হল প্রভাব

হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

বরাবরের মতই কৌতূহলী ইফাজ। সে তার বন্ধু গাব্বুর সাথে গল্প করছে তোমাদের পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের একটি টপিক চুম্বক ও চৌম্বকত্ব নিয়ে। গাব্বু আবার একটু বেশি পড়াশুনা করে। সে ইফাজের সামনে একটি শুকনো কাচদণ্ডকে রেশম দিয়ে ভালভাবে ঘষে ধনাত্মকভাবে আহিত করলো। এরপর এর এক প্রান্ত হাতে ধরে অপর প্রান্তটি নিয়ে পাশে রাখা একটি চ্যাপ্টা ধাতব পরিবাহক দন্ডের কাছে এনে তড়িৎ আবেশ প্রক্রিয়ায় আহিত করলো। এরপর সে ব্যাখ্যা করলো, “কাচদণ্ডকে রেশম দিয়ে ঘষলে এর একপ্রান্তে ধনাত্মক ও অপর প্রান্তে ঋণাত্মক আধান জমা হয়। আর তখন পরিবাহকের এক প্রান্ত কাচদণ্ডের ধনাত্মক দিকের কাছে আনলে পরিবাহকের সব ঋণাত্মক আধানগুলো আকৃষ্ট হয়ে ঐ প্রান্তে চলে আসে। তখন পরিবাহক দণ্ডের অন্য প্রান্তে ধনাত্মক আধানগুলো থাকে, এভাবে একটি সাময়িক বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়।”
ইফাজ বলল, “আরে আমি তো এটা জানিই! নতুন কিছু বল।”
তখন গাব্বু বলল, “তুই স্থির তড়িৎ অধ্যায়টা পরেছিস বলে এটা জানিস। কিন্তু তুই কি জানিস যে, এই একই কাচদণ্ডটি আনা ছাড়াও আমি পরিবাহকের মধ্যে এরকম বিভব পার্থক্য করে দিতে পারবো?” ইফাজ অবাক হয়ে বলে, “কীভাবে, বল।”
গাব্বু বলল, “এই পরিবাহকের মধ্যে যদি এমনভাবে আমি বিদ্যুৎ প্রবাহিত করি যে এর জন্য এই বিদ্যুৎ প্রবাহের দিকের লম্বভাবে একটা চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, তাহলেই এই পরিবাহক দণ্ডের উপরে নিচে দুইদিকে দুইরকম চার্জ চলে যাবে এবং একটি বিভব পার্থক্য সৃষ্টি হবে, ঠিক আবেশের ঘটনার মত। এই ব্যাপারটা ভালভাবে বুঝতে তোর হল প্রভাব নামের একটি টপিক নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে।”
ইফাজ এরপর হল প্রভাব নিয়ে আমাদের স্মার্টবুকটি পড়তে আগ্রহী হল।

তোমরা এই অধ্যায় নিয়ে লেখা আমাদের আগের স্মার্টবুকগুলো পড়েছ নিশ্চয়ই? না পড়ে থাকলে চটজলদি করে পড়ে এসো। পূর্বের স্মার্টবুকটি দেখতে এখানে ক্লিক করো। স্মার্টবুকগুলোতে তোমরা নিশ্চয়ই ফ্লেমিং এর বামহস্ত নীতি সম্পর্কে পড়েছ?
হল বিভব ঠিকমত বুঝার জন্য ফ্লেমিং এর বামহস্ত নীতি সম্পর্কে ধারণা থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ

চলো আগে আমরা নিচের ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে কিছু সংজ্ঞা দেখে নিই, যেগুলি তোমরা আগেও পড়েছ

ড্রপ ডাউনগুলোতে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত

তোমরা শিখেছ যে, চৌম্বক ক্ষেত্রে গতিশীল আধান (Charge) চৌম্বক বল লাভ করে। তাই আধানটি তার গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয় বা সরে যায়। মানে সে যেদিকে যাচ্ছিল, সেদিকে আর যাওয়া হয় না; তার যাওয়ার দিক চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক দ্বারা প্রভাবিত হয়। তোমরা আমেরিকান পদার্থবিদ এডউইন হলের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ? ১৮৭৯ সালে এডউইন হল দেখান যে, শূন্যস্থান বা বায়ুর মত কঠিন পরিবাহকের (Solid Conductor) মধ্য দিয়ে চলমান আধানও চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা বিচ্যুত হয়। ফ্লেমিং এর বামহস্ত নীতি দ্বারা আমরা এই বিচ্যুত হওয়ার দিক নির্ধারণ করতে পারি।
হল আবিষ্কার করেন যে, যখন কোন বিদ্যুৎ প্রবাহবাহী পরিবাহককে চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয়, তখন বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের দিভ ক, উভয়ের সাথে লম্ব বরাবর একটি বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয় বা ভোল্টেজ উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানী হলের নামানুসারে এই ঘটনাকে হল ক্রিয়া (Hall Effect) এবং এই উদ্ভূত ভোল্টেজকে হল বিভব পার্থক্য (Hall Potential Difference) বলে।

