হাইজেনবার্গের গল্প: স্পার্ম তিমির তেলের গল্প

সামুদ্রিক জীবগুলো সবসময়ই একটু বিচিত্র হয়। স্পার্ম তিমি (Sperm Whale) তাদেরই একজন। এধরণের তিমির মাথায় প্রায় ৩,৬০০ কেজি ‘স্পার্মাসেটি’ তেল জমা থাকে। Sperm Whale এর এই বিপুল পরিমাণ তেলের উৎস হলো তাদের প্রধান খাদ‍্য স্কুইড! কিন্তু, স্কুইড থাকে পানির প্রায় ১-২ কিলোমিটার নিচে যেখানে তাপমাত্রা অনেক কম ও পানির ঘনত্ব সমুদ্রপৃষ্ঠ অপেক্ষা অনেক বেশি! Sperm Whale সারা দিন সমুদ্রের উপরের স্তরেই থাকে। শুধু খাবার সময় ২ কিলোমিটার নিচে ডুব মেরে স্কুইড ডিনার করে আসে।

এই গভীরতায় Sperm Whale কীভাবে সাতাঁর কাটে?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে Sperm Whale এর মাথার স্পার্মাসেটি তেলে। এই তেলের গলনাংক (melting point) ৩১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। কিন্তু, তিমির দেহ তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রী। এ অবস্থায় তিমির দেহের তাপমাত্রা তার মাথায় সঞ্চিত তেলের গলনাংক অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই, সমুদ্রপৃষ্ঠে Sperm Whale এর মাথার তেল থাকে তরল অবস্থায়।

মজার ব‍্যাপার হলো যখন Sperm Whale খাবারের উদ্দেশ‍্যে লম্বা একটা ডুব মেরে ২ কিমি নীচে চলে যায় তখন তার আশেপাশের পানির তাপমাত্রা থাকে অনেক কম। কারণ, সমুদ্রের গভীরে সূর্যালোক কম প্রবেশ করায় সে অংশটা অপেক্ষাকৃত বেশি শীতল। ধরি, ২ কিমি নীচে পানির তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস; যা স্পার্মাসেটি তেলের গলনাংক (৩১ ডিগ্রী) অপেক্ষা কম। তাই, পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় Sperm Whale এর মাথার ৩৬০০ কেজি তেল তখন কঠিন ও ঘন হতে শুরু করে। ব‍্যাপারটা অনেকটা শীতকালে বাসায় নারিকেল তেল জমে যাওয়ার মত।

এখন কথা হলো, গভীর পানিতে Sperm Whale এর মাথার তেল জমে কঠিন ও ঘন হলে কি সুবিধা? মনে করে দেখুন, গভীর পানির ঘনত্ব সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক বেশী। সেই পানিতে সাতাঁর কাটতে হলে আপনার শরীরের ঘনত্বকেও পানির ঘনত্বের সাথে মিলাতে হবে। Sperm Whale সেটা করতে পারে তার মাথা ভর্তি সেই তেলের কারণে। গভীর পানিতে তার মাথার তেল জমে দেহের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়। সে যখন খাবার শেষে আবার সমুদ্রপৃষ্ঠে ফেরত আসে তখন তার মাথার তেল পুনরায় তরল হয়ে পানিতে ভেসে থাকতে সাহায‍্য করে। ব‍্যাপারটা কী অসাধারণ! সমুদ্রের অধিকাংশ প্রাণীই একটা নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে। অথচ, Sperm Whale তার দেহের ঘনত্ব পরিবর্তন করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩কিমি গভীরে পর্যন্ত যেতে পারছে। সবই তার মাথা ভর্তি তেলের কারসাজি!

এককালে মানুষের ধারণা ছিল, Sperm Whale এর মাথা ভর্তি যে সাদা, অর্ধতরল পদার্থ পাওয়া যায় তা হচ্ছে Sperm Whale এর বীর্য বা Sperm. তাই, প্রাথমিক যুগে মানুষ তার নাম দেয় Sperm Whale বা বীর্য তিমি! পরবর্তীকালে মানুষ বুঝতে পারে আসলে এই সাদা পদার্থটা Sperm না, বরং এক ধরণের তেল যা ছাড়া এই তিমি বাচঁতে পারতো না।

এখন আসা যাক ভয়ংকর কথায়। Sperm Whale এর মাথার তেল অতি উত্তম লুব্রিকেটিং জেল এবং বাতির জ্বালানী। সুতরাং, লোভী মানুষ একের পর এক Sperm Whale মারতে শুরু করলো শুধু তার মাথা ভর্তি তেলের জন‍্য। আজ, Sperm Whale পৃথিবীর অতিবিপন্ন প্রায় তিমি গুলোর একটি। 
Homo sapiens is the most ferocious species in this planet.

Author

Shamir Montazid

This author leads a dual lifestyle. In daylight, he is a badass genetic engineer trying to dance with DNA. At night, he turns himself into 'The Heisenberg'. He was last seen cooking some funky biology and chemistry tutorials in his Meth-lab.
Shamir Montazid
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?