ডি-ব্রগলী তরঙ্গ

হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

প্রথম যেদিন রকিব তার বন্ধু সজিবের কাছ থেকে জানলো যে কোনো একটা পদার্থেরও তরঙ্গ ধর্ম আছে, সে বিশ্বাসই করেনি। কারণ সে জানে যে তরঙ্গ শক্তি বহন করে এবং তরঙ্গ গতিশীল (স্থির তরঙ্গ ব্যতীত)। একজন সাধারণ মানুষকে যদি বলা হয় যে তার শরীরও তরঙ্গের মত আচরণ করতে পারে, কারণ শরীরের মধ্যকার কণাগুলোর নিজেদের কণা ধর্মের পাশাপাশি তরঙ্গ ধর্মও আছে, তাহলে সে বিশ্বাস নাই করতে পারে। কিন্তু একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ বা পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর ছাত্র এই তথ্যগুলো জানে। রকিব সাধারণ একজন কলেজ ছাত্র; সাধারণত পরীক্ষার আগের রাত ছাড়া তার ঠিকমত পাঠ্যবই পড়া হয় না। কিন্তু সজিব নিয়মিত পড়াশুনা করে। সে তোমাদের পদার্থবিজ্ঞান পাঠ্যবই ছাড়াও আরও অনেক বই পড়ে এবং এই স্মার্টবুকগুলোও নিয়মিত পড়ে। তাই সজিব যখন তথ্যটি জানালো, এটি তো সত্যই হওয়ার কথা! তাও যাচাই করার জন্য সজিবের কাছ থেকে শুনে রকিব ডি-ব্রগলী নামক একজন ফরাসি পদার্থবিদের কাজ নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলো। ডি-ব্রগলী এর সমীকরণ পড়ার মাধ্যমে সে বুঝল যে আসলেই কোনো পদার্থ কণা ধর্মের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে তরঙ্গ ধর্মও দেখাতে পারে।

তাহলে চলো বন্ধুরা, আমরা ডি-ব্রগলীর সমীকরণ নিয়ে জানার আগে ডি-ব্রগলীর বস্তু তরঙ্গ নিয়ে একটু আলোচনা করি।


ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্প
(De Broglie’s Hypothesis of Matter Waves)


রকিব এই অধ্যায়ের আগের স্মার্টবুকগুলো পড়ে নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে বিকিরণ নিরবচ্ছিন্নভাবে (Uninterrupted) বা একবারে একসাথে হয় না। বিকিরণ ছিন্নায়িতভাবে (Shredded) বের হয়। এবং আমরা জানি, বিকিরণ শক্তিরই একটি রূপ। তাই বলা যায় যে, শক্তি একসাথে সবটুকু নিঃসৃত হয় না, বরং গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে বা কোয়ান্টাম হিসেবে নিঃসৃত হয়।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব (Quantum Theory) থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে বিকিরণ বা শক্তির দ্বৈত ধর্ম রয়েছে:
→ কণা ধর্ম,
→ তরঙ্গ ধর্ম।

এই মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও অনেক বছর ধরে কোনো বিজ্ঞানী চিন্তা করেন নি, বা চিন্তা করলেও প্রমাণ করতে পারেন নি যে শক্তির মত পদার্থেরও তরঙ্গ প্রকৃতি থাকতে পারে। পদার্থের অবশ্যই কণা ধর্ম আছে, নাহলে সে পদার্থ হবে কীভাবে? কিন্তু পদার্থেরও তরঙ্গ ধর্ম আছে যা শক্তি বহন করে, ঠিক যেমনিভাবে শক্তির বা বিকিরণেরও কণা ধর্ম আছে। ১৯২৪ সালে প্রথম পদার্থবিদ লুইস ডি-ব্রগলী এই মতবাদ প্রচার করেন যে, পদার্থেরও ঠিক তরঙ্গের মত দ্বৈত প্রকৃতি আছে। আর ঠিকই তো! শক্তির কণা ধর্ম থাকতে পারলে পদার্থের কেন তরঙ্গ ধর্ম থাকতে পারবেনা?

