সফল যারা কেমন তারা পর্ব-১৪

তাহসিন জাকারিয়া বাংলাদেশের একজন সফল মানব সম্পদ কর্মকর্তা এবং উদ্যোক্তা। গত এক দশক ধরে তিনি বিভিন্ন দেশিয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ বিভাগে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দক্ষতার সাথে কাজ করে এসেছেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে ন্যাশনাল এইচ আর স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন (OD), পি এম এস, পলিসি তৈরি এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন এর অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয় গুলোতে তার রয়েছে হাতে কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি তিনি খ্যাতনামা এইচ আর কনসালটেন্সি ফার্ম “স্কীলউইজ” এর লিড কনসালটেন্ট এবং এইচ আর ফোরাম চট্টগ্রাম এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

মানব সম্পদ বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে মূল্যবান মতামত জানিয়েছেন তাহসিন জাকারিয়া । সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন কর্পোরেট আস্ক এর সিইও ও রিজুমে ডেভলপমেন্ট স্পেশালিষ্ট নিয়াজ আহমেদ-

নিয়াজ আহমেদ-একজন মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে কাকে সার্ভিস দেওয়াটা আপনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন? মালিক পক্ষকে নাকি কর্মজীবীদের?

তাহসিন জাকারিয়া-একজন মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে আমি প্রতিষ্ঠানকে সার্ভিস দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। আর প্রতিষ্ঠান মালিকপক্ষ এবং কর্মজীবীদের উভয়কে নিয়েই গড়ে উঠে। মনে রাখতে হবে মালিক এবং শ্রমিক একে অপরের প্রতিপক্ষ নন, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক।

নিয়াজ আহমেদ-দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে আপনি কিভাবে পার্থক্য করবেন? কিভাবে দেশীয় কোম্পানি গুলোতে বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ম ও কালচার গড়ে তোলা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

তাহসিন জাকারিয়া-আগে দেখতে হবে বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ম ও কালচার একটি দেশীয় কোম্পানির উৎপাদন ক্ষমতা ও ধারাবাহিকতায় কতটুকু ভূমিকা রাখছে। বহুজাতিক হলেই যে ভালো হবে তা কিন্তু নয়। আমাদের দেশীয় অনেক কোম্পানিতেও বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে ভালো কালচার ও কর্মপরিবেশ গড়ে উঠেছে। মনে রাখতে হবে একটি কোম্পানির কালচার এতে চাকুরীরত কর্মজীবী ও মালিক পক্ষের সামস্টিক চিন্তা ভাবনা, বিশ্বাস ও সদিচ্ছার সমষ্টি।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

নিয়াজ আহমেদ- “বর্তমানে বিদেশ থেকে প্রায় দুই লাখ লোক এদেশে এসে কাজ করছে। ৩০০ টির বেশি কোম্পানিতে তারা কাজ করছে এবং নিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বেতন। অথচ আমাদের দেশের লাখো যুবক বেকার।” – তাহলে কি আমাদের দক্ষ মানব সম্পদ নেই?

তাহসিন জাকারিয়া- হ্যাঁ এবং না। এটা নির্ভর করছে আমরা কোন স্তরের কর্মীর কথা বলছি এবং কোন ধরনের কাজগুলোতে বিদেশি কর্মীদের আধিক্য দেখতে পাচ্ছি সেটার উপর। বিশ্বায়নের এই যুগে অনেক কারনেই একটি কম্পানি বা একটি রাষ্ট্র তার জব মার্কেট বিদেশি কর্মীদের জন্য খুলে রাখতে বাধ্য হয়। আমরাও এর বাতিক্রম নই। তবে আমাদের নজর দিতে হবে যাতে আমাদের দেশের কর্মীরাও যথাযথ দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করে বাইরের দেশগুলোতে নিজেদের জব পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এছাড়া আমাদের নিজেদের সাবলীল ভাবে উপস্থাপনায় কিছু ঘাটতি আছে। আমরা কি কাজ করি, সেটা আমাদের সিভিতে সাবলীলভাবে তুলে ধরতে পারি না। তবে এখন অবশ্য দেশের অনেক প্রফেশনাল রাইটাররা এটা নিয়ে কাজ করছে।আমি তাদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

নিয়াজ আহমেদ-দেশের বেকার সমস্যার কারন কি? উদ্যোক্তার অভাব, যোগ্যতার অভাব, নাকি চাকরীর অভাব?

তাহসিন জাকারিয়া- -আমার মনে হয় এত মোটা দাগে এরকম একটি জটিল বিষয়ে আমরা সরাসরি সিধান্তে পৌছতে পারি না। আমরা দক্ষ মানবশক্তির অভাবে এদেশ থেকে যেমন একসময় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলে যেতে দেখেছি, আবার চাকুরীর অভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের দেশের বাইরে চলে যেতেও দেখেছি। দক্ষ ব্যক্তি বলতে যা বোঝায় তা ঠিক করবে বাজার। বাজারে দক্ষতার কাটতি ও কদর দুটোই আছে, অভাব যা আছে তা এটা সমন্বয়ের। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আমাদের চাকুরীর বাজারের রয়েছে বিশাল গ্যাপ।

নিয়াজ আহমেদ-একজন লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি কোন কোন দিকে বিশেষ নজর দেন?

