রঙে ভরা বৈশাখ!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

আমাদের সবার জীবনেই ‘প্রথম’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রথম হাঁটতে শেখা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুল, কলেজের প্রথম দিন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ।
ঠিক তেমনই বছরের প্রথম দিনটিও আমাদের জন্য খুবই আকাঙ্ক্ষিত। শুধু আকাঙ্ক্ষিত বললে ভুল হবে, বরং আনন্দঘন এবং পাশাপাশি তাৎপর্যপূর্ণ। তাই তো বছরের প্রথম দিনকে ঘিরে থাকে নানান আয়োজন। হোক সেটা ইংরেজি অথবা বাংলা। তবে বাঙালি হিসেবে বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ বা পয়লা বৈশাখ আমাদের জন্য বেশি আনন্দ বয়ে আনে। আজকে আমরা বাংলা নববর্ষ পালন সম্পর্ক জানবো।

ইতিহাস 

যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৫৭ বছর আগে ভারতবর্ষের সম্রাট বিক্রমাদিত্য প্রবর্তন করেন বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকা। তিনি হিন্দু রাজা ছিলেন। তাছাড়া হিন্দু রাষ্ট্রসমূহ এই পঞ্জিকা মেনে চলতো। তাই আন্তর্জাতিক মহলে এটি হিন্দু পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার হিসেবেও পরিচিত ছিলো। অনেকে এটিকে নেপালি ক্যালেন্ডারও বলেন। তখনকার বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকাই বর্তমানে আমাদের বাংলা পঞ্জিকা।

প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্কের আমল থেকে বাংলা সন গণনা শুরু আর তত দিনে বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের বয়স ৬৫০ বছর হয়ে গেছে। শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার একজন শাসক। তিনি বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্যকে একত্র করে ‘গৌড়’ নামের জনপদ গড়ে তোলেন। খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীতে তিনি রাজত্ব করেছেন বলে ধারণা করা হয়। কারো কারো মতে তিনি ৫৯০ হতে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন। পশ্চিম বাংলা, বর্তমান বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে ছিলো তাঁর প্রধান রাজ্য। জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বর্ষগণনা শুরু হয় ১২ এপ্রিল, সোমবার, ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দ যা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা মতে একই সালের ১৪ এপ্রিল, এবং যথারীতি সোমবার। 

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি-সহায়ক অনলাইন লাইভ এডমিশন কোচিংয়ের আয়োজন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে! চলো যাই লাইভ ক্লাসে!

তারপর নানান শাসকের হাত ধরে পাল থেকে সেন, সেন থেকে নানান চড়াই–উতরাই পেরিয়ে মুসলিম মুঘল সম্রাটদের হাতে চলে যায় ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা। মুঘলরা ক্ষমতায় এসে ইসলামিক বা আরবি পঞ্জিকা ‘হিজরী’ অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেন। 

মুঘল সম্রাট আকবর ক্ষমতায় আসেন ১৫৫৬ সালে। এর আগে মুসলিম শাসনামলে কৃষি ও ভূমিকর আদায় করা হতো ইসলামিক হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে। তিনি দেখলেন এই পদ্ধতি অনুসারে কর আদায় করতে কৃষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ হিজরী পঞ্জিকা ছিলো সৌর নির্ভর যাতে কৃষিবছর ও অর্থবছর একই সময়ে হতো না। তাই কৃষকদের অসময়ে কর পরিশোধ করতে হতো। এই সমস্যা দূর করে সহজ উপায়ে কর আদায়ের জন্য সম্রাট আকবর পঞ্জিকা সংশোধনের নির্দেশ দিলেন।

নির্দেশমত সে সময়ের বিখ্যাত পন্ডিত, রাজ জ্যোতিষী এবং সম্রাটের উপদেষ্টা আমীর ফাতেউল্লাহ সিরাজী সৌর-হিন্দু ও চান্দ্র-হিজরী পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করে নতুন পঞ্জিকা তৈরি করলেন। কর আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রচলন করা হলো নতুন বাংলা পঞ্জিকার। আর মাসগুলোর নাম রাখা হয় হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্র সম্মতভাবে।

ঘুরে আসুন: Google Keep এর ১০টি দারুণ সেবা!



নতুন বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে পরবর্তী ফসল কাটার সময় নির্ধারিত হলো যখন কৃষকেরা অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় ছিলেন। ফসল কাটার সময়কাল স্মরণে রেখে তৈরি বলে শুরুর দিকে এই ক্যালেন্ডারের নাম ছিলো ‘হারভেস্ট ক্যালেন্ডার’ বা ‘ফসলী সন’। মোঘল আমলে এই বাংলা পঞ্জিকাকে সাম্রাজ্য ব্যাপী সরকারী মর্যাদা দেয়া হয়।

বাংলা বারো মাসের নাম রাখা হয়েছে নক্ষত্রের নামে। যেমন বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ , ভাদ্র এসেছে পূর্ব ভাদ্রপদ থেকে। তেমনি 
অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মার্গ-শীর্ষ অথবা মৃগশিরা থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুন ওসেছে উত্তর ফাল্গুনী থেকে এবং সবশেষে চৈত্র এসেছে চিত্রা থেকে।

