‘না’ বলা মনের পাখিটাকে করুন জব্দ

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

‘If you have everything under control, you’re not moving fast enough.’ -Mario Andretti

সবকিছুই যদি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন না— মারিও আন্দ্রেতি

মনে আছে সেই ‘মনের পাখি’টার কথা? ওই যে সারাক্ষণ বকবক করে চলে, আপনাকে ভয় দেখায়। মনের সেই পাখিটা যদি বেশি বকবক করেই চলে, আপনার সামনের চলার পথ কিন্তু রুদ্ধ হয়ে যাবে। সাহস হারিয়ে ফেলবেন। সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি হবে। ফলে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ আর অবসাদ বাড়বে।

আপনার উন্নয়নের ধারা চালু রাখতে হলে আপনাকে শিখতে হবে কীভাবে সেই পাখিটাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।

এক ছাত্রের কথা শুনুন।

‘আমার দ্বারা কি বিসিএস সম্ভব? প্রিলিতে যে কঠিন প্রশ্ন আসে! আবার প্রাইভেট জবে তো অনেক স্মার্ট হতে হয়, প্রচুর ইংলিশ জানতে হয়, আমি তো কিছুই পারি না। আমার দ্বারা কিছুই হবে না।’

বোঝাই যাচ্ছে ছাত্রটি হতাশায় ভুগছে। তার মনের পাখিটার কাছে সে অসহায়। সে মেনেই নিয়েছে মনের পাখিটা যা বলছে তা-ই সঠিক। আসলে কি তাই?

মনের পাখিটা সব সময় নেতিবাচক কথা বলে, নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে। পারি না, পারব না, হবে না, সম্ভব না ইত্যাদি হাজারো নেতিবাচক শব্দ তার খুব প্রিয়। ফলে খুব সহজেই কী কী পারি না তার লিষ্ট আমরা করতে পারি, কিন্তু কী কী পারি তা বলতে গেলে থেমে যাই।

আপনার মাথায় যদি বারবার ঘুরেফিরে নেতিবাচক চিন্তা চলে আসে, তবে ভয় পাবেন না। নিজেকে দোষারোপও করবেন না। কেননা, এই নেতিবাচক মনের পাখির জন্ম হয়েছে মূলত অন্যের ভুলের কারণে।

ছোটবেলার কথা একবার ভাবুন। পরিবারে বা স্কুলে কতবার ভালো প্রশংসা শুনেছেন? আর কতবার শুনেছেন, আপনি পারেন না, আপনি একটা গাধা, অলস, আপনাকে দিয়ে কী হবে? কতবার আপনাকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করেছেন আপনার বাবা-মা বা স্কুলের শিক্ষকরা? কতবার আপনার ওপর আস্থা রেখেছেন, আপনি করতে পারবেন? কতবার আপনাকে বিনা বাধায় রান্নার বা ঘরের কাজ করতে দিয়েছেন?

নেতিবাচক কমেন্টের চেয়ে ভালো কথা শুনেছেন বেশি, এই দাবি জোর গলায় করার মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এই কম মানুষের মধ্যে যদি আপনি একজন হয়ে থাকেন, তবে আপনি আসলেই ভালো আছেন। আপনার মধ্যে নেতিবাচক চিন্তা কম আঘাত হানবে।

যদি ঘটনা হয় উল্টো, সারাক্ষণ নেতিবাচক মূল্যায়ন পেয়েই বড় হয়ে থাকেন, তবে এখন আপনার মাথায় ঘুরেফিরে নেতিবাচক চিন্তাই ফিরে আসবে। আমাদের সমাজে, বিশেষ করে বাবা-মায়ের মধ্যে নেতিবাচক মূল্যায়ন খুব বেশি দেখা যায়।

এক ছাত্রের মা ২০টির মধ্যে দুটি শব্দের বানান ভুল লেখার কারণে তার সাত বছরের ছেলেকে অনেক বকাঝকা করল। অথচ সে যে ১৮টি জটিল বানান পারল, সে জন্য একটি বারের জন্যও তাকে কোনো প্রশংসা করল না। ছোট্ট এই শিশুটির নিজের সম্বন্ধে কী ধারণা হবে?

নেতিবাচকভাবে না বলে বরং প্রশ্ন করা যেতে পারে

মনোবিজ্ঞানের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো ও মন্দ মূল্যায়নের অনুপাত হওয়া উচিত ৫:১। অর্থাৎ প্রতি একটি নেতিবাচক মূল্যায়নের বিপরীতে অন্তত পাঁচটি ভালো মূল্যায়ন দরকার।

সমাজে নেতিবাচকতা কতটা প্রকট তা বোঝা যায় এক ভুক্তভোগীর কথায়।

‘ভাই, আমাদের সমাজটাই নেতিবাচক। আত্মীয়স্বজনরাও। ধরেন মেয়ে পড়ে। লোকজন বলবে পড়ে তো, কিন্তু পাস করব না। মেয়ে পাস করল। লোকজন বলবে পাস তো করেছে, কিন্তু চাকরি পাইব না। মেয়ে চাকরি পেল। তখন বলে চাকরি তো পাইছে কিন্তু বেতন তো কম।’

নেতিবাচক চিন্তার অন্যতম উৎস হলো নেতিবাচক ভাষার ব্যবহার। যার কথায় যত নেতিবাচক শব্দ, তার মধ্যে তত বেশি নেতিবাচকতা দেখা যায়।

কীভাবে?

