প্রবাহীর প্রবাহ, সান্দ্রতা, স্টোকসের সূত্র, অন্ত্য বেগ

ঢাকা শহরটা এখন বড্ড ব্যস্ত একটা শহর হয়ে গেছে। ক্লাসের উদ্দেশ্যে সকাল আটটায় যখন রওনা দেই, তখন একই সিগনালে অনেক সময় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়!!! নিচের gif-এ তেমনই ব্যস্ত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে:

ঢাকা শহরে যত মানুষ আর যান চলাচল করে তারা যদি সবাই একটা করে ক্ষুদ্র বৃত্ত হত আর রাস্তার কিছুক্ষণ রেকর্ড করে এরপর সেই রেকর্ডিংটা একটু দ্রুত দেখা হলে ওপরের gif-এর মতই কিছু একটা দেখা যেত, তাইনা? উত্তরটা হ্যাঁ দাও বা না দাও, এটা কিন্তু আসলে আমি আমার “দুঃসহ” সকালের গল্প বলার জন্য দেইনি(আরেকটু আগে রওনা দিলে হয়ত এত দুঃসহ হত না!)। এটা আসলে ব্রাউনীয় গতির gif। আসলে, কঠিন, তরল আর বায়বীয়- পদার্থের তিনটি অবস্থা যখন ছোটবেলায় পড়েছি, তখন কিন্তু শিখেছিলাম যে, তরল আর বায়বীয় পদার্থের অণুগুলো এরকম সবসময় একটা random গতিতে থাকে। সেই গতিটাই ব্রাউনীয় গতি। তাহলে কি সব তরল বা বায়বীয় পদার্থ সমসময় প্রবাহে থাকে? মানে, সব প্রবাহী কি সবসময় প্রবাহিত হয়? তাদের কি কোন স্থির অবস্থা নেই?

অনেকেই হয়ত ধরে ফেলেছ আর না পেরে থাকলে, আমি তো আছিই! উত্তরটা হল-না। সব প্রবাহী সারাক্ষণ প্রবাহে থাকে না। ওপরে আণবিক স্তরের গতি দেখা যাচ্ছে আর স্থির বা গতির অবস্থা এই আণবিক অবস্থা নয়, তাদের সার্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত হয়। তাহলে প্রবাহিত হচ্ছে এমন প্রবাহীর উদাহরণ হল ট্যাপ ছেড়ে দেওয়ায় যে পানি বের হয় সেটা।

এখন, এই প্রবাহীর গতি কিন্তু দুই ধরনের হতে পারে। নিচের gifটা দেখো:

এখানে, একবার পাইপের মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহটা শান্ত থাকে আর অন্যবার একটু বিশৃংখল হয়ে যায়। প্রথমটাকে বলে ধারারেখ প্রবাহ আর দ্বিতীয়টাকে বলে বিক্ষিপ্ত প্রবাহ। এখন বলো, ওপরে যেরকম দেখতে পারছ, সেরকম একবার শান্ত, অন্যবার বিশৃংখল করতে চাইলে কোন ধরনের পরিবর্তন করতে হতে পারে?

এখানে আসলে বেগের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রবাহের ধরন বদল করা হচ্ছে। প্রবাহীর গতি একটা নির্দিষ্ট বেগ পর্যন্ত শান্ত থাকে আর এরপর বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এই বেগের নাম সংকট বেগ। তাহলে, ওপরে সংকট বেগের চেয়ে বেশি গতিতে পানিকে প্রবাহিত হতে দিলেই গতি বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।

এবার, আমি আবার আমার গল্পে ফিরে যাই। কয়দিন হল আমার ঠান্ডা লেগেছে। সেজন্য মা আমাকে একটা কাঁচের বোতলে মধু ভরে এরপর সেটা থেকে একটু নিয়ে খেতে বললেন। এরপর জগ খালি ছিল বলে সেটাতে পানি ভরতে বললেন। পানির কলস কাছে ছিল বলে আমি আগে পানিটাই ভরলাম। এরপর মধু ভরতে গিয়ে দেখি, মধু বের হতে বেশ সময় নিচ্ছে। মধু আর পানি- দুটাই কিন্তু প্রবাহী।

হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

এবার চলো, প্রবাহীর কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য এরকম হচ্ছে সেটা নিয়ে আলোচনা করি। ঘর্ষণ নিয়ে তো আমরা আগে থেকেই জানি, তাইনা? ঘর্ষণের কারণেই একটা সরল দোলক আজীবন দোলে না, থেমে যায়। প্রবাহীরও একটা ধর্ম আছে যার কারণে তার মধ্যে একটা বাধাদানকারী বলের উদ্ভব হয়। এই ধর্মের নাম সান্দ্রতা। তাহলে, বুঝতেই পারছ যে মধুর সান্দ্রতা বল পানির চেয়ে বেশি। যেকোন প্রবাহীকে আসলে অনেকগুলো স্তরে বিভক্ত হিসেবে কল্পনা করা যায়।। সান্দ্রতা এই স্তরগুলোর মধ্যে আপেক্ষিক গতিকে বাধা দেয়।

