বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ

Picture3
লেখক: মাইকেল মধুসূদন দত্ত

“এতক্ষণে”– অরিন্দম কহিলা বিষাদে,
জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী!
সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ! শূলিশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ? ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী!
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।”
উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা,
ধীমান্! রাঘবদাস আমি; কী প্রকারে
তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি;-
“হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধূলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জনম তব কোন মহাকুলে?

কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে কেলি রাজহংস পঙ্কজ-কাননে
যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরী, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে?
অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।

ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষণ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?

কহ, মহারথী, এ কি মহারথীপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা!
ছাড়হ পথ; আসিব ফিরিয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্‌ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!

দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কী দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে?


নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে
প্রগল্‌ভে পশিল

দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসের! শাস্তি নরাধমে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পন করে
বনবাসী!
হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য?
প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি,- ভ্রাতৃ-পুত্র তব?

তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে;
“নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি!
নিজ কর্ম-দোষে, হায়, মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!

বিরত সতত পাপে দেবকুল; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী;
প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে!

রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি। পরদোষে কে চাহে মজিতে?”

রুষিলা বাসবত্রাস। গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী,-“ধর্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি; – কোন্‌ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,- এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি?
শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজনে, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!

এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্বরতা কেন না শিখিবে?

গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।”

মূলভাব:
বাংলা মহাকাব্যের একটি অংশ রামায়ণ। এটি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার “রামচন্দ্র” এবং শ্রীলক্ষী অবতার “দেবী সীতা” কে নিয়ে রচিত। রামের বিয়ের পর রাজ প্রলবের সময় রাজা দশরত কৈকিলা কে দেওয়া ওয়াদা আবদ্ধ হয়ে ভরতকে রামের অনুপস্থিতিতে রাজা ঘোষণা করে এবং রামকে ১৪ বছরের জন্য বনবাসে পাঠিয়ে দেয়।রামের সাথে তার স্ত্রী সতী ও তার প্রিয় ছোট ভাই লক্ষণ বনবাসে যায়। এই বনবাসের সময় পঞ্চভূতে রাক্ষসপুরীর রাজকন্যা শূর্পণখা রাম কে পছন্দ হয়। তাই সে রাম কে তার রুপের মায়াজালে আকৃষ্ট করতে একজন কেশবতী সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট সর্বোত্তম সুন্দর নারীর রূপ ধারণ করে এবং রামের কাছে যায়।রাম তার দৈবদৃষ্টি দিয়ে বের করে ফেলে সে রাক্ষসপুরীর রাজকন্যা। এরপর একপর্যায়ে এসে লক্ষণ রেগে যায় এবং শূর্পণখা কে বলে সে রামের স্ত্রী হওয়ার যোগ্য নয়। সেই রাগে শূর্পণখা সতী কে মারতে যায়। কিন্তু লক্ষণের যুদ্ধ বিদ্যার মাধ্যমে লক্ষণ শূর্পণখার নাক ও কান কেটে দেয়।তারপর শূর্পণখা লঙ্কাদ্বীপে গিয়ে তার ভাইয়ে রাবনকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলে এবং সীতার সৌন্দর্য ও গুণের কথা বলে । তাতেই মুগ্ধ হয়ে রাবণ সীতাকে বিয়ে করার জন্য অপহরণ করে নিয়ে যায় এরপর সীতাকে উদ্ধার করার জন্য রাম ও রাবণের মধ্যে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে রাবণের ছোট ভাই বিভীষণ রামের অনুচর ছিল। বিভীষণ একজন ধর্মচারী ও ছিলেন। তাই সে রাবন কে উপদেশ দিলেন যে দেবী সীতা কে রামের কাছে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু তাতে রাবন অস্বীকার করে এবং বিভীষণকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে। তখন বিভীষণ রামের দলে যোগদান করে। এর জন্য বিভীষণকে “দেশদ্রোহী” ও “বিশ্বাসঘাতক” বলে অপবাদ দেয়া হয়। “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” পদ্যে রাম রাবণের যুদ্ধে রাবণের ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ এবং পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদ কে পরবর্তী দিবসে অনুষ্ঠিত মহাযুদ্ধের সেনাপতি ঘোষণা করে। যুদ্ধের জয় নিশ্চিত করতে মেঘনাথকে যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা অগ্নিদেবের পূজা সম্পন্ন করতে বলা হয়। মেঘনাথ ছিল কালজয়ী যোদ্ধা। তাকে কেউ কোন অস্ত্রযোদ্ধা হারাতে পারবে না। তাই লক্ষণ কে নিয়ে বিভীষণ মেঘনাদকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যার পরিকল্পনা করে। বিশেষ বরপ্রাপ্ত অস্ত্র নিয়ে লক্ষণ মায়াদেবীর অনুকূলে বিভীষণকে সাথে নিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে। নিরস্ত্র মেঘনাদকে আক্রমণ করার সময় মেঘনাদের চোখ যজ্ঞাগারে প্রবেশদ্বারে দাঁড়ানো বীর যোদ্ধা (পিতৃব্য) বিভীষণের দিকে পড়ে। মুহূর্তেই মেঘনাদ এর কাছে সব স্পষ্ট হয়ে যায়। সে সময় মেঘনাদ ও বিভীষণের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তাকেই “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যে প্রকাশ করা হয়। এই কবিতার অংশটুকু মেঘনাদবধ কাব্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। এখানে মেঘনাথ কে হত্যা করার বর্ণনা দেয়া হয় বলে এই কাব্যগ্রন্থের নাম দেয়া হয় “মেঘনাদবধ কাব্য”। এখানে বিভীষণের প্রতি মেঘনাদের যে রাগ ছিল তা প্রকাশ করা হয়েছে। মেঘনাদকে এখানে দেশপ্রেমিক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে।


