমা শিল্পেও তার হাওয়া লাগে। সাধারন কাঁচ থেকে চশমা তৈরী শুরু হলো। আর কাঁচ তৈরী হয় বালি থেকে। বাংলাদেশের বালিতে প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকায় ভালোমানের কাঁচ উৎপাদন সম্ভব নয়। আয়রনের কারণে উৎপাদিত কাঁচ নীলচে রঙ ধারন করে। চট্টগ্রামের ওসমানি গ্লাস ইন্ডাসট্রিতে চাঁদপুরের বালি ব্যবহার করে কাঁচ উৎপাদন করা হয়। বাকি কোম্পানীগুলো চীন থেকে কাঁচ শিল্পের কাঁচামাল, বালি আমদানি করে থাকেন।


আচ্ছা, চশমা নিয়েই তো সব! তাহলে সানগ্লাস কী? কালো চশমা-ই বা আবার আলাদা নামকরণ কেন?

সানগ্লাসের বাংলা নাম রোদচশমা। যদিও বাংলাটা আমাদের তেমন ব্যবহার করা হয় না! রোদচশমা নামটা শুনে প্রথমেই রোদে পরার জন্য যে চশমা ব্যবহার করা হয় তাকেই সানগ্লাস বা রোদচশমা বলা হয়, এটা মনে হলেও বিষয়টা তা নয়। রোদকে আটকানোর জন্য রোদচশমার প্রচলন হয়নি। একটি বিশেষ কারণেই চৈনিক নির্মাতারা ধোঁয়াচ্ছন্ন লেন্সের চশমা প্রথম তৈরী করেন। ১৩০০ সালের দিকে এই চশমা প্রথম তৈরী করা হয়। চোখের দৃষ্টির ত্রুটি অথবা রোদ প্রতিহত করতে নয় চীনের বিচারালয়ের জজ সাহেবদের চোখের দৃষ্টিকে আড়াল করতে এই চশমা ব্যবহার করা হয়।
১৯৩০ সালে ফস্টার গ্রান্ট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ফস্টার আটলান্টিক সিটিতে ফস্টার গ্রান্ট সানগ্লাসের প্রথম জোড়া বিক্রি করেন।

সত্তর দশকে হলিউড তারকারা রোদচশমা ব্যবহারের জন্য রীতিমত বিখ্যাত ছিলেন।

রোদচশমা বা সানগ্লাস, যা-ই বলি না কেন রোদ না থাকলেও কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করি; নাইটগ্লাস নাম দিয়ে।

কালো চশমা :

এই কালো চশমা বস্তুটা আমার ধারণা আমরা সকলেই সবচেয়ে বেশি দেখেছি বডিগার্ডদের চোখে। প্রশ্ন আসে যে কেন ওরা প্রায় সবসময়ই এটা পরে থাকে! শুধু স্মার্টনেসের জন্য কিন্তু তারা এই চশমা ব্যবহার করে না বরং এর সাথে রয়েছে অনেক সুবিধা। এই চশমা যেমন তাদের মুখের ভাব লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে তেমনি অজানা লোককেও খুঁজে পেতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। চোখে ধুলাবালি ঢুকে যাওয়া থেকে তো রক্ষা করেই! তাছাড়া কালো চশমা পরিধানকারী লোকটি কখন কার দিকে তাকিয়ে আছে তা অপরাধীরা বুঝতে পারে না। যে কারণে অপরাধীদের শনাক্ত করা বা সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া বডিগার্ডদের পক্ষে সুবিধা হয়।
চোখকে বাইরের ধুলাবালি কিংবা আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চোখের সমস্যা দূর করতে – চশমার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। তাই চোখের চশমাটা উত্তল লেন্সের হোক কিংবা অবতল লেন্সের, রোদচশমা হোক বা কালো চশমা; যেভাবেই হোক, প্রিয় চশমা যত্নে এবং সাথে থাকুক সবসময়।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?