কোন চৌম্বক ক্ষেত্রে যখন কোন পরিবাহকের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় বা আধান বাহক চলে, তখন আধান বাহকগুলো চৌম্বক বল লাভ করে, ফলে এগুলো তাদের গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে একপাশে জমা হয়। এতে পরিবাহকের দুই পাশে বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। আমরা পরীক্ষা করে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই আধান বাহকের প্রকৃতি জানা যায়।
হল ক্রিয়া থেকে আমরা চৌম্বক ক্ষেত্রের মানও নির্ণয় করতে পারি।
মজার ব্যাপার কী জানো? হল প্রভাব যখন আবিষ্কৃত হয়, তখনও কিন্তু ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয় নি। ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহ যে আসলে ইলেকট্রনের প্রবাহ, এটা কিন্তু বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না!


হল ক্রিয়ার সাহায্যে আধানের প্রকৃতি নির্ণয়



চিত্র “ক”

উপরের চিত্রে একটি চ্যাপ্টা পাত (Flat strip) আকৃতির কঠিন পরিবাহক দেখানো হল। আসলে পরিবাহকের দৈর্ঘ্য এত ছোট হয় না। কিন্তু তোমাদের বুঝার সুবিধার্থে এত কম দৈর্ঘ্যের পরিবাহক দেখাচ্ছি।
আচ্ছা, তো এর মধ্যে দিয়ে ধনাত্মক X অক্ষ বরাবর বিদ্যুৎ প্রবাহ (I) চলছে, ধনাত্মক Y অক্ষ বরাবর একটি সুষম চৌম্বক ক্ষেত্র B প্রয়োগ করা হল। চিত্রে খেয়াল করবে, তোমাদের বুঝার সুবিধার্থে I এবং B এর পাশে ছোট করে তারা যে অক্ষ বরাবর ক্রিয়াশীল, ঐ অক্ষের নাম লিখে রেখেছি। ধরি, আধানগুলোর সঞ্চরণ বেগ v এবং এগুলো চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা F চৌম্বক বল লাভ করে।

এখন, আধান বাহক যদি ইলেকট্রন হয়, তাহলে সেগুলো বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রচলিত দিকের বিপরীত দিকে গতিশীল হবে, অর্থাৎ X অক্ষ বরাবর ঋণাত্মক দিকে গতিশীল হবে। কিন্তু, আগেই বলেছি যে যখন হল ক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়, তখনও কিন্তু ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয় নি। তাই আমরা বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রচলিত দিক নিয়েই কাজ করবো।


চিত্র “খ”

চিত্র “ক” এর চ্যাপ্টা পাতটিকে যদি আমরা একদম উপর থেকে দেখি, তাহলে চিত্র “খ” এর পাতগুলোর মত দেখতে পাব। এখন, বিদ্যুৎপ্রবাহ সোজা X অক্ষ বরাবর ধনাত্মক দিকে, চৌম্বক ক্ষেত্র তোমাদের কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিন বরাবর ভিতর দিকে (Y অক্ষ বরাবর ধনাত্মক দিকে)। তাহলে, ফ্লেমিং এর বামহস্ত নীতি অনুসারে গতিশীল আধান বাহকগুলো বিদ্যুৎ প্রবাহ এবং চৌম্বক ক্ষেত্র উভয়ের সাথে লম্ব বরাবর, অর্থাৎধনাত্মক Z অক্ষ বরাবর উপরের দিকে চৌম্বক বল লাভ করবে। এই বলের মানকে আমরা F ধরবো।

