হাইজেনবার্গের গল্প: পাস্তুরাইজেশন

উনবিংশ শতাব্দীর ফ্রান্স ছিলো আভিজাত‍্যের রাজধানী। ফ্রেঞ্চ ওয়াইন এবং পেস্ট্রির সুনাম বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে তখন সুপরিচিত। বংশ পরম্পরায় মদ গাঁজন তথা ফার্মেন্টেশন করা তখন অনেক ধনী ফরাসী পরিবারের অবসরের আনন্দ। সেসময় উত্তর ফ্রান্সের লিল শহরে মি. বিগোট নামক এক ওয়াইন ব‍্যবসায়ী বাস করতেন। বীটরুট পঁচিয়ে মদ প্রস্তুত করা ছিলো তার বিশেষত্ব। বিগোট একদিন লক্ষ করলেন, তার প্রস্তুতকৃত মদের বোতলগুলো প্রাথমিকভাবে খুবই সুগন্ধী হয়ে থাকে। কিন্তু, কিছুদিন পরেই তা থেকে পচাঁ এবং টক জাতীয় এক ধরণের গন্ধ বের হয়। এই সমস‍্যার কারণে মি. বিগোট বেশীদিন নিজের বানানো মদ মজুদ করে রাখতে পারতেন না। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি এই সমস‍্যা সমাধানের উপায় খুঁজছিলেন।

মি. বিগোটের ছেলে সেসময় লিল বিশ্ববিদ‍্যালয়ে লুইস পাস্তুর নামক এক অণুজীববিদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। পাস্তুর তখন ব‍্যাকটেরিয়া সংক্রান্ত গবেষণার জন‍্য বিশ্বে সুনাম লাভ করেছেন। সেসময় পর্যন্ত মানুষ ব‍্যাকটেরিয়া যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে তা বিশ্বাস করতে চাইতো না। Germ Theory of Disease নামক বিখ‍্যাত এক তত্ত্ব নিয়ে তখন বিশ্বব‍্যাপী গবেষণা চলছে। লুইস পাস্তুর সাহেবও সেই গবেষক দলের সামনের সারিতে অবস্থান করতেন।

মি. বিগোট তার ব‍্যবসা বাচাঁতে তখন ছেলের শিক্ষক লুইস পাস্তুরের শরনাপন্ন হলেন। পাস্তুর বিগোটের মদের কারখানা পরিদর্শন করে বেশ কিছু নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসলেন। লিল বিশ্ববিদ‍্যালয়ের পাস্তুর ল‍্যাবে শুরু হলো তার বিখ‍্যাত সেই গবেষণা। পাস্তুর লক্ষ‍্য করলেন, মদ উৎপাদন কেবল একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়। মদের প্রধান উৎপাদনকারী হলো ইস্ট নামক একধরণের এককোষী ছত্রাক। নব‍্যপ্রস্তুত মদের বোতলে এই ছত্রাকগুলো বেশ হাসিখুশি অবস্থায় বেচেঁ থাকে। এই ছত্রাক আমরা রুটি এবং বেকারী প্রস্তুতকৃত খাবারেও খেয়ে থাকি। ইস্ট সাধারণত আমাদের কোন ক্ষতি করে না। কিন্তু, সমস‍্যার মূল হোতা খুজেঁ পাওয়া গেলো পঁচে যাওয়া মদের বোতলে। মাইক্রোস্কোপের নিচে সেই বোতলের মদে ভাসতে দেখা গেলো ছোট ছোট ব‍্যাকটেরিয়া; যারা মদের মাঝে এসিড উৎপাদন করে তার পঁচে যাওয়া টক স্বাদের সৃষ্টি করে থাকে। সুতরাং, সমাধান একটাই— সময়ের সাথে মদের বোতলে ব‍্যাকটেরিয়ার উৎপাদনকে রোধ করতে হবে।

কিন্তু, কীভাবে?

পাস্তুর লক্ষ‍্য করলেন, মদকে যদি স্ফূটনাংকের নিচের তাপমাত্রায় ফুটানো হয় তাহলে এর ভিতরকার অধিকাংশ ব‍্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়। পাস্তুর বিগোটকে প্রাথমিকভাবে ৬৮ থেকে ৮১ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মদ ফুটিয়ে বাজারজাত করার পরামর্শ দিলেন। এই অতিসাধারণ একটি আবিষ্কার বদলে দিলো বিগোটের ব‍্যবসার ভাগ‍্য। কারণ, তার কোম্পানিই তখন একমাত্র মদপ্রস্তুতকারক যারা দীর্ঘদিন তাদের মদকে মজুদ করে রাখতে পারে। মদ‍্যপায়ীদের জগতে মজুদকৃত পুরোনো মদের আবেদন সবচাইতে বেশী।

