পড়ার সময় অন্য সব চিন্তা দূর করার জাদুকরী টিপস

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

আমার ছোট ভাই ঈশান কলেজে পড়ে। আজকাল তাকে প্রায়ই সামনে বই খুলে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকতে দেখি। একদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে তার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম সে পড়ায় মগ্ন। নিঃশব্দে কাছে গিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করলাম। সামনে বায়োলজি বই খুলে সে মূর্তির মতো বসে আছে। তার চোখের মণি অনড়, দৃষ্টি স্থির বইয়ের কোনো একটা শব্দের উপর। আমি কাশি দিতেই সে চমকে উঠলো। হেসে বললাম, “শুনলাম সেই সন্ধ্যা থেকে পড়ছো। মানে প্রায় চার ঘণ্টা টানা। বাহ! কী কী পড়লে বলো দেখি”।

আমার প্রশ্ন শুনে সে ইতস্তত বোধ করতে লাগলো। হঠাৎ কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো, “ভাইয়া, আমার পড়া হয় না! কেন যে এমন হয়। আমি সন্ধ্যা থেকেই বই নিয়ে বসে আছি ঠিকই, কিন্তু কিছুই পড়ি নাই। চুপচাপ বসে ছিলাম কেবল।”

আমি ঈশানের কাঁধে হাত রেখে সহজ গলায় বললাম, “না, তুমি শুধু বসে ছিলে না। নিশ্চয়ই সারাক্ষণ কিছু না কিছু চিন্তা করেছো, স্বীকার করো বা না করো, আমি জানি।”

সে বিনা বাক্য ব্যয়ে তা স্বীকার করে নিলো। তারপর আমি তাকে বললাম:

১। মুখে উচ্চারণ করে পড়

মনে মনে পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করো। মনে মনে পড়ার সময় তুমি কখন যে অন্য চিন্তার সাগরে ডুব দেবে তা টেরও পাবে না। কিন্তু মুখে উচ্চারণ করে বা শব্দ করে পড়লে অন্য চিন্তা করামাত্রই তোমার পড়ার শব্দ থেমে যাবে, ফলে সহজেই বুঝতে পারবে কখন তুমি বিচ্ছিন্ন হচ্ছো।

অপরদিকে, আমাদের ব্রেইনের দেখা স্মৃতির তুলনায় শোনা স্মৃতি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা বেশি। মনে মনে পড়লে তাই তা মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী হয় আর শব্দ করে পড়লে একইসাথে দেখা ও শোনা হওয়ায় তা ভালোভাবে মাথায় ঢোকে।

২। রিডিং পড়ার সময় মাঝে মাঝে দৃষ্টি সরাও

মানুষ তার সাবকনশ্যাস মাইন্ড বা অবচেতন মনে কিছু কিছু কাজ করতে পারে। যেমন ধরো তুমি শব্দ করেই অনর্গল রিডিং পড়ে যাচ্ছো অথচ তোমার মস্তিষ্কে সেগুলো পৌঁছাচ্ছে না, তুমি একইসাথে অন্য কোনোকিছু চিন্তা করছো।

এজন্য রিডিং পড়ার সময় প্রায়ই দৃষ্টি বইয়ের পাতা থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরাবে। যে বাক্যটা এইমাত্র পড়লে বা বুঝলে সাথে সাথে তা না দেখে বলবে। তাহলে ঐ অবচেতন মনে রিডিং পড়া হবে না, অন্য চিন্তাও মাথায় আসার সুযোগই পাবে না।

৩। কান বন্ধ করে পড়

শুনতে আজব শোনালেও প্রকৃতপক্ষে এটি খুবই কার্যকরী। পড়ার সময় অনেক অপ্রয়োজনীয় শব্দ আমাদের শুনতে হয়। হোক সেটা সিলিং ফ্যান ঘোরা বা ঘড়ির টিকটিক করা সামান্য শব্দ থেকে শুরু করে আরও কত কী!

 
চল স্বপ্ন ছুঁই!
 

অন্য সব শব্দকে দূরে ঠেলে শুধুমাত্র তোমার উচ্চারিত পড়ার শব্দ মস্তিষ্কে পাঠানোর পদ্ধতি এটি। যা তোমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে যেখানে তুমি আর তোমার পড়া;  অন্য সব চিন্তাদের সেই জগতে প্রবেশাধিকার নেই। তাই কান বন্ধ করে পড়।

(সতর্কতাঃ  উপরের ১ ও ২ নং পদ্ধতি না মানলে কিন্তু এই পদ্ধতি জলে যাবে!)

