কভার লেটার লেখার সময় যে জিনিসগুলো মাথায় রাখা উচিত

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

কভার লেটার! চাকরির আবেদনের জন্য পাঠানো সিভির সাথে যে জিনিসটা অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে, তা হচ্ছে এই কভার লেটার। দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, অনেকেরই কভার লেটার সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর আবেদনকারী কভার লেটার ছাড়াই তার সিভি পাঠিয়ে থাকেন! অথচ আপনার কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেতে হলে শুধু একটি সিভি জমা দিলেই হবে না, জমা দেয়া সিভির সাথে একটি চমৎকার কভার লেটারও থাকতে হবে। কেননা যে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিয়োগকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। কভার লেটার পড়ার মাধ্যমে নিয়োগকর্তা আবেদনকারীর সকল যোগ্যতা এক দৃষ্টিতে দেখতে পারেন, যা আবেদনকারীর ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তাই নিয়োগকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সুন্দর একটি কভার লেটার লেখা একটু বেশিই জরুরি।

বেশিরভাগ আবেদনকারী ইন্টার্ভিউয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় শুধু মনোযোগের অভাবে। সিভি এবং কভার লেটার মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুত না করার কারণে নিয়োগকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হতে হয়, ফলে আবেদনের পর প্রত্যাখ্যাত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কাজেই, কভার লেটারের খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর রাখা দরকার। বিশেষ করে, চাকরিদাতার চোখ দিয়ে সবকিছু মূল্যায়ন করলে বিষয়টা অনুধাবন করা সহজ হয়।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

কভার লেটার লেখা যথেষ্ট বিচক্ষণতার কাজ। এমনকি অভিজ্ঞ পেশাদারদের জন্যও ভালো কভার লেটার লেখা খুব চ্যালেঞ্জিং। কভার লেটারকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও আকর্ষণীয় করার জন্য কিছু বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার। সেগুলো নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

১. ভালো মতো গরু খুঁজুন

গরু খোঁজার কথা পড়েই চমকে চমকে উঠছেন তো? কভার লেটারের সঙ্গে গরু খোঁজার কী সম্পর্ক?

আছে, আছে! গরু খোঁজা, অর্থাৎ গবেষণা করা একটি ভালো কভার লেটার লেখার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কভার লেটার লেখার আগে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে সিভি দিচ্ছেন সে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। ঐ প্রতিষ্ঠানের কাজ, চাকরি প্রত্যাশী ও প্রতিযোগীদের ধরন ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন। এর প্রতিটি তথ্য হয়তো আপনি কভার লেটার এ লিখতে পারবেন না, কিন্তু যদি ঐ প্রতিষ্ঠানের কাজ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনার সম্যক জ্ঞান থাকে, তবে

 আপনার জন্য একটি উন্নত মানের কভার লেটার লেখা সহজ হবে।

২. সম্বোধনে সাবধান!

কভার লেটারে সম্বোধন করার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। চাকরির আবেদনপত্র যিনি দেখাশোনা করছেন, আপনি যদি তাকেই সম্বোধন করে কভার লেটার লেখেন, তাহলে তাকে অভিভূত করা বা বাগে আনা অনেক সহজ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আপনি যে কাঙ্ক্ষিত কোম্পানিতে চাকরি করার ব্যাপারে আসলেই আগ্রহী, তা প্রকাশ পাবে আপনার কভার লেটারে লেখা এবং উপস্থাপনের প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমেই।

এখন অনেকটাজ সহজ হয়ে গেছে সম্বোধন/বরাবর/টু লেখার ব্যাপারটা- কেননা এখন অনেক কোম্পানিই উল্লেখ করে দেয়, কার কাছে কভার লেটার পাঠাতে হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ওই কোম্পানির এইচআর তথা মানবসম্পদ বিভাগকেও ফোন করে বিনয়ের সাথে জেনে নেয়া যেতে পারে, বরাবর লেখার নির্দিষ্ট নাম, পদবি বা সংশ্লিষ্ট পরিচয়। অথবা ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়েও দেখা যেতে পারে। তাতে আপনি কিছুটা তথ্যসমৃদ্ধও হবেন বৈকি। একেবারেই কোনো তথ্য না পেলে Dear Hiring Manager লিখে কভার লেটার পাঠানো যেতে পারে। তবে Dear Sir লেখাটা আজকাল বড্ড পুরনো ফ্যাশনের হয়ে গেছে, তাই এড়িয়ে চলাই ভালো।