নেতিবাচক শব্দের মাধ্যমে কোনো কাজকে ব্যাখ্যা করলে সেটি অনেক বেশি কষ্টকর বা চাপমূলক মনে হবে। যেমন- কোনো কাজকে আমরা যদি ‘কঠিন’ বা ‘অসহনীয়’ না বলে, বলি ‘কাজটা চ্যালেঞ্জিং’ বা ‘আমার জন্য একটা পরীক্ষা’, তাহলে কাজটি নিঃসন্দেহে অতটা কঠিন লাগবে না, যতটা আমরা ভাবছিলাম।

‘আমার দ্বারা এটা সম্ভব না’ বা ‘আমি কখনোই এটা করতে পারব না’ ইত্যাদি বাক্য ব্যবহারে বিফলতার আশঙ্কাকেই বাড়িয়ে দেয়। নেতিবাচকভাবে না বলে বরং প্রশ্ন করা যেতে পারে। দুটি বাক্যের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করুন:

এক.  আমি কখনোই এটা করতে পারব না।

দুই. আমি এটা কীভাবে করব?

কোনটি বেশি আশাব্যঞ্জক?

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতাকে রাঙিয়ে তোলে।

সমষ্টিগতভাবেও আমরা প্রায় নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করি। যেমন- আমরা অবহেলিত জাতি, তৃতীয় বিশ্ব, অলস বাঙালি, আমাদের দ্বারা কখনোই উন্নতি হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

নিজেই নিজেকে অবহেলিত না ভাবলে অন্যরা অবহেলা করার সুযোগ কি পাবে?

নিজেই নিজেকে কীভাবে নেতিবাচক বা ছোট করে দেখি তা অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীর নাম দেখলেই বোঝা যায়। ‘একলা আমি’, ‘ব্যর্থ সুমন’, ‘অচেনা পথিক’, ‘পাগলা মারুফ’ ইত্যাদি শত শত নাম দেখি ফেসবুকে। নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করলে আপনার ব্রেন ধরেই নেবে আপনি আসলেই ব্যর্থ। ব্রেন সেভাবেই কাজ করা শুরু করবে।

নেতিবাচকতা দূর করবেন কীভাবে?

১। সচেতন হোন

পরবর্তী সময়ে কোনো কিছু নিয়ে টেনশন করার সময় খেয়াল করুন আপনার মাথায় কী কী নেতিবাচক চিন্তা আসছে। নিশ্চয় আপনার মাথায় নেতিবাচক চিন্তা আসছে, যার জন্য আপনি দুশ্চিন্তা করছেন। আপনার ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষার প্রতি খেয়াল রাখুন।

২। শান্ত থাকুন

বুঝতে পারছেন আপনার মাথায় অনেক ভয়ংকর চিন্তা আসছে। শরীরে তা অনুভব করছেন। আমি বাসে দূরে কোথাও গেলে মনে হতো এই বুঝি অ্যাকসিডেন্ট হলো! শরীরে ভয় আর উত্তেজনা কাজ করত। এরকম পরিস্থিতিতে শান্ত থাকুন। নিজের ওপর বিরক্ত হবেন না। শুধু খেয়াল করুন আপনার নেতিবাচক চিন্তাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসছে। এগুলো আপনার ভুল চিন্তা। এরা আপনাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। আপনি আর আপনার নেতিবাচক চিন্তা এক জিনিস নয়।

৩। প্রথম নেতিবাচক চিন্তাটাকে ধরার চেষ্টা করুন

প্রথম কোন চিন্তাটা এলো মাথায়? এটা থেকে কোনটা এলো? এভাবে ধরার চেষ্টা করুন শিকলের প্রথম চিন্তাটাকে। প্রথমেই যদি নেতিবাচক চিন্তাকে থামাতে পারেন, দুষ্টচক্র গড়ে উঠতে পারবে না।

৪। পরীক্ষা করুন চিন্তাটা আসল না নকল

যখনই কোনো নেতিবাচক চিন্তা আসে তা পরীক্ষা করে দেখুন, আদৌ তা সত্য কি না, যা আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। চিন্তাকে প্রশ্ন করতে পারেন, চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কে বলেছে আমি পারব না? একবার ভুল হলে যে বারবার হবে, এরকম কোনো তত্ত্ব নেই। কীভাবে বুঝলাম, সবাই আমাকে অপছন্দ করে?

৫। ভালো চিন্তা দিয়ে খারাপ চিন্তা ঢেকে দিন

একটি ডায়েরিতে লিখতেও পারেন দিনে কতবার এবং কতরকম নেতিবাচক চিন্তা আসছে। এরপর, ধীরে ধীরে এসব নেতিবাচক চিন্তাকে ইতিবাচক শব্দ, ভাষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করুন। ‘না’গুলোকে ‘হ্যাঁ’ দিয়ে বলুন, খাতায় লিখুন এবং বারবার পড়ুন। এভাবে মনের পাখিটার না বলার অভ্যাস হ্যাঁ দিয়ে বদলে দিন।

আমি জানি আপনি পারবেন। কেননা জাদুর কাঠি আপনার হাতেই রয়েছে।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে তাওহিদা আলী জ্যোতি


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?