পাঠ পরিচিতি:

“বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটুকু মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ‘বধো’ (বধ) নামক ষষ্ঠ সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। সর্বমোট নয়টি সর্গে বিন্যস্ত ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের। রামচন্দ্র কর্তৃক দ্বীপরাজ্য স্বর্ণলঙ্কা আক্রান্ত হলে রাজা রাবণ শত্রুর উপর্যুপরি দৈব-কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদকে পিতা রাবণ পরবর্তী দিবসে অনুষ্ঠেয় মহাযুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে বরণ করে নেন। যুদ্ধজয় নিশ্চিত করার জন্য মেঘনাদ যুদ্ধযাত্রার পূর্বেই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা অগ্নিদেবের পূজা সম্পন্ন করতে মনস্থির করে। মায়া দেবীর আনুকূল্যে এবং রাবণের অনুজ বিভীষণের সহায়তায়, লক্ষ্মণ শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। কপট লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদের কাছে যুদ্ধ প্রার্থনা করলে মেঘনাদ বিস্ময় প্রকাশ করে। শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের অনুপ্রবেশ যে মায়াবলে সম্পন্ন হয়েছে, বুঝতে বিলম্ব ঘটে না তার।
ইতোমধ্যে লক্ষ্মণ তলোয়ার কোষমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাকে সময় না দিয়ে আক্রমণ করে। এ সময়ই অকস্মাৎ যজ্ঞাগারের প্রবেশদ্বারের দিকে চোখ পড়ে মেঘনাদের; দেখতে পায় বীরযোদ্ধা পিতৃব্য বিভীষণকে। মূহুর্তে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায় তার কাছে। খুল্লতাত বিভীষণকে প্রত্যক্ষ করে দেশপ্রেমিক নিরস্ত্র মেঘনাদ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেই নাটকীয় ভাষ্যই “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” অংশে সংকলিত হয়েছে। এ অংশে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়েছে ঘৃণা। জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও জাতিসত্তার সংহতির গুরুত্বের কথা যেমন এখানে ব্যক্ত হয়েছে তেমনি এর বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রকে অভিহিত করা হয়েছে নীচতা ও বর্বরতা বলে।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাল্মীকি-রামায়ণকে নবমূল্য দান করেছেন এ কাব্যে। মানবকেন্দ্রিকতাই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সারকথা। ওই নবজাগরণের প্রেরণাতেই রামায়ণের রাম-লক্ষ্মণ মধুসূদনের লেখনীতে হীনরূপে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদ যাবতীয় মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত। দেবতাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাম-লক্ষ্মণ নয়, পুরাণের রাক্ষসর্জ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদের প্রতিই মধুসূদনের মমতা ও শ্রদ্ধা। “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। প্রথম পঙক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় পঙক্তির চরণান্তের মিলহীনতার কারণে এ ছন্দ ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে সমাধিক পরিচিত। এ কাব্যাংশের প্রতিটি পঙক্তি ১৪ মাত্রায় এবং ৮+৬ মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যস্ত। লক্ষ করার বিষয় যে, এখানে দুই পঙক্তির চরণাধিক মিলই কেবল পরিহার করা হয়নি, যতিপাত বা বিরামচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারও হয়েছে বিষয় বা বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে। এ কারণে ভাবপ্রকাশের প্রবহমানতাও কাব্যাংশটির ছন্দের বিশেষ লক্ষ্মণ হিসেবে বিবেচ্য।