৩. লেখালেখির সাতকাহন

প্রথমেই আপনার কভার লেটার লেখার উদ্দেশ্য তা পরিষ্কার করবেন। আপনি কোথা থেকে চাকরির বিজ্ঞপ্তিটি পেয়েছেন, তা উল্লেখ করলে আরও ভালো হবে।
এরপর আপনি কেন এ চাকরির জন্য যথার্থ তা লিখুন সংক্ষেপে। এ অংশে আপনার দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে লিখুন।
তারপর আপনি যে ম প্রতিষ্ঠানে চাকরির সিভি দিতে বা চাকরি নিতে চাচ্ছেন, সে প্রতিষ্ঠানে চাকরি হলে, আপনি প্রতিষ্ঠানটির জন্য কী কী ভালো সুযোগ-সুবিধা এনে দিতে পারবেন তা সম্পর্কে জানান। আপনার চাকরিতে যোগদান একইসাথে ক্যারিয়ারের লক্ষ্য এবং এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তা কীভাবে সম্পৃক্ত তা তুলে ধরুন।
এককথায়, চাকরিদাতা যেন আপনার কভার লেটার পড়েই কল করতে বাধ্য হয়, তেমন কিছু ইতিবাচক কথা এখানে ব্যবহার করুন।

৪. “সে আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছে”

বাব্বাহ! শিরোনাম দেখেই ঘাবড়ে গেছেন? এরকম উদ্ভট শব্দের ব্যবহার দেখে বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে মনে মনে আমাকে গালমন্দ করছেন তো?

প্রপঞ্চ শব্দের অর্থ প্রতারণা বা ছলনা। “সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে” বা “সে আমার সঙ্গে ছলনা করেছে” – এই দুটো বাক্য পড়ার সময় আমাদের কারোই বিরক্তি আসে না, বরং প্রতারণা করার কারণ জানতে আগ্রহ জাগে। কেননা প্রতারণা বা ছলনা জাতীয় শব্দের সাথে আমরা পরিচিত। অথচ “সে আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছে” শুনলেই কেমন রাগ লাগে, কারণ শব্দটা বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা। অর্থাৎ, আমরা সবসময় প্রচলিত শব্দ পড়তেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, দুর্বোধ্য শব্দ কেবলই বিরক্তি বাড়ায়।

কথায় বলে, MUN is fun!

বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি কম্পিটিশানের নাম MUN বা Model United Nations।

আপনার কভার লেটার যিনি পড়বেন, তার ক্ষেত্রেও কিন্তু একই কথাই প্রযোজ্য! আপনার কভার লেটার যত সহজ ভাষায় লেখা হবে, তত ক্লান্তিহীন ভাবে তিনি আপনার কভার লেটার পড়বেন।

কাজেই, শব্দ বাহুল্য এবং ঝরঝরে গদ্যের ধরন কভার লেটারের জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনার শব্দ ভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ তা প্রদর্শনের জায়গা কভার লেটার নয়। উচ্চমার্গীয় শব্দ ব্যবহার এবং কথার বাহুল্য আপনার দাম্ভিকতা প্রকাশ করে, যা আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে।

আপনি কেমন শব্দ ব্যবহার করছেন তার উপর ভিত্তি করে নিয়োগকর্তা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করে থাকেন। ভুলে গেলে চলবে না আপনি চাকরিদাতা নয়, চাকরিপ্রার্থী। কোনো কিছু প্রার্থনা কখনো দাম্ভিকতা দিয়ে প্রকাশ করতে নেই।
সুতরাং সিভির কভার লেটার লেখার সময় সবচেয়ে সহজ শব্দ ব্যবহার করে অকপটে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করুন, যা নিয়োগকর্তার সাথে আপনার যোগাযোগ সহজ করে দিবে। এমন শব্দ ব্যবহার করুন যার মধ্য দিয়ে আপনার বিনয়ী, নম্রতা এবং প্রার্থিতা প্রকাশ পায়।

৫. কর্মসংস্থান গ্যাপ এবং ক্যারিয়ার পরিবর্তনের ব্যাখ্যা
প্রচলিত একটা গল্প বলে শুরু করা যাক।

এক জুতা কোম্পানি একবার তাদের মার্কেটিং ম্যানেজার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিলো। সব রকমের প্রক্রিয়া শেষে দুজন লোককে বাছাই করা হলো, যাদের থেকে যে কোনো একজনকে নিয়োগ দেয়া হবে।

এবার তাদের মধ্যে যোগ্য প্রার্থীকে বাছাই করতে একটি গ্রামে গিয়ে পণ্যের বাজার সম্পর্কে মতামত জানাতে বলা হলো।

গ্রামটি থেকে ফিরে এলে তাদের কাছে মতামত চাওয়া হলো। তাদের একজন বললো, সেই গ্রামে জুতার কোনো বাজারই নেই, কারণ পাঁচ হাজার লোকের কেউ জুতা পরে না।

অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে উত্তর দিলো, সেই গ্রামে জুতার বিপুল বাজার, ব্যাপক সম্ভাবনা। কেননা পাঁচ হাজার লোকের কেউই জুতা পরে না!