তোমাদের কি মনে হয় বিজ্ঞানীরা এই পর্যন্ত বলেই থেমে গেছেন যে, এরকম একটা ধর্ম আছে বা এরকম একটা বাধাদানকারী বল আছে? মোটেই না! বরং, এই বল নিয়ে নিউটনেরও সূত্র আছে।

নিউটনের সূত্র অনুসারে, সান্দ্রতার জন্য যেই বাধাদানকারী বল সৃষ্ট হয়, সেটা-
প্রবাহীর স্তরের ক্ষেত্রফলের (A) সমানুপাতিক
দুটি স্তরের মধ্যবর্তী আপেক্ষিক বেগের (v) সমানুপাতিক
স্তরদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্বের (x) ব্যস্তানুপাতিক

তাহলে, লেখা যায়,

\(F \propto A \frac{v}{x}\)

\( \Rightarrow F= A \eta \frac{v}{x}\) [ধ্রুবক]

এবার স্তরগুলোর মধ্যে আপেক্ষিক দশা dv আর দূরত্বকে ক্ষুদ্র ধরে dx লিখলে, অবশেষে লেখা যায়,

\(F= \eta A \frac{dv}{dx}\)

এখানে, \(\eta\) যে ধ্রুবকটা দেখলে তার একটা নাম আছে-সান্দ্রতা গুণাংক বা সান্দ্রতাংক। আর, \( \frac{dv}{dx}\) কে বলা হয় বেগ নতিমাত্রা বা বেগ অবক্রম।

এবার তাহলে, নিচের প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি:


প্রশ্নটি পড়ে উত্তরটি অনুমান করো



সান্দ্রতা সম্পর্কে তো জানা হয়ে গেল, এবার নিচের চিত্রটা দেখি চলো:

gif এর বামদিকে দেখা যাচ্ছে, রুসেফ প্যারাসুট ব্যবহার না করলে কী হতে পারত আর ডানদিকে দেখা যাচ্ছে সে প্যারাসুট ব্যবহার করায় কী হয়েছে। বলাই বাহুল্য, প্যারাসুট ব্যবহার করে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেখতেই পারছ, প্যারাসুট ব্যবহার করায় রুসেফের বেগ কমে গেছে। এই বেগটার নাম অন্ত্য-বেগ বা প্রান্তিক বেগ।

আসলে, বায়ু একটা প্রবাহী আর যেকোন প্রবাহীর মধ্য দিয়ে একটা জিনিস এভাবে নিচে পরলে, তার ওপর তিনটা বল কাজ করে:
জিনিসটার ওজন, W [নিম্নমুখী]
ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা, U
ঊর্ধ্বমুখী সান্দ্রতা বল, F

ঐ জিনিসটা যখন প্রবাহীর মধ্যে দিয়ে পরতে থাকে, একসময় ওপরে আর নিচে সমান বল কাজ করে আর তাই লব্ধি বল শূণ্য হয়, তার মানে ত্বরণও শূণ্য হয় আর বেগ সমবেগ হয়। এই সমবেগটার নাম অন্ত্য-বেগ। চিত্রে দেখো, রুসেফ সমবেগেই পরছিল কিন্তু তার সমবেগ অনেক বেশি ছিল আর প্যারাসুট ব্যবহারে সমবেগ কমে যায়। এমনও অনেকসময় হয় যে, প্যারাসুট এই সমবেগে দ্রুত আসতে সহায়তা করে।

এখানে, রুসেফের জায়গায় যদি একটা গোলক থাকত, তাহলে তার অন্ত্যবেগ নিচের সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা যেত:

\(v= \frac{2r^{2}(ρ_{s}-ρ_{f})g}{2η}\)

এখানে,

v=অন্ত্য-বেগ

r=গোলকের ব্যাসার্ধ

\(\eta\)=সান্দ্রতাংক

\(ρ_{s}\)=গোলকের উপাদানের ঘনত্ব

\(ρ_{f}\)=বায়ুর ঘনত্ব

g=অভিকর্ষজীয় ত্বরণ


ড্রপ ডাউনগুলোতে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত

আবার, বিজ্ঞানী স্টোকস প্রমাণ করেছেন, সেই গোলকের ওপর বাধাদানকারী বল \(r, \eta , v\)-প্রত্যেকের সমানুপাতিক। আর তাকে এভাবে প্রকাশ করা যায়:

\(F=6 \pi r \eta v\)


তাহলে, চলো এবার নিচের বাক্যগুলোর ফাঁকা জায়গায় সঠিক উত্তর বসানোর চেষ্টা করি:


আজকে এই পর্যন্তই। আশা করি, প্রবাহী সম্পর্কিত বিভিন্ন রাশি, ধর্ম আর সূত্র জেনে তোমাদের ভালো লেগেছে। এসব জানা থাকলে তোমরা নতুন নতুন আবিষ্কার করে রুসেফের মত যারা, তাদের সহায়তা করতে পারবে। তোমাদের জন্য রইল 10 Minute School-এর পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা!