সপ্তাশ্চর্যের সাত সতেরো: আধুনিক যুগের সাত বিস্ময় (পর্ব-৪)

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

আধুনিক সভ্যতায় প্রতিনিয়ত বিস্ময়কর স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে। প্রতিদিন একটি সৃষ্টিকে যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে অন্যটি। আধুনিক কালে নির্মিত বহু উৎকৃষ্ট স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে যে বিস্ময়গুলো রয়েছে তার একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন আধুনিক যুগের সপ্তাশ্চর্যসমূহ সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে এই লেখাটি পড়তে হবে।

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথা পৃথিবীর গগনচুস্বী সুউচ্চ দালানের নাম হচ্ছে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং। এটি নিউইয়র্কের ফিফথ এভিনিউ ওয়েস্ট থার্টি ফোর্থ স্ট্রিটের মধ্যস্থলে অবস্থিত। ভবনটির উচ্চতা ৩৮১ মিটার বা ,২৫০ ফুট। ভবনটি মোট ১০৩ তলাবিশিষ্ট। পুরো স্থাপনায় এলিভেটর আছে ৭৩টি। একেবারে নিচতলা থেকে সর্বোচ্চ তলা পর্যন্ত উঠতে আপনাকে হাজার ৮৬০টি সিঁড়ি পেরিয়ে উঠতে হবে ভবনটির সর্বশেষ তলায়। পুরো বিল্ডিং নির্মাণে মোট ৫৭ হাজার টন স্টিল ব্যবহৃত হয়েছে। ৪১ বছর যাবৎ অট্টালিকাটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ভবনটির নামকরণ হয়েছে নিউইয়র্কের ডাকনাম দি এম্পায়ার স্টেট থেকে। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ প্রস্তাবিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়। এটি নির্মাণে মোট সময় লাগে বছর ৪৫ দিন। ১৯২৯ সালের শেষদিকে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৩১ সালের শুরুর দিকে তা শেষ হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপনামাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত হয়। ১৯৭১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ার নির্মাণান্তে এর মর্যাদা খর্ব হয়। সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এর হামলা পরবর্তী সময়ে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং পুণরায় নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ভবন হিসেবে নিজ স্থানে ফিরে যায়।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

তাজমহল:

তাজমহল বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যজনক নিদর্শনগুলোর একটি। প্রকৃত ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে সমগ্র বিশ্বজুড়েই এটি সুপরিচিত। তাজমহল এক নজর দেখার জন্য প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভারত ভ্রমণ করেন। অনন্য এই নিদর্শনটি তৈরি করতে ২২ বছরের বেশি সময় লেগেছে। ২০ হাজার শ্রমিক উদয়াস্ত পরিশ্রম করে মার্বেল পাথরের এই সমাধি সৌধটি নির্মাণ করেন।

মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী (বিয়ের আগে নাম আরজুমান্দ বানু বেগম ছিল) মমতাজ মহলের উদ্দেশ্যে এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন। সৌধটি নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে যা সম্পূর্ণ হয়েছিল প্রায় ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানের প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহল সন্তান জন্মদানকালে মৃত্যুবরণ করলে শাহজাহান স্ত্রী বিয়োগে শোকাতুর হয়ে পড়েন এবং মমতাজের প্রতি তার ভালোবাসার নিদর্শন পৃথিবীবাসীর কাছে অমর করে রাখতে তিনি প্রিয় বেগম মমতাজের সমাধিস্থলে তাজমহল তৈরি করেন। ১৬৩২ সালেই যমুনা নদীর তীরে তাজমহল তৈরি শুরু হয়। তাজমহলের নির্মাণশৈলী এর উপকরণ থেকে বোঝা যায় তৎকালীন পৃথিবীর সর্বাধিক ব্যয়বহুল প্রাসাদ এটি। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সাদা মার্বেল পাথর অত্যন্ত মূল্যবান কিছু দুর্লভ পাথর। তাজমহলের বিভিন্ন দেয়াল গম্বুজের নকশায় এবং কারুকাজে ফুটে ওঠে মুসলিম মুঘল, পারস্য তুর্কি স্থাপত্যের চিহ্ন। এর প্রধান নকশাকার ছিলেন ওস্তাদ আহমেদ লাহুরি, আবদুল করিম মামুর খান এবং মাকরামাত খান যারা সে সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত, পারদর্শী উচ্চ পর্যায়ের প্রকৌশলী এবং নকশাকার ছিলেন। তাজমহল মুঘল স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ আকর্ষণীয় নিদর্শন।

পানামা খাল:

পানামা খাল আমেরিকা মহাদেশের উত্তর দক্ষিণ ভূখণ্ড সংযোগকারী প্রণালী। পানামা খাল আটলান্টিক মহাসাগর প্রশাস্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। খালের দৈর্ঘ্য ৭৭ কিমি.; গভীরতা ১২ থেকে ১৫ মিটার এবং তলার প্রস্থ ৩০ থেকে ৯০ মিটার। খালটির উভয় প্রান্তে ২টি ছোট সমুদ্র সমতল ভাগ এবং তিন জোড়া গেট আছে, যেগুলো জাহাজকে সমুদ্র সমতল থেকে ৩২ মিটার (প্রায় ১০৫ ফুট) উপরে তুলে দেয়। পানামা খাল বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক নৌরুট। এর বয়স ১০১ বছর।