বলতে পারবেন, এদের মধ্যে কাকে চাকরি দেয়া উচিত?

কর্মজীবনে আপনার নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যে কোনো কারনে দু-এক বছর চাকরি শূন্য থাকতে পারেন। এটা কোনো ভাবেই আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। এমনকি এই শূন্যতা নতুন চাকরির জন্য আপনাকে অযোগ্যও করে তোলে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং এই গ্যাপ আপনার জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনে।
তবে এই সব কিছু নির্ভর করে কর্মজীবনের এই শূন্যতা আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করছেন তার উপর। অর্থাৎ কর্মজীবনের শূন্যতার যথাযথ ব্যাখ্যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঐতিহ্যগত সিভি ফরম্যাটে এই ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য কোনো জায়গা নেই। সুতরাং আপনার সিভির কভার লেটার হতে পারে সংক্ষিপ্ত এই ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। কাজেই সিভির কভার লেটারে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরুন আপনার সমস্যার কথা।

আপনার আবেদনে যদি ক্যারিয়ার পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তবে তারও যথাযথ ব্যাখ্যা দিন। যেমন আপনি হয়তো দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাকরি করেছেন। সুতরাং এই ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা বিস্তর। কিন্তু এখন যেখানে আবেদন করেছেন তাতে আপনি বিপণন জগতে প্রবেশ করতে চাইছেন। এই ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কারণ নিজ থেকেই আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
আপনার অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলুন। আপনার বর্তমান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরুন। আপনার অতীত অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে মার্কেটিং জগতে ভূমিকা রাখতে পারে তাও বলার চেষ্টা করুন।

৬. ভুল করেও যেন ভুল না হয়!

কভার লেটারের ভাষা যেন সহজবোধ্য ও সুস্পষ্ট হয়। ব্যকরণ ও বানানরীতিতে যেন ভুল না থাকে। গার্ডিয়ান জবসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৩% আবেদনকারীর আবেদন বাতিল হয়ে যায় শুধু বানান ভুল থাকার কারণে। কাজেই এ ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য।

ভেবে দেখুন নিয়োগকর্তা আপনাকে এখনও চোখে দেখেননি, তার কাছে এখন পর্যন্ত আপনার সার্বিক যোগ্যতার একমাত্র দলিল আপনার সিভি। সুতরাং আপনার সিভি এবং কভার লেটারে যদি ভুল থাকে তাহলে নিয়োগকর্তা আপনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন!

৭. বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়!

বৃক্ষের পরিচয় তার ফলে হলেও, চাকরির আবেদনের কভার লেটারে আপনাকে নিজের নামটা স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করতে হবে। আর যাই হোক, আপনি একটা জলজ্যান্ত মানুষ, বৃক্ষ নন মোটেও, সেটা ভুলে গেলে চলবে কেন?

কভার লেটারের শেষে যদি আপনি আপনার নাম বা সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ না করেন তাহলে সেটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই আপনার কভার লেটারের শেষ লাইনের নিচে আপনার নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচয় অবশ্যই দেবেন। অনলাইনে অনেক রকমের সিগনেচার জেনারেটর পাওয়া যায়, চাইলে সেগুলোও ব্যবহার করতে পারেন। এতে আপনার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠবে।

কভার লেটার লেখাটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ; আর নির্ভুল, সুন্দর এবং সুচারুভাবে তা সম্পন্ন করাতেই এর সার্থকতা। তাই কভার লেটার লেখার সময় উপরে বলা কথাগুলো ভুলে গেলে চলবে না মোটেও!

 


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Tazrian Alam Ayaz

মনে-প্রাণে এবং ঘ্রাণে একজন লেখক। কলমের শক্তিতে দেশটাকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।
পৃথিবীর অলি-গলি-তস্যগলি পর্যন্ত ঘুরে দেখার ইচ্ছে নিয়ে দিন কাটছে। ভালোই তো কাটছে!
Tazrian Alam Ayaz
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?