তাহলে আমরা বলতে পারি যে, প্রত্যেকটি চলমান পদার্থ কণার সাথে একটি তরঙ্গ যুক্ত থাকে। হতে পারে এই তরঙ্গটি আমরা বুঝতে পারি না বা অনুভব করতে পারি না, কিন্তু ডি-ব্রগলী গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই অনুকল্প (Hypothesis) প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই তরঙ্গ ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ নামে পরিচিত। আর এই অনন্য তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে ডি-ব্রগলী তরঙ্গদৈর্ঘ্য (De-Broglie’s Wavelength) বলে।


ডি-ব্রগলী সমীকরণ
(De-Broglie’s Equation)


প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে একটি ফোটনের শক্তি,
\(E=h\upsilon\)… … … (i)
আবার, ফোটন কণিকার ভর m এবং আলোর গতিবেগ c হলে, আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমীকরণ অনুসারে,

\(E = mc^{2}\)… … … (ii)

তোমরা নিশ্চয়ই জানো, ফোটনও কিন্তু আলোর বেগে চলে।

(i) ও (ii) হতে পাই,

\(E = mc2 = h\upsilon\)

\(∴ m = \frac{h\upsilon}{c^{2}}\)… … … (iii)

মনে করি, ফোটনের ভরবেগ = P = mc [∵ ফোটনও আলোর বেগে গমন করে ]
তাহলে, (iii) নং এর উভয়পাশে c গুণ করে পাই,

\(mc = \frac{h\upsilon}{c^{2}} \times c\)

বা, \(P = \frac{h\upsilon}{c^{2}} \times c=\frac{h\upsilon}{c}\)… … … (iv)

তোমরা আগের ক্লাসে শিখেছিলে যে, তরঙ্গ বেগ = তরঙ্গের কম্পাঙ্ক × তরঙ্গদৈর্ঘ্য
এই সূত্র ফোটনের বেলায়ও খাটবে। সুতরাং, আমরা লিখতে পারি,

\(c = 𝞾λ\) … … … (v)

সমীকরণ (iv) এ c এর মান বসিয়ে পাই,

\(P = \frac{h\upsilon}{\upsilon \lambda}= \frac{h}{\lambda}\)

\(∴ \lambda= \frac{h}{P}= \frac{h}{mv}\)… … … (vi)

সমীকরণ (vi) তে আমরা দেখতে পাই, একইসাথে তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং ভরবেগ উভয়ই উপস্থিত। অবশ্যই তরঙ্গদৈর্ঘ্য পদার্থের তরঙ্গ ধর্ম এবং ভরবেগ পদার্থের কণা ধর্ম নির্দেশ করছে। তার মানে, এই সমীকরণের মাধ্যমে তেজশক্তির দ্বৈত প্রকৃতি প্রকাশিত হয়েছে।

ব্রগলীর মতবাদ অনুসারে, পদার্থের ক্ষুদ্র কণিকা যেমন গতিশীল একটি ইলেকট্রনকে ফোটন ইত্যাদি কণিকার মত কল্পনা করলে ফোটনের মত এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে,

\( \lambda = \frac{h}{P}= \frac{h}{mv}\)

এখানে, P = mv = পদার্থ কণিকার ভরবেগ।

এই সমীকরণকে ডি-ব্রগলীর সমীকরণ বলে। তাহলে বুঝতেই পারছ, যেকোনো গতিশীল কণার বা পদার্থই তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শনের ক্ষমতা রাখে; কারণ পদার্থ মাত্রই অসংখ্য অণু-পরমাণুর সমষ্টি, যাদের মধ্যে ইলেকট্রন রয়েছে, যা সর্বদা গতিশীল।