তাহসিন জাকারিয়া- একজন  মানব সম্পদ বিভাগের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে সেখানকার সমস্যা গুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি আবার পেয়েছি এমন কিছু সহকর্মী যাদের ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করে তলার মতো তীব্র মানসিকতা। আজকের দিনে প্রত্যেক কর্মীকেই তার নিজ নিজ ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তার মত ভাবনা চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমি শুধু কর্মীই খুজি না, আমি কর্মীর মাঝে একজন উদ্যোক্তাকেও খুজি।  

 
চল স্বপ্ন ছুঁই!
 

 

নিয়াজ আহমেদ- “সুপারিশ ছাড়া চাকরি হয় না”, নতুনদের অনেকেরই এই ধারনা।। আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি এটাকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

তাহসিন জাকারিয়া- -একজন মানব সম্পদ বিভাগের পরামর্শক হিসেবে যখন আমাদের রিক্রুটমেন্ট, সিলেকশান এবং পে রোল নিয়ে কাজ করতে হয় তখন আমরা একজন কর্মীর অতীতের অর্জন সমূহ বিশ্লেষণ করি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা গুলো সেটার সাথে যুক্ত করে সিদ্ধান্তে উপনিত হই।। সেখত্রে কখনোই কারো সুপারিশকে প্রাধান্য দেই না।

নিয়াজ আহমেদ-ইন্টার্ভিউ নেয়ার সময় ক্যান্ডিডেটদের কি কি সমস্যা আপানার চোখে পড়ে?

তাহসিন জাকারিয়া- -পারফরমেন্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং কে পি আই কনসালটেন্ট হিসেবে আমি দেখেছি কোম্পানিতে অনেক মানুষ অসন্তুষটি নিয়ে কাজ করেন। অনেকে আছেন নিজের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারে মনযোগী না হয়েই বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে কর্মস্থলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেন। এই ধরনের ক্যান্ডিডেট ইন্টার্ভিউ দিতে এসে প্রায়ই ঘাবড়ে যান এবং পূর্বের কোম্পানিগুলোর বাজে অভিজ্ঞতা শেয়ার এর অন্তরালে নিজের দুর্বলতাগুলোকে তুলে ধরেন।

নিয়াজ আহমেদ-কর্ম জীবনে প্রবেশের পূর্বে কিভাবে নিজেকে আমরা প্রস্তুত করতে পারি?

তাহসিন জাকারিয়া- আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।। সে জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি পাঠ্যক্রম বহির্ভূত বিভিন্ন সামাজিক ও খন্ডকালীন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আর স্বপ্ন দেখা কখনোই বন্ধ করা যাবে না, স্বপ্নটা অর্জন করার জন্য যা করা দরকার (জ্ঞানার্জন, দক্ষতার উন্নয়ন কিংবা অভ্যাসের পরিবর্তন) তা সময় শেষ হওয়ার পূর্বেই সম্পাদন করতে হবে।

নিয়াজ আহমেদ-মানব সম্পদ বিভাগে কাজ করার আনন্দ ও চ্যালেঞ্জটা কোথায়?

তাহসিন জাকারিয়া- মানব সম্পদ বিভাগে কাজ করার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হল আপনি সরাসরি আপনার সিদ্ধান্ত ও কাজের প্রতিফলন সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানের উপরে কি প্রভাব ফেলছে তা দেখতে পাবেন। এইচ আর এর যে পর্যায়ই আপনি চাকুরী করেন না কেন, আপনার কর্ম ও দক্ষতার প্রভাব পড়বে প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ে এবং সর্বোপরি ঐ প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদের উপরে। এটি একই সাথে যেমন একটি আনন্দের বিষয়, সেই সাথে চ্যালেঞ্জিংও বটে।

নিয়াজ আহমেদ-দক্ষ মানব সম্পদ প্রফেশনাল হতে হলে কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে?

তাহসিন জাকারিয়া- পেশাগত ও ব্যক্তিগত দু পর্যায়ই মানব সম্পদ উন্নয়নে আমি কাজ করছি। পেশাগতভাবে জাতিসংঘের একজন কনসালটেন্ট হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাকে সাপোর্ট দিতে হয়। এছাড়াও আমরা “স্কীলউইজ” থেকে মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম আয়োজন করে থাকি। দেশে দক্ষ মানব সম্পদ প্রফেশনাল তৈরি করার নিমিত্তে স্কীলউইজ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এইচ আর এর সর্বোচ্ছ প্রফেশনাল সার্টিফিকেশন এস পি এইচ আর-আই (SPHRi) এর এক্সাম প্রিপারেশন কোর্স চালু করেছে। এছাড়াও এইচ আর এর উপরে দক্ষতা বাড়াতে হলে লেবার ল ভালো করে জানতে হবে। এইচ আর এর উপরে ছোটো খাটো ট্রেনিং অথবা শর্ট কোর্স আপনার জ্ঞান পিপাসা আরো বাড়িয়ে দেবে।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?