এখন, আধান বাহক ইলেকট্রন হলে, ইলেকট্রন বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রচলিত দিকের বিপরীত দিকে যাইতে চাইবে, অর্থাৎ X অক্ষ বরাবর ঋণাত্মক দিকে যেতে চাইবে। কিন্তু ইলেকট্রন সেদিকে যেতে পারবেনা, চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা বিচ্যুত হবে। যেহেতু \(F = q × \underline{v}\ \underline{B}\)বল Z অক্ষ বরাবর ধনাত্মক দিকে বা উপরের দিকে কাজ করবে, তাই ইলেকট্রনগুলো পরিবাহকের উপরের দিকে উঠে যাবে। আর পরিবাহকের প্রস্থ বরাবর উপরের প্রান্তে ঋণাত্মক আধান বাহকের উঠে যাওয়ার জন্য নিচের প্রান্তে অতিরিক্ত ধনাত্মক আধান জমা হবে। আর যেহেতু পরিবাহকের দুই প্রান্তে দুইটি ভিন্ন প্রকৃতির আধান জমা হবে, কাজেই দুই প্রান্তের মধ্যে একটি বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হবে।

চিত্রানুযায়ী, উপরের প্রান্তের একটি বিন্দু P এবং নিচের প্রান্তের একটি বিন্দু Q বিবেচনা করে এদের মধ্যে একটি ভোল্টমিটার বসালে আমরা ভোল্টেজ \((V_{H})\) পরিমাপ করতে পারবো। পরিমাপ করে আমরা পাব যে উপরের প্রান্তের চেয়ে নিচের প্রান্তের বিভব বেশি।

কিন্তু যদি আধান বাহক ধনাত্মক হয়, তাহলে আবার চৌম্বক বল F দ্বারা ধনাত্মক Z অক্ষ বরাবর পরিবাহকের খাড়া উপরের দিকে আধান বাহকগুলি বিচ্যুত হবে। তাই পরিবাহকের উপরের প্রান্তে ধনাত্মক আধানের পরিমাণ বাড়বে এবং নিচের প্রান্তে অতিরিক্ত ঋণাত্মক আধানের সৃষ্টি হবে। ফলে দুই প্রান্তের মধ্যে বিভব পার্থক্য তৈরি হবে।

আবার চিত্রানুযায়ী, উপরের প্রান্তের একটি বিন্দু P এবং নিচের প্রান্তের একটি বিন্দু Q বিবেচনা করে এদের মধ্যে একটি ভোল্টমিটার বসালে আমরা ভোল্টেজ \((V_{H})\) পরিমাপ করতে পারবো। পরিমাপ করে আমরা পাব যে উপরের প্রান্তের চেয়ে নিচের প্রান্তের বিভব কম।

আমরা এভাবে কোন পরিবাহককে চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখলে এর মধ্যে গতিশীল আধানের প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। পরিবাহকের উপরের প্রান্তের বিভব নিচের প্রান্তের চেয়ে বেশি হলে বুঝব আধান বাহক ধনাত্মক এবং নিচের প্রান্তের বিভব উপরের প্রান্তের চেয়ে বেশি হলে বুঝব আধান বাহক ঋণাত্মক।



আমরা জানি, আধান বাহকের উপর ক্রিয়াশীল চৌম্বক বল,
\(F_{m} = qvB sin 90° = qvB\) [∵ এখানে v এবং B পরস্পর দুই অক্ষ বরাবর সমকোণে ক্রিয়া করছে ]
আবার, পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য বা বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের জন্য সৃষ্ট আধান বাহকের উপর তড়িৎ বল,
\(F_{e} = qE\) [∵ তীব্রতা, \(E = \frac{F_{e}}{q}\)]

\(= q \frac{V_{H}}{d}\) [ ∵ বিভব, VH = Ed ]

এখন, এই বলদ্বয় যখন সাম্যাবস্থায় থাকে, তখন আমরা লিখতে পারি,

\(F_{m} = F_{e}\)

বা, \(qvB = q \frac{V_{H}}{d}\)

\(∴ V_{H} = Bvd\)

আবার, সঞ্চরণ বেগের সূত্র থেকে আমরা জানি,

\(I = nAvq\)

বা, \(v = \frac{I}{nAq}\)
আগেই লিখেছিলাম যে, A = d × t

\(∴ v = \frac{I}{ndtq}\) … … … (i)

(i) নং সমীকরণ থেকে v এর মান \(V_{H} = Bvd\) সমীকরণে বসিয়ে পাই,
\(V_{H} = \frac{BI}{ntq}\)


সঠিক উত্তরে ক্লিক করো


আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা হল প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।