হাইজেনবার্গের গল্প: ভ্রূণের মহাবিশ্ব

চোখ বন্ধ করে ৫ মিনিট চিন্তা করুন এবং এই প্রশ্নটির উত্তর দিন: “এই পৃথিবীর সকল জীবিত ও মৃত মানুষের মধ‍্যে কেবলমাত্র একটি মিল রয়েছে। এমন একটি অভিজ্ঞতা আছে যা সকল জীবিত ও মৃত মানুষই অনুভব করে ফেলেছে। কি সেই অভিজ্ঞতা?”


উত্তরটি দেবার পূর্বে বেশ কিছু কথা বলার আছে।
পৃথিবীর বেশ কিছু মানুষ মৃত‍্যুর প্রায় কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এদের মধ‍্যে কেউ কেউ ১০,০০০ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক খেয়েছেন; কেউ বা ডাক্তার কর্তৃক মৃত ঘোষিত হবার পরও নিজের হৃৎপিন্ডের কম্পন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এরকম ভয়ংকর অনুভূতি অর্জন করে আসা মানুষগুলোর সাক্ষাৎকারে জানা যায় প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার কথা। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে প্রায় সকলেই মৃত‍্যুর খুব কাছাকাছি যেয়ে একই জিনিস দেখতে পেয়েছেন। তা হলো, একটি লম্বা টানেল বা নল যার মধ‍্য দিয়ে তিনি পড়ে যাচ্ছেন। সেই টানেলের মুখ থেকে উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে। সেই আলোর মাঝে নিমজ্জিত হয়ে আছে একজনের অবয়ব। মৃত‍্যুকে ধোকাঁ দিয়ে বেচেঁ আসা সেই ব‍্যক্তিদের প্রায় সবাই মনে করেন, সেই অবয়বটি ছিলো তাদের সৃষ্টিকর্তার। অর্থাৎ, মৃত‍্যুর পর তারা আসলেই খোদার সান্নিধ‍্য লাভ করতে যাচ্ছিলেন।



বিভিন্ন ধর্ম স্রষ্টা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত ধারণ করে। অথচ, সকল মৃত‍্যুপথযাত্রীগণই কেন সেই একই অভিজ্ঞতা লাভ করলেন? তাহলে কি স্রষ্টার ধারণাটা সকলের জন‍্যই এক হওয়া উচিত? সকল ধর্মই কি তাহলে একই বাণী ও একই পরকালের কথা বর্ণণা করে?



এবার আসুন, আপনাদের কাছে রাখা সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাক। সকল মানুষের দ্বারা অনুভূত সেই অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে “জন্মলাভ” করা!

মানবশিশু যখন মায়ের পেটের ভিতরে একটি পানিপূর্ণ থলিতে ভাসমান থাকে তখন সে Amniotic বা ভ্রূণীয় জগতের বাসিন্দা। সেই দশায় শিশুটি অত‍্যন্ত আরামদায়ক একটি পরিবেশে থাকে। একসময় তার সেই জগতে আলোড়ন শুরু হয়। জরায়ুর (uterus) প্রাচীরের সংকোচন-প্রসারণের ফলে শিশুটি যোনিপথের রাস্তায় অগ্রসর হয়। সামনে মাথা, পেছনে থাকে পা। চোখ থাকে বন্ধ। কি বুঝতে পারলেন? টানেলের মতো মনে হয়? প্রসবকালে মায়ের যোনিপথ দিয়ে আলো প্রবেশ করে তা স্পর্শ করে ভূমিষ্ঠ হতে চলা সেই শিশুটির বন্ধ হয়ে থাকা চোখের পাতায়। চিন্তা করে দেখুন, চোখ বন্ধ করে থাকা অবস্থায়ও যদি আপনার সামনে হঠাৎ অনেক আলো জ্বেলে দেয়া হয় তাহলে কিন্তু আপনি ঠিকই বুঝতে পারবেন সেই আলোর অস্তিত্বের কথা। বুঝতে পারে সেই শিশুটিও। তার কাছে মনে হয়, একটি টানেলের মধ‍্য দিয়ে পড়তে পড়তে সে আলোর দিকে যাচ্ছে। এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা ভূমিষ্ঠ হওয়া প্রতিটি মানুষই উপভোগ করে এসেছে। বিজ্ঞানী কার্ল সেগান তার Broca’s Brain বইতে এই অভিজ্ঞতাকেই সকল মানুষের মিল বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মৃত‍্যুপথযাত্রী যেকোন মানুষই হয়তো আবার সেই জন্মলাভের অভিজ্ঞতাই লাভ করতে থাকে!



এই ধারণাটি উষ্কে দেয়া আরো অনেক প্রশ্নের। তাহলে কি, জন্মের সময় প্রতিটি মানুষ মৃত‍্যুর মতো কষ্ট অনুভব করে? কেন জন্ম ও মৃত‍্যু একই ধরণের অভিজ্ঞতার সঞ্চার করবে? তাহলে কি জন্ম ও মৃত‍্যু একই জিনিস?
বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের মতে, শিশুটি যখন এই পৃথিবীতে জন্ম নেয় তখন ভ্রূণীয়দশার সেই Amniotic Universe থেকে তার মৃত‍্যু ঘটে।

Every birth is a death. Perhaps, every death is a birth too. We die only to be born in another universe. A new Amniotic Universe.

Author

Shamir Montazid

This author leads a dual lifestyle. In daylight, he is a badass genetic engineer trying to dance with DNA. At night, he turns himself into 'The Heisenberg'. He was last seen cooking some funky biology and chemistry tutorials in his Meth-lab.
Shamir Montazid
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?