তাছাড়া দুই মাসে একটি করে মোট ছয়টি ঋতু আছে বাংলা পঞ্জিকায়। প্রথম ও দ্বিতীয় মাস অর্থাৎ বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মিলে গ্রীষ্মকাল। এরপর আষাঢ় ও শ্রাবণ মিলে হয় বর্ষাকাল। শরৎকাল থাকে  ভাদ্র ও আশ্বিন মাস জুড়ে। হেমন্তকাল যথারীতি কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মিলে। তারপর শীতকাল নামে পৌষ ও মাঘ মাস ধরে। সর্বশেষ বসন্ত থাকে ফাল্গুন চৈত্রমাস জুড়ে।

অন্যান্য ক্যালেন্ডারের মতো বাংলা ক্যালেন্ডারেও সাত দিনে এক সপ্তাহ গণনা করা হয়। সপ্তাহগুলোর নামও গ্রহ নক্ষত্রের নামে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন : শনিবার এসেছে সাটার্ন বা শনিগ্রহ থেকে রবিবার এসেছে সান বা সূর্য থেকে, সোমবার নেওয়া হয়েছে মুন বা চাঁদ থেকে, মারস্ বা মঙ্গলগ্রহ থেকে মঙ্গলবার, মারকিউরি বা বুধগ্রহ থেকে বুধবার,  বৃহস্পতিবার এসেছে জুপিটার বা বৃহস্পতিগ্রহ থেকে আর শুক্রবার নেওয়া হয়েছে ভেনাস বা শুক্রগ্রহ থেকে।

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। কৃষিকাজ ঋতু নির্ভর হওয়াতে এর সঙ্গে ঋতুর একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। 

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত সম্রাট আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করতো। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকা পরিমার্জন করেন। বছর গণনা করা হয় যথারীতি ৩৬৫ দিনে। সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৭ সেকেন্ড। এই অমিলে সমতা আনতে গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারী মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয় যাকে লীপ ইয়ার বলে। জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল বাংলা ক্যালেন্ডারে এই অতিরিক্ত লীপ ইয়ারের সাথে খাপ খাচ্ছিলো না। তাছাড়া বাংলা মাসগুলোর দৈর্ঘ্য ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। এই অসামঞ্জস্য মেটাতে বাংলা একাডেমীর প্রস্তাবনা ছিলো: 

১. বছরের প্রথম পাঁচটি মাস, বৈশাখ থেকে ভাদ্র, গঠিত হবে ৩১ দিনে।
২. বছরের বাকি সাতটি মাস, আশ্বিন থেকে চৈত্র, গঠিত হবে ৩০ দিনে।
৩. গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রতি লীপ ইয়ারে ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একদিন যোগ হবে।

বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে এই সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকাটি সরকারীভাবে গৃহীত হয়।

দেশ স্বাধীন হবার আগেকার কথা। পাকিস্তান সরকার ছিলো বাংলাবিদ্বেষী। তাদের ধারণা ছিলো বাংলা হিন্দুদের ভাষা। তাই পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের শিল্পীরা পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে সমবেত হয়ে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ এই রবীন্দ্রসংগীতটি পরিবেশন করেন। সেই থেকে ঢাকায়, রমনার বটমূলে, নববর্ষ উদ্‌যাপনের প্রথা শুরু হয়, যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে বড় শহরগুলোতে।

তারপর ১৯৭২ সালের পর থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ জাতীয় উৎসবের স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৯ সালে বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুনত্ব আসে এই উৎসবে।

ছায়ানট 
পহেলা বৈশাখ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ছায়ানটের কথা আনতেই হবে। ছায়ানট বাংলাদেশের একটি অন্যতম সংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব এর আয়োজন করা ছাড়াও এই সংগঠন বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত, নৃত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ থাকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।



১৯৬৪ সাল, বাংলা ১৩৭১ খ্রীষ্টাব্দের ১লা বৈশাখ রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে। কালক্রমে এই নববর্ষ পালন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।


ঘুরে আসুন: ছুটির দিনে শিখে ফেলো এই ৫টি জিনিস!



হালখাতা

 বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াকে হালখাতা বলা হয়। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এদিন খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া হালখাতা কার্ড এর মাধ্যমে ঐ বিশেষ দিনে দোকানে আসার নিমন্ত্রণ জানানো হয়। এই উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান।

খদ্দেররাও তাদের সামর্থ অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে হালখাতার উদ্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যেকোনো দোকানেই এটি পালন করা হয়ে থাকে।

পহেলা বৈশাখ উৎযাপন

মূলত আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উৎযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেকে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। গ্রামাঞ্চল এবং শহরাঞ্চলের বৈশাখ উৎযাপনের ধরণ ভিন্ন।

গ্রামীণ জীবনে বৈশাখ

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। মাটির দেয়ালে আঁকা হয় রঙিন সব নকশা। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে।

কোনো সমস্যায় আটকে আছো? প্রশ্ন করার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছ না? যেকোনো প্রশ্নের উত্তর পেতে চলে যাও ১০ মিনিট স্কুল ফোরামে! আমার একটি প্রশ্ন আছে