এইভাবে পাস্তুর তার ছাত্রের বাবার মদের কোম্পানিকে বাচিঁয়ে দিলেন বিজ্ঞানের জোড়ে। কিন্তু, গল্পের শেষ সেখানেই নয়। তৎকালীন সময়ে প্রায় ২৫% খাদ‍্য এবং পানিবাহিত রোগের উৎস ছিলো দুধ। এর কারণটাও খুব স্বাভাবিক। দুধ অসাধারণ পুষ্টিকর একটি পানীয়। শর্করা, আমিষ, ফ‍্যাট থেকে শুরু করে কি নেই এই দুধে? যার ফলশ্রুতিতে দুধে ব‍্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারটাও খুব দ্রুত হয়ে থাকে। একটা সহজ উদাহরণের মাধ‍্যমে তা প্রমাণ করা যায়- রসমালাই খাওয়ার সময় আপনি যদি মুখ থেকে চামচ বের করে তা আবার মিষ্টির হাড়ির মধ‍্যে ঢুকিয়ে দেন তাহলে কয়েক ঘন্টার মাঝেই সেই রসমালাইয়ের হাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, আপনার মুখের ব‍্যাকটেরিয়া সেই হাড়ির দুধের মাঝে মনের আনন্দে বংশবিস্তার করতে থাকবে এবং উপজাত হিসেবে এসিড তৈরি করে দুধের স্বাদ টক বানিয়ে দিবে।

অনেক মরণঘাতী রোগের ব‍্যাকটেরিয়া তখন দুধের মাধ‍্যমে মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়তো। ১৯১২ থেকে ১৯৩৫ সালের মাঝে কেবল মাত্র ইংল‍্যান্ডেই দুধবাহিত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ মারা যায়। মদের ব‍্যবসা বাচাঁতে গিয়ে পাস্তুর আসলে জীবন বাচাঁনো এক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন।  তার সেই ফুটিয়ে বাজারজাত করার আইডিয়া কেবল মদ নয়; বরং অনেক পচনশীল তরল পদার্থকেই দীর্ঘ সময়ের মজুদযোগ‍্যতা দিতে পারে। তখন থেকেই গরুর দুধ ১০০ ডিগ্রীর সামান‍্য নিচের তাপমাত্রায় ফুটিয়ে বাজারজাত করাকে বাধ‍্যতামূলক করা হয়। পাস্তুরের প্রতি সম্মান জানাতে এই প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হয় “পাস্তুরাইজেশন”।

আপনি বাজারে গেলেই এখন দুধের প‍্যাকেটে লেখা দেখবেন “পাস্তুরিত তরল দুধ”। মর্মার্থ হলো, এই দুধকে সেই উনবিংশ শতকের আবিষ্কৃত প্রক্রিয়ার মাধ‍্যমে ৬৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ৩০ মিনিট ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে। তবে এভাবে পাস্তুরিত দুধ সাধারণত এক সপ্তাহ পর্যন্ত ফ্রিজে ভালো থাকে। গ্রামের পরিবেশে বিদ‍্যুৎবিহীন বাড়িতে পাস্তুরিত তরল দুধও নষ্ট হয়ে যায়। তাই, পরবর্তীকালে পাস্তুরাইজেশনের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা হলো যাতে দুধকে একটু বেশী তাপমাত্রায় (১৩৫ ডিগ্রীতে ২ সেকেন্ড) ফোটানো হবে। এর নাম দেয়া হয় Ultra High Temperature (UHT) পাস্তুরাইজেশন। UHT দুধ তাই কোন ফ্রিজ ছাড়াই তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ক্ষতিকর জীবাণুমুক্ত থাকে। তবে যেই মুহুর্তে আপনি প‍্যাকেট খুলবেন সেই মুহুর্ত থেকেই এর ভেতর পরিবেশের ব‍্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে তার পচন শুরু করবে। তাই, UHT দুধ প‍্যাকেট খোলার পর ফ্রিজে রাখতে হয় অথবা সাথে সাথেই খেয়ে ফেলতে হয়।

একটা বিশাল সময় পর্যন্ত ইউরোপের গাভীর ফার্মকে শহরের মধ‍্যেই রাখতে হতো। কারণ, দুধ উৎপাদনের পর পরই তা মানুষের কাছে পৌছাঁনোটা ছিলো বাধ‍্যতামূলক। একটু দেরী হলেই সেই দুধে বাসা বাঁধবে ব‍্যাকটেরিয়ার বংশ। লুইস পাস্তুরের মদের কারখানার সেই আবিষ্কার আমাদের জন‍্য দীর্ঘসময় পর্যন্ত নিরাপদে পানযোগ‍্য দুধ নিশ্চিত করেছে। মানব সভ‍্যতার বিকাশে যতগুলো আবিষ্কারের বেশ বড়সড় প্রভাব রয়েছে তার একটা তালিকা বানানো হলে ‘পাস্তুরাইজেশন’ অবশ‍্যই বেশ উপর দিকেই থাকবে।

In the fields of observation, chance favours only the prepared mind. (Louis Pasteur)

অনুবাদ: বিজ্ঞানের জগতে ভাগ‍্য কেবল অবলোকনকারীরই সহায় হয়।

Author

Shamir Montazid

This author leads a dual lifestyle. In daylight, he is a badass genetic engineer trying to dance with DNA. At night, he turns himself into 'The Heisenberg'. He was last seen cooking some funky biology and chemistry tutorials in his Meth-lab.
Shamir Montazid
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?