কবি পরিচিতি
আধুনিক বাংলা কবিতার অগ্রদূত মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাজনারায়ণ দত্ত, জননী জাহ্নবী দেবী।

মায়ের তত্ত্বাবধানে গ্রামেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। মধুসূদন ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার হিন্দু কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তিনি পিতৃপ্রদত্ত নামের শুরুতে ‘মাইকেল’ নাম যোগ করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে তাঁকে হিন্দু কলেজ পরিত্যাগ করে শিবপুরের বিশপ্স কলেজে ভর্তি হতে হয়। এখানেই তিনি গ্রিক, লাতিন ও হিব্রু ভাষা শিক্ষার সুযোগ পান। মধুসূদন বুৎপন্ন ছিলেন বহু ভাষার। ইংরেজি ও সংস্কৃতিসহ ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষাতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। হিন্দু কলেজে ছাত্রাবস্থায় তাঁর সাহিত্যচর্চার মাধ্যম ছিল ইংরেজি ভাষা। কিন্তু বিদেশি ভাষার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি মাতৃভাষার কাছে ফিরে আসেন। মাতৃভাষা বাংলা রচিত অমর কাব্যের তিনি স্রষ্টা। রোমান্টিক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের আশ্চর্য মিলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে। দেশপ্রেম, স্বাধীনতা চেতনার এবং নারী-জাগরণ মধুসূদনের সাহিত্যের প্রধান সুর। মধুসূদন-পূর্ব হাজার বছরের বাংলা কবিতার ছন্দ ছিল পয়ার। একটি চরণের শেষে আর একটি চরণের মিল ছিল ওই ছন্দের অনড় প্রথা। মধুসূদন বাংলা কবিতার এ প্রথাকে ভেঙে দিলেন। তিনি প্রথম চরণের সঙ্গে দ্বিতীয় চরণের মিল রক্ষা করেননি বলেই তাঁর প্রবর্তিত ছন্দকে বলা হয় ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। তবে এটি বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দেরই নবরূপায়ণ। তাঁর শ্রেষ্ঠতম কীর্তি ‘মেঘনাদ-বধ কাব্য’ এ ছন্দের সফল প্রয়োগ ঘটে। এ ছন্দে আরও কিছু নতুন বিষয় তিনি যোগ করেছিলেন বলে একে বলা হয় ‘১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতি স্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দ’। বাংলায় চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটেরও প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলা নাটকের উদ্ভবযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার তিনি। আধুনিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ ও ‘কৃষ্ণকুমারী’ ও প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ ও ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলি। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯এ জুন কলকাতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত মৃত্যুবরণ করেন।


