প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পেছনের গল্প

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বর্তমান বিশ্বে খুব দুশ্চিন্তার একটা বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন আর এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়াগুলো। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু যেভাবে সবকিছু চলছে এভাবেই সব চলতে থাকলে আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে দ্বীপ দেশগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেরই সাগরতলে তলিয়ে যাবার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে! খুব একটা সুবিধায় নেই কোন দেশই, আর তাই জলবায়ু পরিবর্তন আর দূষণ রোধের জন্যে বিশ্বব্যাপী একটা উদ্যোগ খুব দরকারি ছিল।

সমস্যা হলো, পুরো বিশ্বকে এক করাটা প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়।

২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে যখন ১৫ তম Conference of Parties(COP) শেষ হল, তখনও প্রায় সবাই নিশ্চিত ছিল যে কোনদিনই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি সার্বজনীন চুক্তি করা সম্ভব হবে না। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এত বেশি বিভাজন ছিল যে তারা কোনভাবেই ঐকমত্য হতে পারেনি।

আত্মবিশ্বাস যখন তলানিতে:

ছয় মাস পর ক্রিস্টিনা ফিগারস UN Framework Convention on Climate Change (UNFCCC) এর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেসময় ক্রিস্টিনা নিজেও বিশ্বাস করতেন না যে কোন চুক্তি করা সম্ভব হবে। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ক্রিস্টিনাকে জিজ্ঞেস করেন, “একটি বৈশ্বিক চুক্তি কি কোনদিন সম্ভব হবে?” তিনি উত্তর দেন, “আমার জীবদ্দশায় কখনোই তা হবে না।”

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

মনোভাবের পরিবর্তন:

ক্রিস্টিনার বক্তব্য শুনে তাঁর সহকর্মীরা স্বভাবতই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন! ক্রিস্টিনা নিজেও বিশ্বের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েন! কিন্তু তিনি নিজেকে দ্রুতই সামলে নেন। তিনি নিজেকে বলেন যে অসম্ভব কোন ধ্রুব সত্য নয়, এটি শুধুই মানুষের মনোভাব।

 তখনই তিনি নিজের মনোভাবকে পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের মনোভাব পরিবর্তন করার দৃঢ় সংকল্পও গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পাদিত হয়।

Via: Business Insider

ইতিবাচকতার প্রভাব:

ক্রিস্টিনা প্রথমেই ঠিক করেন যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচকতা নিয়ে আসতে হবে। মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে বিশ্বের সকল দেশ একমত হতে পারে। সবরকম প্রতিকূল অবস্থার মাঝেও ক্রিস্টিনা এই ইতিবাচক মনোভাব তুলে ধরতেন।

ঘুরে আসুন: বিটকয়েনের ঝুঁকি আর শঙ্কার ইতিকথা

নবায়নযোগ্য শক্তির উত্থান:

প্রায় একই সময় আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ঘটতে থাকে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। সৌরচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়ে গোটা শহরকেও বিদ্যুৎ সেবা দেয়া সম্ভব হয়।

ক্রিস্টিনা এবং তাঁর দল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবিষ্কার করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন যে জলবায়ু পরিবর্তন অনেক ক্ষতিকর একটি বিষয় হলেও এটি মানবজাতির সামনে অনেক বড় সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে যেই পদক্ষেপগুলো জরুরি, সেই পদক্ষেপগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পরিবহণ ব্যবস্থা প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন সাধন করতে পারে।  ফলে, সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।

জনমত পরিবর্তন:

সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে আরম্ভ করল যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত নিজেদের স্বার্থেই। জনমত সৃষ্টি হওয়ার পর সরকারগুলোর চিন্তাধারার মাঝেও পরিবর্তন আসতে শুরু করল। ফলশ্রুতিতে ১৯৫ টি দেশের মাঝে ১৮৯ টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত নীতিমালা তৈরি করল এবং তা UNFCCC-এর কাছে জমা দিল।

