সময় বাঁচানোর ৫টি অভিনব উপায়!

পুরোটা পড়ার সময় নেই ? ব্লগটি একবার শুনে নাও ।

সবচেয়ে বেশি কোন প্রবাদটা শুনেছো ছোটবেলায়? টপ ফাইভের একটা লিস্ট বানালে তার ভেতর নিশ্চয়ই থাকবে “Time and tide wait for none.” – সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। আসলেই কিন্তু; ভেবে দেখো উপর থেকে এ পর্যন্ত তুমি যে দুটো বাক্য শেষ করে তিন নম্বর বাক্যে চলে এসেছো, এই সময়টুকু কিন্তু তুমি আর ফেরত পাবেনা। প্রতিটা দিন শেষে আমরা কয়জনই বা এটা উপলব্ধি করি? কয়জনই বা শত যান্ত্রিকতার মাঝে পেছন ফিরে তাকাই এই ১,৪৪০টা মিনিটের দিকে?

বোধয় বেশিরভাগেরই বৃদ্ধকালে গিয়ে আফসোসগুলো প্রকট হয়, জীবনের গোধূলিবেলাতে এসেই Ralph Hodgson – এর কবিতাটা কানে বাজে – “Time, you old gipsy man, will you not stay?” সময়ের চিরন্তন নিষ্ঠুর উত্তর, “না।” আটকে রাখা না গেলেও ক্রমশ কমতে থাকা এই সম্পদটার সদ্ব্যবহার আমাদের জীবনকে আরো অনেক সুন্দর করতে ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেটা করতে মনে রাখো এই ৫টি বিষয়।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

১. যত্নের সাথে কাজ বাছাই করো

Do what you love, love what you do. আমরা অনেক কিছুই করতে বাধ্য হই, আমাদের করা লাগে। কিন্তু এছাড়া আমরা অনেক কিছুই করি যেগুলো হয়তো আমাদের পছন্দ না, তবু সবাই করছে দেখে আমরাও করি। এটা কিন্তু ভয়ংকর খারাপ একটা কাজ। আমাদের এমন কিছু সবসময় করা উচিত যা আমরা গর্বের সাথে বলতে পারবো, আনন্দের সাথে করতে পারবো। এমন কোন দায়িত্ব না নেওয়াই ভালো যেটা শেষ করতে না পারার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

কিন্তু সময় বাঁচাতে এর ভূমিকা কেমন? অনেক! এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে কোন একটা কাজের প্রতি তোমার উৎসাহ থাকলে তোমার কাজের গতি ও মান কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আর সময় বেঁচে যায় প্রচুর! যে কাজটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী সেটার অগ্রাধিকারও বেশি, যেটা একটু পরে করলেও চলবে ওটা আরেকটু সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় পরে করাটাই শ্রেয়।  ‘Prioritize’ করার ক্ষেত্রে অনেক কার্যকরী একটা পদ্ধতি হলো ‘The Eisenhower Method’।

Eisenhower Method

২. লগবুক বানাও

ডায়রীর সাথে তো আমরা সবাই পরিচিত। অনেকেরই হয়তো একটা বিশাল সময় কেটেছে ডায়রীর পাতায় স্মৃতিগুলো আটকে রেখে, স্বপ্নগুলো আঁকড়ে ধরে। লগবুক ঠিক এই ডায়রীর মতোই, তবে অনেক বেশী কাজের। সময় বাঁচাতে এর জুড়ি মেলা ভার। ভাবোতো কতবার এমন হয়েছে যে, কোন কাজ করার কথা ছিলো কিন্তু ভুলে গেছো? ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে ‘লগবুক’ এরকম ভুলের বিরুদ্ধে মারাত্মক এক অস্ত্র।

এটা আর কিছুই না, তোমার কি কি কাজ এ মাসে, এ বছরে এমনকি কালকে করা লাগবে তার একটা তারিখ ও সময়সহ শিডিউল। কি, অনেক ঝামেলা মনে হচ্ছে? আসলে কিন্তু একদম সোজা!

কারণ এটা পরীক্ষার কোনো এ্যাসাইনমেন্ট না যে স্যারের নিয়মমাফিক বাঁধাধরা একভাবেই করতে হবে। ব্যাপারটা এভাবে দেখো – যে কাজগুলো তোমার মাথার ভেতর জমতে জমতে ভারী একটা বোঝা হয়ে উঠতো, সেই দুশ্চিন্তাগুলোকে তুমি নোটবুকের পাতার উপর ঢেলে দিলে। আর তুমি হয়ে গেলে একদম হালকা, ফুরফুরে।

আরেকটা ব্যাপার, লগবুকটি ঠিক রাখতে পারলে ঐ কাজগুলো আর হারাবে না কখনোই, আর তোমার লাইফস্টাইলও হয়ে উঠবে আরো সময়োপযোগী। করণীয় কাজগুলি লেখার সময় একই ধরনের কাজগুলো

একসাথে রাখার চেষ্টা করবে কয়েকটা গ্রুপে। আর অবশ্যই অবশ্যই মাথায় রাখবে অপরিকল্পিত অনেক বিপত্তির কথা, যা হতে বাধ্য। অর্থাৎ অতিরিক্ত ‘পারফেকশনিস্ট’ মনোভাব ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। জীবনে সারপ্রাইজ থাকবেই, আর তার ফলে পরিকল্পিত রুটিনে বিঘ্নও ঘটবে – এটাই স্বাভাবিক।

 
এখন জীবন হবে আরও সুন্দর!

জীবনে শুধু পড়াশুনা করলেই হয় না। এর সাথে প্রয়োজন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি। আর তার সাথে যদি থাকে কিছু মোটিভেশনাল কথা, তাহলে জীবনে চলার পথ হয়ে ওঠে আরও সুন্দর।

৩. ‘সময়-অপচয়কারী’ অভ্যাস ত্যাগ করো

আমেরিকান লেখিকা রেজিনা ব্রেটের ভাষায় বললে, “Get rid of anything that isn’t useful, beautiful or joyful.” আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বদভ্যাস রয়েছে। আর এই বদভ্যাসগুলোর মাশুলও দিতে হয় আমাদেরকেই। একটা দিনের কিছুটা সময় আলাদা করে নিজেকে সময় দাও। একটু ভেবে দেখো শেষ এক মাসে কোন কোন জিনিসগুলো তুমি প্রায়ই করেছো, যা তোমার সময় নষ্ট ছাড়া ভালো কোন ফলাফল দেয়নি।

সারা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার প্রতি ১২ মাসে বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে

এখানে বলে রাখা ভালো- ‘বিনোদন’ একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত আসলেই প্রয়োজন, কিন্তু তার থেকে বেশি করলে আর সেটা বিনোদন থাকেনা, ‘সময়ের অপচয়’- এর রুপ ধারণ করে। ফেসবুক-স্ন্যাপচ্যাট-ইন্স্টাগ্রাম ও আড্ডা এই দলে পড়ে, যদি সেটা অত্যধিক পরিমাণে করো। এরকম আরেকটা মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস হলো ‘Multi-tasking’- একই সাথে অনেকগুলো কাজ করতে যাওয়া। এটা যে শুধু ঐ একাধিক কাজের প্রত্যেকটির মানই খারাপ করে দেয় তাই-ই না, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যেও এটা অনেক পীড়াদায়ক।

৪. ‘সময়-সাশ্রয়ী’ অভ্যাস চর্চা করো

আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ব্রিটিশ কবি জন ড্রাইডেন বলেছিলেন, “We first make our habits, and then our habits make us.” আর তার থেকেও প্রায় ২,০০০ বছর আগে এ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “We are what we repeatedly do.” ভিন্ন ভিন্ন সময়ের এই দুই গুণী ব্যক্তির উক্তির সরলরেখাগুলি এসে মিলিত হয়েছে একটি সাধারণ বিন্দুতে – আমাদের অভ্যাসগুলিই আমরা মানুষ হিসেবে কেমন তা নির্ধারণ করে। আর এই অভ্যাসগুলিই আমরা যত সময়োপযোগী ও সময়-সাশ্রয়ী করে তুলতে পারবো, তত আমরা ছাত্র ও কর্মী হিসেবে দক্ষ হয়ে উঠতে পারবো।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন ছাত্র হিসেবে বাইরের কোলাহল-বিক্ষেপ থেকে মুক্ত ও একান্ত নিজের একটা পড়ার ঘর থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা, যেখানে পড়ার আনন্দই হবে অন্যরকম। লাইব্রেরীতে যাওয়ার ও বিভিন্ন গল্পের বই পড়ার অভ্যাস কিন্তু অনেক উপকারী। দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, যতই আমরা বড় হই, সিংহভাগ ছাত্রছাত্রীর বই পড়াটা আর আনন্দের উৎস থাকেনা, হয়ে ওঠে নাম্বার পাওয়ার একটা ক্লান্তিময় প্রয়াস। ধৈর্য না হারিয়ে এক বসায় অনেকখানি পড়ে ফেলতে পারলে সময়টার অনেক সুন্দর ব্যবহার হয়। A stitch in time, saves nine.

