টেড (TED) : আইডিয়া শেয়ারিং এর কারখানা

১.

আমরা বেশিরভাগই ভাল্লাগেনা রোগে আক্রান্ত। কিছুতেই কিচ্ছু ভালো লাগেনা। কম খেলেও ভালো লাগে না, বেশি খেলে মোটা হচ্ছি এইভেবে ভালো লাগে না, হাঁটতে ভালো লাগে না, বেশিক্ষণ বসে থাকতেও ভালো লাগে না, পড়তে ভালো লাগে না আবার আমাদের কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই ভালো লাগে না। আমার তো মাঝে মাঝে লেখালেখি করতেও ভালো লাগে না। কেন লাগে না কে জানে!

আমাদের এই ভাল্লাগেনা রোগ কিন্তু অনেক খারাপ। এটা কি করে জানো? ধীরে ধীরে আমাদের প্রোডাক্টিভিটিকে কমিয়ে দেয়। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা দুষ্টচক্র। বুঝিয়ে বলছি। আমার ক্ষেত্রে কি হয় সেটাই বরং বলি। আমি লিখতে বসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হুট করে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। কারণ আমার আর ভালো লাগছেনা। তাই আমি ল্যাপটপটা অন রেখেই চ্যাট করতে বসে গেলাম। চ্যাট করতে করতে সেটাও আর ভালো লাগছে না। তখন হয়তো মন ভালো করানোর জন্য কোনো একটা সিরিজ দেখা শুরু করলাম। দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, এ সময় আমি যদি সিরিজটা না দেখে লেখাটা শেষ করতে পারতাম তাহলে আমি ডেডলাইন পার হওয়ার আগেই জমা দিতে পারতাম।

তারপর যখন আবার লিখতে বসলাম হয়তো বা ভাবছি, “ইশ! একটা লেখাও সময়মত জমা দিতে পারলাম না আমি! কি করলাম জীবনে!” এটা ভেবে আমি হতাশ হয়ে গেলাম। হতাশ হয়ে আবার লিখতে ভাল্লাগছে না। এভাবেই ভাল্লাগেনার দুষ্টচক্রে পড়ে আছি আমরা। আমাদের একবার ভালো লাগে না, এক কাজ ছেড়ে অন্য কাজ ধরি ঐটাও আবার ভালো লাগে না, তখন চিন্তিত হয়ে পড়ি, পরে যখন পূর্বের কাজটা ধরি হতাশ হয়ে আবার আমাদের ভালো লাগে না।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

আচ্ছা তো এই ভাল্লাগেনা চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় কি? তার জন্য দরকার কিছু মোটিভেশন। রেজাল্ট ভালো করলে মানুষ যখন পিঠ চাপড়িয়ে বাহবা দেয় তখন খুব ভালো লাগে না? ইচ্ছা করে না আরো ভালো রেজাল্ট করি? আসলে ঐ পিঠ চাপড়ানোই হল মোটিভেশন।

একটা মেশিন স্মুথলি চলার জন্য যেমন মাঝে মাঝে তেলের দরকার পড়ে, ঠিক তেমনি আমাদেরও এই জীবনে কাজ তরান্বিত করতে দরকার হয় মোটিভেশন এর।

২.

এখন বলি, আমার যখন লেখালেখি করতে আলসেমি লাগে কিংবা ভাল্লাগেনা তখন আমি কি করি সেটা। আমি ইউটিউব ফ্রিক মানুষ। একমাত্র ইউটিউবেই পড়ে থাকতে আমার বেশি ভালো লাগে। তাই কি করি টেডের ভিডিও ছেড়ে দিই। কত গুণী ব্যক্তি তাঁদের জীবনের সংগ্রামের কথা, সফল হওয়ার কাহিনী বলছেন। কত সহজ ভঙ্গিতে!!!

কোনো এক ভাল্লাগেনা দিনে ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে টেডের সাথে আমার পরিচয়। ওদের ইউটিউব চ্যানেলে ঢুকেই দেখি হাজারটা ভিডিও। অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ একটা নির্দিষ্ট পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে সবার সামনে কথা ঝুলি নিয়ে বসেছেন। সেই থেকেই টেডের সাথে আমার যাত্রা শুরু।

তবে টেডের এর যাত্রা শুরু হয়েছে আমার তোমার সবারই জন্মের আগে। ১৯৮৪ সালে।

TED . Technology, Entertainment, Design. আচ্ছা আমি যে এত TED TED করছি, এর মূল কাজ কি? একদম সোজা কথায় এটি এমন একটি মিডিয়া অর্গানাইজেশন যারা কিনা এমন সব কনফারেন্স আয়োজন করে যেখানে অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তিরা এসে কথা বলেন। এবং সেসবের ভিডিও তারা তাদের ওয়েবসাইটে, ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করে।

Image result for TED Talks

১৯৮৪ সালের কথা। রিচার্ড সল উরম্যান ( Richard Saul Wurman ), একজন আর্কিটেক্ট এবং গ্রাফিক ডিজাইনার যার মাথায় প্রথম এসেছিল টেডের ভাবনাটি। তিনি লক্ষ করলেন যে, টেকনোলজি, এন্টারটেইনমেন্ট আর ডিজাইনের একদম অদ্ভুত সুন্দর সম্মিলন ঘটানো যায়। এক কনফারেন্সের আয়োজন করলেন সেই সালেই হ্যারি মার্ক্স ( Harry Marks ) কে সঙ্গে করে।

Image result for Richard Saul Wurman

Richard Saul Wurman

প্রথম আয়োজনটি হয়েছিল কম্প্যাক্ট ডিস্ক দিয়ে। তবে প্রথম টেড কনফারেন্স তেমন সাড়া জাগাতে পারে নি। এবং আর্থিকভাবেও কনফারেন্সটি ছিল ব্যর্থ। তাই পরবর্তী ইভেন্টটি করতে লেগেছিল ৬ বছর। ১৯৯০ সালে দ্বিতীয় আয়োজনটি হয়। এই ইভেন্টটি অবশ্য সাক্সেস্ফুল হয়েছিল। প্রথমদিকে TED কেবল টেকনোলজি, এন্টারটেইনমেন্ট, ডিজাইন এই ভিত্তিক ইভেন্ট আয়োজন করতো। ৯০ দশকের দিকে TED তার বিস্তৃতি বাড়াতে থাকে। বর্তমানে TED বিজ্ঞানিক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে গায়ক, মডেল, অভিনেতারাও এখানে আসেন। বিল ক্লিনটন, বিল গেটস, গর্ডন ব্রাউন, ল্যারি পেইজ, স্টিফেন হকিং এমনকি বলিউডের অভিনেতা শাহরুক খান ও বাদ যান নি; সবাই এসেছেন TED ইভেন্টে।

Image result for TED

বিল গেটস

৩.

ধীরে ধীরে TED জনপ্রিয় হতে থাকে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডাতে নয় বরং পুরো বিশ্বে TEF  বড় হতে লাগলো। ২০০০ পরবর্তী সময় হচ্ছে টেডের সেরা সময়। ২০০০ এর পর থেকেই TED  শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে লাগলো। বর্তমানে এখন টেডকে বিশাল বড় একটা গাছই বলা যায়।

টেড গ্লোবাল (TED Global):

আগে TED শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডাতে অনুষ্ঠিত হতো। যেহেতু ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তাও বাড়ছিল TED যাতে পুরো বিশ্বের সবার কাছেই পৌঁছে যায় সেই কথা মাথায় রেখেই টেড গ্লোবালের পদচারণা শুরু। তখন TED অন্য দেশেও তাদের কনফারেন্সের আয়োজন করতে থাকলো।

 
ফটোশপের দক্ষতায় মুগ্ধ কর সবাইকে!!

 

টেড প্রাইজ (TED Prize) :

TED তার শুরু করল প্রাইজ দেওয়া। অন্য অর্থে সম্মান দেওয়া। যেসব ব্যক্তি পৃথিবীকে সুন্দর, অধিক বাসযোগ্য করার স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন পূরণে কাজ করেন সেইসব চেঞ্জমেকারদের TED এই প্রাইজের মাধ্যমে সম্মাননা জানান।

টেড টকস (TED Talks) :