শব্দার্থ ও টীকা-

  • বিভীষণ- রাবণের কনিষ্ঠ সহোদর। রাম-রাবণের যুদ্ধে স্বপক্ষ ত্যাগকারী। রামের ভক্ত।
  • ‘এতক্ষণে’- অরিন্দম কহিলা-রুদ্ধদ্বারা নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণ যে পথপ্রদর্শক বিভীষণ, তা অনুধাবন করে বিস্মিত ও বিপন্ন মেঘনাদের প্রতিক্রিয়া।
  • অরিন্দম-  অরি বা শত্রুকে দমন করে যে। এখানে মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।
  • পশিল-  প্রবেশ করল।
  • রক্ষঃপুরে- রাক্ষসদের পুরী বা নগরে। এখানে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে।
  • তাত-  পিতা। এখানে পিতৃব্য অর্থে।
  • নিকষা-  রাবণের মা।
  • শূলীশম্ভুনিভ-  শূলপাণি মহাদেবের মতো।
  • কুম্ভকর্ণ-  রাবণের মধ্যম সহোদর।
  • বাসবজিয়ী-  দেবতাদের রাজা ইন্দ্র বা বাসবকে জয় করেছে যে। এখানে মেঘনাদ। একই কারণে মেঘনাদের অপর নাম ইন্দ্রজিৎ।
  • তস্কর –  চোর।
  • গঞ্জি-  তিরস্কার করি।
  • রামানুজ-  রাম+অনুজ= রামানুজ। এখানে রামের অনুজ লক্ষ্মণকে বোঝানো হয়েছে।
  • শামন-  ভবনে-যমালয়ে।
  • ভঞ্জিব আহবে-  যুদ্ধদ্বারা বিনষ্ট করব।
  • আহবে- যুদ্ধে।
  • ধীমান্-  ধীসম্পন্ন। জ্ঞানী।
  • রাঘব-  রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। এখানে রামচন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে।
  • রাঘবদাস-  রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ।
  • রাবণি-  রাবণের পুত্র। এখানে মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।
  • স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে- বিধাতা চাঁদকে আকাশে নিশ্চল করে স্থাপন করেছেন।
  • বিধু-  চাঁদ।
  • স্থাণু-  নিশ্চল।
  • রক্ষোরথী-  রক্ষকুলের বীর।
  • রথী- রথচালক। রথচালনার মাধ্যমে যুদ্ধ করে যে।
  • শৈবালদলের ধাম- পুকুর। বদ্ধ জলাশয়।
  • শৈবাল-  শেওলা।
  • মৃগেন্দ্র কেশরী –  কেশরযুক্ত পশুরাজ সিংহ।
  • কেশরী –  কেশরযুক্ত প্রাণী। সিংহ।
  • মহারথী-  মহাবীর। শ্রেষ্ঠ বীর।
  • মহারথীপ্রথা- শ্রেষ্ঠ বীরদের আচরণ-প্রথা।
  • সৌমিত্রি- লক্ষ্মণ। সুমিত্রার গর্ভজাত সন্তান বলে লক্ষ্মণের অপর নাম সৌমিত্রি।
  • নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার-  লঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের যজ্ঞস্থান। এখানে যজ্ঞ করে মেঘদান যুদ্ধে যেত। ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে নিরস্ত্র মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা বৈশ্বানর বা অগ্নিদেবের পূজারত অবস্থায় লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে নিহত হয়।
  • প্রগলভে-  নির্ভীক চিত্তে।
  • দম্ভী-  দম্ভ করে যে। দাম্ভিক।
  • নন্দন কানন-  স্বর্গের উদ্যান।
  • মহামন্ত্র-  বলে যথা নরশিরঃ ফণী-মন্ত্রপূত সাপ যেমন মাথা নত করে।
  • লক্ষি- লক্ষ করে।
  • ভর্ৎস- ভর্ৎসনা বা তিরস্কার করছ।
  • মজাইলা- বিপদস্ত্র করলে।
  • বসুধা- পৃথিবী।
  • তেঁই- তজ্জন্য। সেহেতু।
  • রুষিলা-  রাগান্বিত হলো।
  • বাসবত্রাস-  বাসবের ভয়ের কারণ যে মেঘনাদ।
  • মন্দ্র-  শব্দ। ধ্বনি।
  • জীমূতেন্দ্র-  মেঘের ডাক বা আওয়াজ।
  • বলী-  বলবান। বীর।
  • জলাঞ্জলি-  সম্পূর্ণ পরিত্যাগ।
  • শাস্ত্রে বলে,…পর পরঃ সদা!-  শাস্ত্রমতে গুণহীন হলেও নির্গুণ স্বজনই শ্রেয়, কেননা গুণবান হলেও পর সর্বদা পরই থেকে যায়।
  • নীচ- হীন। নিকৃষ্ট। ইতর।
  • দুর্মতি-  অসৎ বা মন্দ বুদ্ধি।

সঠিক উত্তরটি ক্লিক করো-


আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।