৪। লিখে লিখে পড়

পড়ার সময় অবশ্যই সামনে খাতা কলম রাখো। যে জিনিসটা সহজে মনে থাকে না তা চট করে খাতায় লিখে ফেলো।

পড়ার থেকে লেখার সময় তুলনামূলকভাবে বেশি মনোযোগের প্রয়োজন পড়ে। ফলে মস্তিষ্ক অন্য কোনো চিন্তা করার সুযোগ পায় না।

৫। ঘরে পায়চারি করে পড়

পড়ার সময় অন্য চিন্তা আসলে ঘরে পায়চারি করতে করতে অর্থাৎ হেঁটে হেঁটে কিছুক্ষণ পড়া যেতে পারে।

৬। Brain Reminder

তোমার ব্রেইন যখন পড়ার বাইরে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করতে চায় তখন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলো। তারপর নিজের ব্রেইনকে উদ্দেশ্য করে বলো, “BE HERE NOW” অথবা নিজেকে নিজে এমন কিছু কথা বলো। (বলতে পারো- আমি এখন পড়ছি, অন্য চিন্তারা দূর হও!)

এটা কয়েকবার করলে এরপর তুমি অন্যকিছু ভাবতে যাওয়ামাত্রই তোমার ব্রেইন নিজেই সেই রিমাইন্ডার দেবে এবং অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেবে না। এটি সাইকোলজিক্যালি প্রমাণিত!

৭। পড়ার জায়গা বদলে দেখো

অসুস্থ মানুষকে যেমন চিকিৎসকরা বায়ু বদলের পরামর্শ দেন তেমনি পড়ার ক্ষেত্রেও বায়ু বদল কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় একস্থানে বসে পড়লে সেখানে যদি নানা চিন্তা আসে, সেক্ষেত্রে এক ঘর বদলে অন্য ঘরে পড়া যেতে পারে।

৮। Study Music

নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে যে, সুর দ্বারা মানুষের ব্রেইনকে প্রভাবিত করা যায়।

ছোটবেলায় যেমন ঘুমপাড়ানি গান শুনলে ঘুম চলে আসতো তেমনি কিছু সুর পড়ার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়ার টপিকে কেন্দ্রীভূত করার কাজটি করে থাকে। ফলে অন্য কোনো চিন্তা থাকে একশ’ হাত দূরে। ইউটিউবে স্টাডি মিউজিক লিখে সার্চ দিলেই এমন অসংখ্য মিউজিক পেয়ে যাবে।

৯। Stop Multitasking

মাল্টি-টাস্কিং অর্থাৎ একইসাথে একাধিক কাজ করলে কখনোই ব্রেইন সবগুলো কাজে সমান ও সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে পারে না। পড়ার সময় মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হবার একটি অন্যতম কারণ এটি।

তাই পড়ার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা তো দূরে থাক, মোবাইল কাছেই রাখা উচিত নয়। তাহলে কেউ মেসেজ দিলো কিনা, ফেসবুকে নোটিফিকেশন আসলো কিনা ইত্যাদি চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাবে। পড়ার সময় শুধুই পড়তে হবে। অন্য কোনো কাজই করবে না।

১০। জানার কৌতূহল নিয়ে পড়

Last but not the least, জানার কৌতূহল নিয়ে পড়তে হবে। তুমি যখন গল্পের বই পড় তখন তাতে এতোই মগ্ন থাকো যে অনেক সময় ডাকলেও শুনো না। কেন জানো? কারণ তুমি গল্পের বই পড়ো কৌতূহল নিয়ে, এরপর ঘটনা কোনদিকে যাবে সেটা জানার কৌতূহল তোমার মধ্যে সর্বক্ষণ কাজ করতে থাকে।  ফলে তুমি তাতে ডুবে থাকো। ঠিক একইভাবে পড়ার সময় যদি বিষয়টি জানার প্রবল কৌতূহল নিয়ে পড়ো তাহলে অন্য কোনো চিন্তা তোমার মাথায় আসবে না।

পরের দিন ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে দেখি ঈশানের ঘরের দরজা বন্ধ। দরজায় কান পেতে শুনলাম একটা মৃদু সুর ভেসে আসছে আর সেইসাথে তার পড়ার উচ্চ শব্দ। দরজায় নক করতে গিয়ে দেখি সেখানে একটা কাগজ লাগানো আর তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, “DO NOT DISTURB”।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে সাকলাইন মোরশেদ


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Ariful Hasan Shuvo

A simple human being who lives in two universes in parallel. One you see, the other one is inside his head where there's nothing but thoughts and dreams!
Currently a student of Shahjalal University of Science and Technology
Ariful Hasan Shuvo
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?