সবচেয়ে বেশি খ্যাতি এসেছে টেড টকস দ্বারা। এটা হচ্ছে অডিও ভিডিও পডকাস্ট সিরিজ। পুরো বিশ্বে যেসব TED এর সম্মেলন হয় সেখান থেকে বাছাইকৃত বেস্ট বক্তৃতাগুলো মিলে একটা প্লেলিস্ট আছে। যা রিলিজ করা হয় অনলাইনে। ২০০৬ সালের নাগাদ। এবং তুমি চাইলেই যেকোনো দেশের টেড টকস এর ভিডিও দেখে নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে পারো ঘরে বসেই। জানতে পারো অজানাকে, এমনকি হয়তো তোমার নানা প্রশ্নের উত্তর ও পেয়ে যেতে পারো।

প্রথম ৬ টি টেডের ভিডিও নিয়ে ইন্টারনেটে আপলোড করা হয় টেড টকস সিরিজ! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানেই সেপ্টেম্বর মাসেই এর ভিউস এক মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৭ নাগাদ টেড টকস সিরিজটি ছিল টেডের জনপ্রিয়তার মূল কারণ। মূলত, ঘরে বসেই যাতে বিখ্যাত দার্শনিক, থিংকার, লিডার এদের সান্নিধ্যে আসার এক “Global access” হিসেবে কাজ করেছে টেড টকস।

https://www.ted.com/playlists/168/the_first_6_ted_talks_ever 

টেড একটিভ (TED Active )  এবং টেড ফেলো প্রোগ্রাম (TED fellow progam):

 ২০০৮ সালে এর জন্ম। এর কাজ ছিল মানুষ যাতে আরো কম খরচে টেড সম্মেলনে আসতে পারে সেটা।

একই বছরে টেড ফেলো প্রোগ্রামের মাধ্যমে টেড সুযোগ দেয় নতুন উদ্ভাবকদের, যাতে তারা তাদের উদ্ভাবনীর কথা পুরো বিশ্বকে জানিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। টেড নতুনদের জন্য অনেক বড় এক প্ল্যাটফর্ম এর সূচনা করে এর মাধ্যমে।

টেড এক্স (TEDx):

আচ্ছা টেড তো মূলত কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এসবে হয়। এখন ধরো টেড টকস দেখতে দেখতেই আমাদের ইচ্ছা করছে ইশ!যদি টেড টকের কোনো ইভেন্টে যেতে পারতাম। একদম সামনাসামনি বসে হাঁ করে শুনতাম সব সাহসী গল্পগুলো! কত ভালোই না হতো! কিন্তু আমাদের পক্ষে কি এতদূর যাওয়া সম্ভব? তাই টেড এক্স এর সূচনা হয়েছে।

এখানে এক্স মানে হচ্ছে x= Independently organized TED event.

Image result for TEDx

এ ধরনের ইভেন্টে TED সরাসরি মনিটর করে না। ধরো তুমি তোমার ক্যাম্পাসে টেডের মত এক ইভেন্ট আয়োজন করতে চাচ্ছো। তোমার কি করতে হবে, TED থেকে একটা পারমিশন লাইন্সেস নিতে হবে। এর জন্য টেডকে কোনো টাকাও দিতে হয় না। তারপর নিজেই স্বাধীনভাবে টেড ইভেন্টের আয়োজক হয়ে যেতে পারো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেড এক্স ইভেন্টের আয়োজন হয়। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতে নিয়মিত এটি হচ্ছে। পাকিস্তানেও হয়। আর বাংলাদেশেও কম বেশি হচ্ছে। নর্থ সাউথ, বুয়েট এক/দুইবারের মত আয়োজন করেছে।

মূলত, টেডকে একদম তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা। এখন কথা হচ্ছে এই যে লোকালি আমরা আয়োজন করি এখানে গেস্ট স্পিকার হয়ে আসেন কে? স্ব স্ব এলাকার খ্যাতিমান, সফল ব্যক্তিবর্গরাই আসেন।

টেড ট্রান্সলেটর (TED Translator):