এই সমীকরণটি উপরের গল্পে বলা রকিব শিখে নিয়েছে। সে এখন থেকে এই সমীকরণের সাহায্যে গতিশীল কণার তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে পারে।


সঠিক উত্তরে ক্লিক করো


তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা
(Wave Particle Duality)


তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণকে আমরা ফোটন কণার স্রোত হিসেবে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে আমরা ফটো তড়িৎ-ক্রিয়া, কৃষ্ণ-বস্তুর বিকিরণ। পারমাণবিক বর্ণালী ইত্যাদির ব্যাখ্যা পেতে পারি। এটি হল বিকিরণের কণা তত্ত্ব। কিন্ত এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যতিচার, অপবর্তন, সমাবর্তন ইত্যাদি ঘটনার ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যতিচার, অপবর্তন, সমাবর্তন ইত্যাদি আবার বিকিরণের তরঙ্গতত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, বিকিরণ কখনো তরঙ্গের মত, আবার কখনো কণার স্রোতের মত আচরণ করে। তাই বলা যায় যে তরঙ্গতত্ত্ব ও কণাতত্ত্ব একই মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠের মতই পরস্পরের পরিপূরক।

তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা হল একটি ধারণা (Concept), যেই ধারণা বলে যে সকল শক্তি তরঙ্গ-সদৃশ এবং কণা-সদৃশ উভয় ধর্ম প্রদর্শন করে।


দৈনন্দিন জীবনে ডি-ব্রগলী তরঙ্গ


রকিব ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্প নিয়ে বিস্তর পড়াশুনা করার পরে তার কাছে মনে হল, এই জিনিস বাস্তব জীবনে দেখতে পারলে বুঝতে আরও সুবিধা হত। তাই সে আবার সজিবের কাছে গেল বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ খুঁজতে। কিন্তু সজিব জানালো যে এটা আমাদের বাস্তব জীবনে আমরা নিজেদের চোখে দেখতে পাব না। এটি একটি ধারণা বা অনুকল্প।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আসলে ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্পের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই না, বা এর ব্যবহারিক কোনো গুরুত্ব নেই।
ডি-ব্রগলী সমীকরণ অনুযায়ী,

\( \lambda = \frac{h}{mv}\)

এখানে যেহেতু ভরবেগ mv হরে রয়েছে, এবং এরা ধ্রুবক নয়, কাজেই, কোনো পদার্থের ভরবেগ যত কম হবে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ততো বেশি হবে।

বাস্তবে আমরা যেসব পদার্থ দেখি, সেগুলোর ভর অনেক বেশি হয় এবং বেগ অনেক কম হয়। কিন্তু ভর এতই বেশি যে তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুবই কম হয়, যার কারণে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য আমরা পরিমাপ করতে পারি না। কিন্তু যদি একটি ইলেকট্রনের কথা চিন্তা করি, তার ভর অনেক কম এবং বেগ অনেক বেশি। তাই ইলেকট্রনের বেলায় আমরা ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্প খাটাতে পারি; কিন্তু তা আমরা বুঝতে পারবো না। তাই দৈনন্দিন জীবনে আমরা ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্পের উদাহরণ পাই না।
নিচের উদাহরণটি খেয়াল করলে বুঝতে পারবে:

একটি গতিশীল বস্তুর ভর 10g এবং বেগ \(40 ms^{-1}\) হলে এর ডি-ব্রগলী তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে,

\( \lambda = \frac{h}{mv} = \frac{6.63 \times 10^{-34} Js}{0.01 \times 40 kgms^{-1}}= 3.15 × 10^{-33} m\)

এত ক্ষুদ্র মান পরিমাপের কোনো ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়নি এখনো। তাই আমরা বলতে পারি, ডি-ব্রগলী বস্তু তরঙ্গ অনুকল্প শুধুমাত্র পারমাণবিক পর্যায়ের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।


আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা ডি-ব্রগলী তরঙ্গ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।