ফেসবুক: গুজব থেকে দূরে থাকবে কীভাবে?


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

হিমু এবং আলী খুব ভালো বন্ধু। ক্লাস ওয়ান থেকে থেকে তারা একই স্কুলে পড়েছে। কিন্তু ক্লাস নাইনে থাকতে হঠাৎ একদিন তাদের বন্ধুত্ব ভেঙ্গে গেল। দুজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। একজন আরেকজনকে দেখলে উল্টো দিকে হাঁটা দেয়। কিন্তু এর কারণ কী?

সেই কারণটা আর কিছুই নয়, ফেসবুক! একদিন আলী ফেসবুক ব্রাউজ করতে করতে দেখল যে হিমু ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি বাংলাদেশের ভিডিও শেয়ার করেছে।

আলী সেখানে গিয়ে কমেন্ট করল, “শুধু গাধারাই এ ধরণের ভিডিও শেয়ার করে।”

হিমু রিপ্লাই দিল, “পৃথিবী অবশ্যই চ্যাপ্টা! যারা তা স্বীকার করে না, তারা আহাম্মক!”

আলী তারপর অনেকগুলো লিঙ্ক দিল প্রমাণস্বরূপ যে পৃথিবী আসলে চ্যাপ্টা না। তখন হিমুর ফ্রেন্ডলিস্টের আরেকজন এসে পৃথিবী চ্যাপ্টা তার প্রমাণস্বরূপ আজেবাজে কিছু লিঙ্ক দিল।

হিমু তারপর লিখল, “দেখেছিস? পৃথিবী আসলেও চ্যাপ্টা!”

আলী লিখল, “বলদের মত কথা বলিস না তো! এই লিঙ্কগুলোর একটার তথ্যও তো সত্যি নয়!”

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে যাই- সিজিপিএ ঠিক রাখবো, নাকি নিজের জন্যে কিছু অর্থোপার্জন করবো। এই দ্বিধা থেকে মুক্তির জন্যে ঝটপট ঘুরে এসো ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্ট থেকে!  লাইফ হ্যাকস সিরিজ!

এরপর আলী ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন সকালবেলা উঠে দেখল যে হিমু তাকে ফেসবুকে ব্লক করে রেখেছে! শুধু তাই নয়, হিমু সেদিন রাতেই একটা বেশ স্ট্যাটাস দিয়েছে, সেখানে লিখেছে, “আলী এক মস্ত বড় আহাম্মক। এতদিন ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখাটাই আমার ভুল ছিল! যারা বলে পৃথিবী গোল, তারা সবাই আহাম্মক! আহাম্মকেরা আমার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বেরিয়ে যাও!”, সেই স্ট্যাটাসে আবার শতশত লাইক, কমেন্ট, শেয়ার পেল। সবাই বলল যে হিমুই ঠিক, আলী আসলেই আহাম্মক! হিমুও এগুলো দেখে বেশ আত্নতৃপ্তি বোধ করল।  এরপর থেকেই তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ।

ওপরের ঘটনাটা আমাদের বর্তমান সমাজের এক নিদারুণ বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো যখন প্রথম এল, তখন ধারণা করা হল যে এর মাধ্যমে অনেক গঠনমূলক আলোচনা হবে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয়ের ক্ষেত্রে সহজেই মানুষের মাঝে মত বিনিময় সম্ভবপর হবে। সারা বিশ্বেই বিভিন্ন আন্দোলনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেও।

তবে সময়ের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের আরও অসহিষ্ণু করে তুলছে। আমরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছি, সহজেই রাগান্বিত হয়ে পড়ছি এবং অমূলক মতামত প্রদান করছি।

ঘুরে আসুন: জেনে নাও জিমেইলের ১০টি প্রয়োজনীয় তথ্য

এক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ যত বেশি উগ্র মতামত প্রদান করে, সেই পোস্ট বা ছবি বা ভিডিও তত বেশি ভাইরাল হয়। গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে টুইটের উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এর মাঝে যে সকল টুইটে “moral-emotional” শব্দ, (যেমনঃ Hate) ছিল, সে সকল টুইটের রিটুইট হবার সম্ভাবনা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ১৯% এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ২৯% বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যার মতামত যত বেশি উগ্র, তার কথার দাম তত বেশি।

এর ফলে উগ্র মতবাদ, ভুয়া খবর, গুজব ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়েবসাইটগুলো এ ধরণের কন্টেন্টের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাও নিচ্ছে না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, এ ধরণের কন্টেন্টের দায়ভার মাধ্যমগুলির ওপর বর্তায়ও না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিটি ডিসেন্সি এক্টের ধারা ২৩০ অনুযায়ী কোন ওয়েবসাইট সেই ওয়েবসাইটের ব্যবহারকারীর প্রদত্ত কোন পোস্টের জন্য দায়বদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে ওয়েবসাইটগুলো শুধুই প্ল্যাটফর্ম, পাবলিশার নয়। এই আইনটি করা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে, তখনও ইন্টারনেটের ব্যাপ্তি এত বিশাল ছিল না।

কিন্তু পিউ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮% মানুষের জন্য খবরের অন্যতম মূল উৎস হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যদিও এর মাঝে ৫৭% মানুষ মনে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবর অমূলক। কিন্তু বাকি ৪২% এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবরকে সঠিক মনে করাও একটি বিশাল সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপ্তি বহুগুণে বেড়ে গেছে। এই ওয়েবসাইটগুলো এখন খবরের অন্যতম উৎস। তাই, তাদের ওয়েবসাইটে কী ধরণের কন্টেন্ট যাচ্ছে, সে ব্যাপারে তাদের অবশ্যই ওয়াকিবহাল হতে হবে।