আচ্ছা ধরো টেড এক্স শো স্পেনে হচ্ছে। একজন স্প্যানিশ উদ্ভাবক তার মজার উদ্ভাবনের কথা বলছেন। কিন্তু তুমি তো স্প্যানিশ জানো না? আবার আরেক জায়গায় হয়তো ইংরেজিতে বলছে। কিন্তু আমাদের মতই এক পর্তুগিজ ছেলে হয়তো ইংরেজি বুঝছে না। তখন তোমরা কি করবে? সেই সমস্যা দূর করতেই টেড চালু করে টেড ট্রান্সলেটর। ১০০ এর বেশি ভাষায় আজ TED অনুদিত হয়। ভাষা যাতে জ্ঞানের পরিধিকে সীমিত করতে না পারে তাই টেড এটি চালু করে। এবং এই ট্রান্সলেশনের জন্য আমাদের মতো অনেকেই কাজ করছে। তুমি যদি দোভাষী হও বা অনেকগুলো ভাষায় পারদর্শী হও তাহলে দেরি না করে তুমিও হয়ে যাও না একজন টেড অনুবাদক! আয়েরও এক নতুন মাধ্যম হতে পারে।

টেড এড (TED-Ed) :

এটা হচ্ছে আমার নিজের ব্যক্তিগত পছন্দের! কোনো কিছু নিয়ে জানতে চাও? আমরা কেন ডিপ্রেসড হই জানতে চাও? কেন রাতে ভালো ঘুম দরকার? মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস শরীরের কি ক্ষতি করে জানতে চাও? লেখালেখির খুঁটিনাটি নিয়ে টিপস চাও? কিংবা খুব দার্শনিক হয়ে ভাবছো তুমি কে? তোমার বিবর্তন কিভাবে?

তাহলে চোখ বন্ধ করে চলে যাও টেড এড ইউটিউব চ্যানেলে। জেনে যাবে সব উত্তর। মাত্র ৪/৫ মিনিট বা তারও কম সময়ে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে সবকিছু! খুব ইন্টারেস্টিং না!

ঘরে বসে বসে যখন ডিপ্রেসনে ভুগছো অথচ কেন ডিপ্রেসড, এর সাইড ইফেক্ট কিছুই জানো না তাহলে আমি মনে করি এটি একটি মহৌষধ।

২০১২ সালে টেড এড যাত্রা শুরু করে। এখনো প্রায় প্রতিদিন অনেক অনেক মজার মজার,শিক্ষণীয় ভিডিও আপলোড করা হয়।

৪.

বুঝতেই তো পেরেছো টেড এখন এক বিটপি থেকে মহীরুহ হয়ে গিয়েছে। টেড উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য একটাই। “Spread Ideas.” “Ideas worth spreading” এই স্লোগান নিয়েই টেড এগিয়ে যাচ্ছে দুনিয়ার আনাচে কানাচে।

Related image

আমি যখন বসে বসে মুনিবা মাজারির ভয়াবহ এক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে এসে পঙ্গুত্ব বরণ করে নেওয়া সত্ত্বেও নিজের প্যাশন আঁকাআঁকিকে চালিয়ে নেওয়ার গল্প শুনি, কিংবা লিসি ভালসাকেজের মতো অন্যরকম সুন্দরী নারীর গল্প শুনি, কিংবা শাহরুখ খানের শাহরুখ খান হয়ে উঠার পিছনের কাহিনী এবং তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ ভালবাসার কথা শুনি কিংবা আমার মতো বয়সী কাউকেই শিক্ষার জন্য লড়াই করতে দেখি তখন আমার নিজের ভাল্লাগেনা রোগটাকে আর ভাল্লাগেনা। এই ১৮ মিনিট বা তার কম মিনিটের বক্তৃতা গুলো থেকে যখন হাজার হাজার মৌলিক সব আইডিয়া পেতে থাকি তখন ভাল্লাগেনা রোগটা সেরে উঠে। টেড এড “Who am I” এর মত দার্শনিক থিওরি নিয়ে অ্যানিমেশন ভিডিওগুলো একেকটি ওষুধের মতো কাজ করে।

তখন আমার সব কিছুই ভালো লাগে।

মাঝে মাঝে মোটিভেশনের দরকার আছে। আইডিয়া ছড়িয়ে দেওয়ারও দরকার আছে। অন্তত আমরা এতে করে ভাল্লাগেনার দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে  নিজেরাও নতুন নতুন আইডিয়াকে কাজে লাগে নতুন এক দিনের সূচনা করতে পারি!

তথ্যসূত্র:

১। https://www.ted.com/

২। https://www.ted.com/about/our-organization/history-of-ted


 

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?