১৮৮১ সালে খালটি খনন শুরু করে ফ্রান্স। কিন্তু প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে সম্ভব হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার এটি নিয়ে কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়া করার চেষ্টা করছিল। কারণ পানামা ভূখণ্ডটি ১৮১৯ সাল থেকেই কলম্বিয়ার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্যিক সামরিক নৌজাহাজগুলো সহজে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে নেওয়ার জন্য খাল খননের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে কলম্বিয়া সরকার। আর এই প্রত্যাখ্যানের পরই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি কথিত অভ্যুত্থান ঘটে এবং ১৯০৩ সালে জন্ম হয় পানামা নামের স্বাধীন রাষ্ট্র।

১৯০৩ সালে যখন পানামা কলম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন পানামা সিটি এই নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর অবশ্য খাল খননের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয় নি। পানামা সরকার ফরাসি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য প্রকৌশলী ফিলিপ বোনাও ভারিল্লাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই ব্যবসায়ীর হাত ধরেই পানামাযুক্তরাষ্ট্র চুক্তি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৯০৪ সালে খালটি পুনরায় খনন শুরু করে। শেষ হয় ১৯১৪ সালে।

সুড়ঙ্গ চ্যানেলটানেল:

ইংল্যান্ডের টেমস নদীর সুড়ঙ্গপথের কথা অনেকেরই জানা। ফ্রান্সের সঙ্গে ইংল্যান্ডের যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে টেমস নদীর সুড়ঙ্গটি। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক সুড়ঙ্গ। সুবিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেলের অন্তর্ভুক্ত চ্যানেল টানেল আটলান্টিক মহাসাগরেরও অন্তর্ভুক্ত। চ্যানেল টানেল একটি ৫০. কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল রেল সুড়ঙ্গ যা সাগরের তলদেশ দিয়ে বিস্তৃত। এটি যুক্তরাজ্যের ফোকস্টোনকে ফ্রান্সের কোকুয়েলসের সাথে যুক্ত করে। এর সর্বনিম্ন পয়েন্টের দৈর্ঘ্য ৭৫ মিটার। টানেলটির সমুদ্রতলে যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য তা বিশ্বের দীর্ঘতম। টানেলে তিনটি সুড়ঙ্গ রয়েছে যার দুটি দিয়ে ট্রেন চলাচল করে এবং তৃতীয়টি মেরামতসংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়।

১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে এই টানেলে রেল চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। সমুদ্রতলে এ ধরণের সেবার দিক থেকে এটাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ। টানেলের দুই প্রান্তে দুটি রেলস্টেশন রয়েছে; টানেল পাড়ি দিয়ে এক স্টেশন থেকে অন্যটিতে পৌঁছাতে প্রায় ৩৫ মিনিট সময় লাগে।

জীবনে সুখে থাকার ফর্মুলা!
 

সিএন টাওয়ার:

উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডার টরন্টোর প্রাণকেন্দ্রে সিএন টাওয়ারের অবস্থান। পৃথিবীর উচ্চতম স্থাপনাগুলোর তালিকায় প্রায়ই উঠে আসে এই ভবনের নাম। প্রায় ৫৫৪ মিটার ( হাজার ৮১৬ ফুট) এই টাওয়ারটির নির্মাণ যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে এবং এর নির্মাণ কাজ ১৯৭৫ সালে শেষ হয়। এটি কানাডার জাতীয় টাওয়ার হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৬ সালে সিএন টাওয়ারসিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স আমেরিকান সোসাইটিদ্বারা বিশ্ব আধুনিক সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একটি হিসেবে ঘোষিত হয়।

গোল্ডেন গেট ব্রীজ:

গোল্ডেন গেট ব্রীজটি আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত। ব্রীজটির দৈর্ঘ্য দশমিক কিলোমিটার আর প্রস্থ ২৭ দশমিক ৪০ মিটার (৯০ ফুট) এই ব্রীজ নির্মাণের আগে সানফ্রান্সিসকো শহরে যেতে ফেরি পারাপারের ব্যবস্থা ছিল। ১৯১৬ সালে ব্রিজটির ভিত্তিপ্রস্তর করা হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সেতুটির নির্মাণকাজ স্থগিত ছিল।

১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেতুটি নির্মাণের অনুমতি দেয়। নকশায় সেতুটির প্রধান স্তম্ভটি ৪০০২ ফুট করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয় জানুয়ারি ১৯৩৩ সালে। নানারকম সমস্যা কাটিয়ে প্রায় বাইশ বছর ধরে এর নির্মাণ কাজ চলে। সেতুটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল ২৭ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার এবং এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৩৭ সালে। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভল্ট এর উদ্বোধন করেন। ছয় লেনবিশিষ্ট এই সেতুটি দিয়ে দৈনিক এক লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি যানবাহন চলাচল করে।

ডেল্টা ওয়ার্কস:

আধুনিক সপ্তাশ্চর্যেও ডেল্টা ওয়ার্কস অন্যতম। এটি একটি বাঁধ। এটি নেদারল্যান্ডে অবস্থিত। বাইন, মিউজ এবং সেকল্ড এই তিনটি নদীকে কেন্দ্র করে ডেল্টা ওয়ার্কস গড়ে উঠে। এই বাঁধটির নির্মাণ কাজ ১৯৫৩ সালে শুরু হয়ে ১৯৯৭ সালে কাজ শেষ হয়। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে এর নির্মাণ কাজ চলে। এটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল বন্যা ও বড়সর রকমের দুর্যোগে বাধাপ্রদানকারী বাঁধ হিসেবে। এতে রয়েছে ৬২টি স্লাইডিং গেইট। গেটগুলো সাধারণত অনুকূল আবহাওয়ায় খোলা থাকে যাতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের মাধ্যমে পরিবেশ শীতল থাকে। আবার প্রতিকূল আবহাওয়ায় গেটগুলো বন্ধ রেখে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া মোকাবিলা করা হয়। নেদারল্যান্ডে  অবস্থিত এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বাঁধ।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?