অবশ্য কমিউনিটি ডিসেন্সি এক্টে বলা আছে ওয়েবসাইটগুলো যদি কোন কন্টেন্টকে আপত্তিজনক মনে করে, তবে তারা সেগুলো সরিয়ে ফেলতে পারে। সেই কাজটি বেশ কঠিন। কারণ, কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে স্বভাবতই মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার বিষয়টি উঠে আসবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকারের একটি।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে ইতোমধ্যেই উগ্র জাতীয়তাবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, এমনকি জাতিগত নিধনও সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশে রামুতে বৌদ্ধ বিহারে হামলার আগে ফেসবুক থেকেই গুজব ছড়ানো হয়েছিল। শ্রীলঙ্কাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করতে সরকার কিছুদিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। জাতিসংঘের মায়ানমার বিষয়ক তদন্তকারী ইয়াংঘি লি বলেছিলেন যে ফেসবুক ব্যবহার করে মায়ানমারের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছিল ও আক্রমণ করেছিল উগ্রপন্থী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা।

সহজেই শিখে ফেলো ভিডিও এডিটিং!

কোন ভিডিওকে নিজের পছন্দমত এডিট করার জন্যে অনেক মজার এবং সবচাইতে জনপ্রিয় একটা সফটওয়্যার প্রিমিয়ার প্রো।

প্রিমিয়ার প্রো-এর সাহায্যে ভিডিও এডিটিং শিখতে এক্ষুনি চলে যাও ১০ মিনিট স্কুলের এই প্লে-লিস্টটিতে ?

১০ মিনিট স্কুলের পাওয়ার পয়েন্ট সিরিজ

ওয়েবসাইটগুলোতে সম্পাদনার কাজ যথাযথভাবে না হবার মূলত দুইটি কারণ রয়েছে। কারণগুলো হলঃ

  • মানুষকে অধিক সময় ওয়েবসাইটে রাখাঃ এই ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এলগরিদমের ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলি আমাদেরকে আমাদের পছন্দের ভিত্তিতেই পোস্ট দেখায়। সেক্ষেত্রে যদি কেউ বিশ্বাস করে পৃথিবী চ্যাপ্টা এবং এই সংক্রান্ত পেজে লাইক দেয় ও সেই বিষয়ে স্ট্যাটাস দেয়, তাহলে তার হোম পেজে সেই সংক্রান্ত স্ট্যাটাস, ছবি, ভিডিও বেশি আসবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ ধরণের কাজ করার মূল কারণ হল, মানুষ তার পছন্দসই পোস্ট দেখলে বেশি সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করবে, ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞাপনও বেশি দেখবে এবং কোম্পানিগুলোর আয় বাড়বে। এজন্য তারা এ ধরণের এলগরিদম ব্যবহার করে থাকে। সেজন্য অনেক সময় বিতর্কিত কন্টেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
  • অপর্যাপ্ত কন্টেন্ট মডারেশনঃ  বর্তমানে ফেসবুকে ৭৫০০ এর বেশি কন্টেন্ট মডারেটর আছে। তাদের কাজ হচ্ছে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরণের হাজার হাজার ছবি, ভিডিও, পোস্ট ইত্যাদি দেখে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে থাকা উচিৎ কি না, সেই বিষয়টি নির্ধারণ করা। মডারেটররা এই ছবিগুলো দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফেসবুকের এক সাবেক কন্টেন্ট মডারেটর এজন্য ফেসবুকের নামে কেস করে দিয়েছে। তার দাবি, ফেসবুক তার কর্মচারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। তাছাড়া, বর্তমানে যারা এই কাজে নিয়োজিত, তাঁদের পক্ষে এই কাজ যথাযথভাবে করা কঠিন। কারণ, তাদের প্রতি ঘন্টায় হাজার হাজার পোস্ট রিভিউ করতে হয়। এমতাবস্থায় যথাযথভাবে কন্টেন্ট মডারেশন করা সম্ভব নয়।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

এই সমস্যাগুলোর সমাধানে বর্তমানে দুটো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজনঃ

ঘুরে আসুন: স্মার্টফোন হ্যাকিং থেকে বাঁচতে হলে জানতে হবে যে বিষয়গুলো

  • কমিউনিকেশনস ডিসেন্সি এক্ট সংশোধন করাঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা যে সকল পোস্ট, ছবি, ভিডিও শেয়ার করে থাকে, সেগুলোর ব্যাপারে ওয়েবসাইটগুলোকে দায়বদ্ধ করতে হলে কমিউনিকেশন্স ডিসেন্সি এক্ট সংশোধনের কোন বিকল্প নেই। এই আইনটি সংশোধন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিকে পাবলিশার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তখন, ওয়েবসাইটগুলোতে মিথ্যা খবর কেউ পোস্ট করলে সেটি সরানোর দায়ভার সাইটগুলোর ওপর বর্তাবে।
  • কন্টেন্ট মডারেশন যথাযথভাবে করাঃ ফেসবুক সিইও মার্ক জাকারবারগ প্রবল সমালোচনার মুখে বলেছেন যে ফেসবুক সামনে আরও কন্টেন্ট মডারেটর নিয়োগ দেবে এবং এক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার বাড়াবে। এই পদক্ষেপগুলো দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। যথাযথভাবে কন্টেন্ট মডারেশন করা সম্ভব হলে গুজব, মিথ্যা সংবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হানাহানি প্রভৃতি রোধ করা সম্ভব হবে।

এই পদক্ষেপগুলো নেয়া হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সমস্যা অনেকাংশেই কমে আসবে। তবে ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আমাদের সকলেরই উচিৎ কোন খবর বিশ্বাস করার আগে নিজের বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগানো। কোনক্রমেই উত্তেজিত হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনা কারো ঘটানো উচিৎ নয়।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]


লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?