গ্রামবাংলায় বৈশাখ উৎযাপনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে বৈশাখী মেলা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত হয়ে, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রী,মাটির হাড়ি পাতিল, মাটির খেলনা, টেপা পুতুলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। আরও থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন।

তাছাড়া পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়া ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এসবের পাশাপাশি থাকে নানান ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যাতে গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। খেলার মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা, হাডুডু কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

ঢাকায় বর্ষবরণ 

আসলে নববর্ষ পালনের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে কিছু জিনিস অনেক আগের থেকে পালিত হয়ে আসছে বলে সেগুলোকে অলিখিত নিয়মই বলা চলে। ইংরেজি নববর্ষ উৎযাপন শুরু হয় রাত ১২টার পর। আর বাংলা নববর্ষ উৎযাপন শুরু হয় সূর্য ওঠার পর। তবে বাংলা নববর্ষের মূল আচার অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায় চৈত্রসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে। চৈত্র মাসের শেষ বিকেল থেকে শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুরসহ নানা এলাকায় চলে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব। আগে চৈত্রপর্ব বা চড়কপূজা হতো যা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছে। তবে এখানে এখন নীল পূজা হয়। নীল হচ্ছে মহাদেবের আরেক নাম। বেলা তিনটার সময় প্রদীপ জ্বালানো হয়। সন্ধ্যাবেলায় সেসব প্রদীপ কলাপাতার ভেলায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।


এখানেও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে হালখাতা। এদিন দোকানে বিকিকিনি হয় না। পানাহার, আনন্দ আর অভ্যর্থনায় দিন কেটে যায়।


মেলা ছাড়া বাংলা নববর্ষ কল্পনাই করা যায় না। একসময় ঢাকার সবচেয়ে বড় মেলার আসর বসত ফরিদাবাদ, ধূপখোলার মাঠ আর শ্যামপুরে। এখনো এসব এলাকায় আগের মতোই মেলা বসে। ঢাকার স্বামীবাগের কাছে লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম এলাকায়ও বসে বিশাল মেলা। গেন্ডারিয়া এলাকার ধূপখোলা ময়দানের মেলা একসময় খুব নামডাক ছিল। ধূপখোলা এখন কেবল নামেই আছে। তবে পুরোনো ঐতিহ্য ধরে এখানে মেলা বসে প্রতিবছর। প্রাচীন রীতি মেনে এখনো ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রতিবছর আয়োজন হয় পূজাপর্বের পাশাপাশি বর্ষবরণ মেলা।


বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ মানেই হলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি শুরু হয় সকাল নয়টার মধ্যে।

আর ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয় বছরের নতুন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। দিনব্যাপী পুরো রমনা উদ্যান, শাহবাগ আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে আরও নানা আয়োজন। আর বাংলা একাডেমীতে এদিন শুরু হয় মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা।

ঢাকার ধানমন্ডিতে রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চকে ঘিরেই এখন আমাদের অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বাংলা নববর্ষে রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চসহ পুরো ধানমন্ডি লেক তথা ধানমন্ডি এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। এখানেও দিনভর চলে নানান অনুষ্ঠান আর মেলা। এভাবেই শহরজুড়ে নানা আয়োজনে কেটে যায় বাংলা বছরের প্রথম দিনটি।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসব হয় ডিসি হিল পার্ককে কেন্দ্র করে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে প্রতিবছর এখানে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে গ্রামীণ পন্যের পশরা। এছাড়াও থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থা।

পার্বত্য জেলায়, আদিবাসীদের বর্ষবরণ        
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তা রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই নতুন বছরের প্রথম দিনকে ঘিরে নানান উৎসব রয়েছে। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। 

পাশাপাশি বর্তমানে তিনটি জাতিস্বত্তা একসাথে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব। বৈসাবি উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো জলকেলি।

বাংলা নববর্ষ বাঙালী জাতীয়তাবাদের পরিচায়ক। বাঙালী সংষ্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বছরের এই দিনটিতে সবাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভুলে একত্র হয়। পুরাতন যতো জরা জীর্ণতা, ব্যথা, শোক কিংবা বাঁধা থাকে সব ভুলে সবাই নতুনকে স্বাগতম জানায়।

নববর্ষ নতুন আয়োজনে সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে বাংলার আবহ বদলে দেয়। বাঙালির ভাগ্যাকাশে যেন নতুন সূর্য উদিত হয়! সেই সূর্যের আলোকছটা আশা জাগায় নতুন উদ্যমে বয়ে চলার, আশা জাগায় জাতীয় জীবনের সুখ সম্বৃদ্ধি ও কল্যাণমুখী পথের। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে নববর্ষ উৎযাপনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় বাঙালী জাতির নিজের সংষ্কৃতি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা।


পড়াশোনা সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের জন্য, সরাসরি চলে যেতে পারেন ১০ মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটে: www.10minuteschool.com

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি আপনার লেখাটি ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Sultana Trisha

Sultana Rajia Trisha is having her graduation on Business Administration at Noakhali Science and Technology University. She believes in practicing writings as her passion and exploring new people and places.
Sultana Trisha
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?