চুক্তি সই:

সবশেষে ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে COP 21-এর শেষ দিনে বিশ্বের ১৯৫ টি দেশ প্যারিস জলবায়ু চুক্তি করার ব্যাপারে একমত হয়। ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল নিউইয়র্কে চুক্তিটি সই করার জন্য খুলে দেয়া হয় এবং ৪ নভেম্বর, ২০১৬ থেকে এই চুক্তি কার্যকর হয়।

চুক্তির মূল লক্ষ্য:

এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অপূরণীয় ক্ষতি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা। এজন্য এই চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য রয়েছে। যেমনঃ

  • পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে শিল্পায়ন যুগ পূর্ব তাপমাত্রার (১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের) মধ্যে রাখা।
  • ২০৫০-২১০০ সালের মধ্যে গ্রীনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণকে কমিয়ে এমন পর্যায়ে আনা যেন গাছপালা তা প্রাকৃতিকভাবে শুষে নিতে পারে, অর্থাৎ কার্যত প্রকৃতিতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা।
এবার সাধারণ জ্ঞান শেখা হবে আনন্দের!

আমাদের প্রতিটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম!

তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এস ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ সাধারণ জ্ঞান প্লে-লিস্টটি থেকে!

১০ মিনিট স্কুলের সাধারণ জ্ঞান ভিডিও সিরিজ

  • সকল দেশের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর বৃদ্ধি করা।
  • উন্নত রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য তহবিল সৃষ্টি করা।

প্যারিস চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ:

এখনো পর্যন্ত ১৭৪ টি রাষ্ট্র চুক্তিটি সই করেছে। গত বছরের শেষে COP 23 চলাকালীন সময়ে সিরিয়া প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সই করে। কিন্তু গত বছরের আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে।

বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র ফিজি বছরজুড়ে তালানোয়া সংলাপের আয়োজন করেছে

ফলে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তির একটি অংশ। তাদের চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে আনুমানিক তিন বছর সময় লাগবে।

ঘুরে আসুন: বিটকয়েনের ভবিষ্যত: তাকী কি মাইনিং করবে?

প্যারিস চুক্তির দুর্বলতা এবং তার প্রতিকার:

এতকিছুর পরও প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বেশ কিছু দুর্বলতা রয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে দেশগুলো নিজেদের লক্ষ্যমাত্রা নিজেরাই নির্ধারণ করে।  বর্তমানে সেই লক্ষ্যমাত্রা যথেষ্ট নয়। এই লক্ষ্যমাত্রা যদি পরবর্তীতে বৃদ্ধি না করা হয়, তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে না।

Via: CarbonBrief

তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির মাঝে রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ, তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির বেশি বৃদ্ধি পেলেই এই দেশগুলো প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মাঝে রাখার জন্য বর্তমানে প্রযুক্তিগতভাবে কার্বন প্রকৃতি থেকে সরানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সফলতা আসেনি। বরং বনায়ন সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করা তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মাঝে রাখার ক্ষেত্রে অধিক অবদান রাখতে পারে।

একইসাথে ২০৫০ সালের মধ্যে অনবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার থামিয়ে দ্রুত শত ভাগ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার শুরু করাও অপরিহার্য।

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে অনলাইন লাইভ ক্লাসের! তা-ও আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

এজন্য Conference of Parties(COP)-এর বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র ফিজি বছরজুড়ে তালানোয়া সংলাপের আয়োজন করেছে। এই সংলাপের আওতায় দেশগুলোকে তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। অন্যথায় প্যারিস চুক্তি পরিপূর্ণতা পাবে না। 

অবশ্য ২০০৯ সালের পর এই অবস্থায় আসতে পারাও নিঃসন্দেহে একটি বিরাট সাফল্য। বিশ্বের সকল দেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়তে বদ্ধ পরিকর। এই মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে প্যারিস চুক্তির দুর্বলতাগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দেয়া সম্ভব!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?