একবারে ঠিকমতো কোনো কাজ করতে পারলে পরে আর ওটার পেছনে সংশোধন বা পরিবর্তনের জন্য আলাদা করে সময় ব্যয় করতে হয়না। কিন্তু এটা করার সময় মনে রাখতে হবে ‘Productivity’ যত বাড়বে, ততই দিনের সব কাজ আরো কম সময়ে করা যাবে। আর সেজন্যই দরকার পর্যাপ্ত ঘুম ও নির্দিষ্ট সময় পর পর কাজ থেকে বিরতি।

আমরা অনেকেই আছি যারা সব কাজ নিজে একা করতে চাই, আর তা করতে গিয়ে মানসিক চাপের ভারে নুয়ে পড়ি। পারতপক্ষে এটা না করে মাঝে মাঝে চেষ্টা করবো কাজ অন্য নির্ভরযোগ্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে। ইংরেজিতে একে বলে ‘Delegation’। ‘না’ বলতে জানাও এক ধরণের গুণ।

হাতে অনেকগুলো কাজ থাকলে সবচেয়ে কঠিন কাজটা দিয়ে শুরু করাই শ্রেয়, কারণ কাজের একদম শুরুতেই মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে। আরেকটা খুব ভালো ট্রিক হলো ‘5-minute rule’। এটা আর কিছুই না – যে কাজগুলো ৫ মিনিটের ভেতর শেষ করা যায় ওগুলো পরের জন্য ফেলে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে করে ফেলা।

ইতিবাচক ও করিতকর্মা মানুষদের সাথে চলাফেরা করার চেষ্টা রাখবে। বন্ধুদের ভেতরেও দেখবে দুটো ভাগ আছে; এক দল ইন্জিনের মতো – তোমাকে সামনে নিয়ে যাবে, আরেকদল নোঙরের মতো, তোমাকে পেছনেই টেনে ধরে রাখবে। কাদের সঙ্গ তোমার বিকাশ ঘটাবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করো

এখন যুগটাই বৈজ্ঞানিক আধুনিকতার। ‘Knowledge Doubling Curve’ অনুযায়ী সারা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার প্রতি ১২ মাসে বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এই দ্বিগুণ হওয়ার সময়টাও কমে আসছে প্রতিনিয়ত। চরম প্রগতিশীল এই বিশ্বে সময়েরর সাথে তাল মেলানোর জন্য অনেক সফটওয়্যার, প্রোগ্রাম ও অ্যাপের ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। যেমন ধরো, ‘সময় বাঁচানোর ৫টি অভিনব উপায়‘ এই পুরো আর্টিকেলটি বাসে বসে মোবাইলে ‘Google Keep’- এর মাধ্যমে লেখা। লেখা ছাড়াও অন্যান্য নোটস ও (২) নম্বর এ বলা ‘লগবুকিং’ এর জন্যও এটা ব্যবহার করা যায়।

এরকম আরো কয়েকটি অ্যাপ হলো Any.do ও Evernote ইত্যাদি। তেমনি যেকোন জায়গায় বসে প্রেজেন্টেশন রেডি করে ফেলার জন্য Prezi বা মোবাইলেই জ্যামে বসে যেকোন ডকুমেন্ট পড়া বা ঠিক করে ফেলার জন্য ‘WPS Office’ এর কথা তো না বললেই নয়। এমনই বহু মোবাইল অ্যাপ ও ব্রাউজার এক্সটেনশন তোমার জীবনটাকে আরো সহজ ও সুন্দর করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের জীবনটা অনেক যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। আমরা আজ কীভাবে সময় বাঁচানো যায় তা নিয়ে অনেক কথা বললাম, কীভাবে অনেক পরোক্ষভাবে হলেও বড় একটা প্রভাব ফেলে আমাদের অভ্যাসাদি তাও জানলাম। কিন্তু আমরা যাতে সময় বাঁচাতে গিয়ে আরো যান্ত্রিক না হয়ে যাই। পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে সময়টাকে মজা করে কাটাতেও না ভুলি।

Old School যাতে তাদের নতুন গানে অভিযোগ না করতে পারে ‘ব্যস্ত আমি ভীষণ রকম, সময় তো নেই কোন’। আজকে থেকে, এই মুহূর্ত থেকেই চলো চেষ্টা করার পণ করি – To make the rest of our lives, the best of our lives।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Junaid Aumi

Junaid Aumi is a sports enthusiast, with a liking for all kinds of games. He loves to dance, read books, play football and basketball. He adores listening to music every once in a while.He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.
Junaid Aumi
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?