এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে

Picture3

 

লেখক: জীবনানন্দ দাশ
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে-সবচেয়ে সুন্দর করুণ;
সেখানে সবুজ ডাঙ্গা ভ’রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল;
সেখানে গাছের নাম: কাঁঠাল, অশ্বথ, বট, জারুল, হিজল;

সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগিয়েছে অরুণ;
সেখানে বারুণী থাকে গঙ্গাসাগরের বুকে-সেখানে বরুণ
কর্নফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল;

সেইখানে শঙ্খচিল পানের বনের মতো হাওয়ায় চঞ্চল,
সেইখানে লক্ষ্মীপেঁচা ধানের গন্ধের মতো অস্ফুট, তরুণ;
সেখানে লেবুর শাখা নুয়ে থাকে অন্ধকারে ঘাসের উপর;
সুদর্শন উড়ে যায় ঘরে তার অন্ধকার সন্ধ্যার বাতাসে;
সেখানে হলুদ শাড়ি লেগে থাকে রুপসীর শরীরের ‘পর
শঙ্খমালা নাম তার: এ বিশাল পৃথিবীর কোনো নদী ঘাসে
তারে আর খুঁজে তুমি পাবে নাকো- বিশালাক্ষী দিয়েছিল বর,
তাই-সে-জন্মেছে নীল বাংলার ঘাস আর ধানের ভিতর।

মূলভাব:

কবি জীবনানন্দ দাশের রচিত “এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে” কবিতার মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র্যে এক অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। কবির মতে আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন সকল দেশ কে হার মানায়। আমাদের আশেপাশের রয়েছে অসংখ্য নাম-না-জানা গাছ-গাছালি, মন মাতানো সুরের পাখির কলতান, নদ-নদী সহ সকল জায়গায় যেন এক অসীম সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নিয়ে বর্ণনা করার সময় কবি বলেন, প্রকৃতির রূপের যেন দুইটি দিক রয়েছে। একটি হচ্ছে পূর্ণতা আর অন্যটি শূন্যতা। ঠিক একই রকম ভাবে আমাদের মনের দিক থেকেও রয়েছে দুটি দিক। একটি হচ্ছে বন্ধুত্ব আর অন্যটি শত্রুতা। এর মাধ্যমে কবি প্রকৃতির সাথে আমাদের মানব জীবনের এক অটুট বন্ধন অঙ্কন করেছেন যা সত্যিই অকল্পনীয়। কবি তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের দেশের প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যৈ বর্ণনা করতে গিয়ে প্রকৃতির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম উপকরণকে তিনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন এবং কতটা আপন করে ভাবেন তা প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে কবির দেশের প্রতি অবিরাম ভালোবাসা প্রকাশ পায়।

আমাদের দেশের রূপ-বৈচিত্র্যে কথা বলতে গিয়ে কবি বলেন, আমাদের দেশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী। আর তাতে রয়েছে অফূরণীয় জল। এছাড়াও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর সাথে সাদৃশ্য রেখে আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাখেলা অসাধারন ভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। যেমন: জলের দেবতা হয়তো অনিঃশেষ জলধারা দিয়ে সর্বদাই আমাদের এই নদ-নদীকে ভরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া কবি মনে করেন আমাদের দেশের ওপর হয়তো মা বিশালাক্ষীর (দেবী দুর্গার একটি রূপ) আশীর্বাদ রয়েছে, তার জন্যই হয়তো আমাদের এই দেশে সর্বদাই বিরাজমান সৌন্দর্যের মেলা।


কবি পরিচিতি

আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ। ১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন বরিশালে ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন সেকালের বিখ্যাত কবি। মায়ের কাছ থেকে তিনি কবিতা লেখার প্রেরণা লাভ করেছিলেন। স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করলেও মূলত ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবেই তিনি জীবন আতিবাহিত করেন।

কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতায় সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভবের এক জগৎ তৈরি করেন। বিশেষ করে গ্রাম বাংলার নিসর্গের যে ছবি তিনি এঁকেছেন, বাংলা সাহিত্যে তাঁর তুলনা চলে না। সেই নিসর্গের সঙ্গে অনুভব ও বোধের বহুতর মাত্রা যুক্ত হয়ে তাঁর হাতে অনন্য সাধারণ কবিতাশিল্প রচিত হয়েছে। এই অসাধারণ কাব্যবৈশিষ্ট্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চিত্ররূপময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়াও ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা, আধুনিক জীবনের বিচিত্র যন্ত্রণা ও হাহাকার এবং সর্বোপরি জীবন ও জগতের রহস্য ও মাহাত্ম্য সন্ধানে তিনি এক অপ্রতিম কবিভাষা সৃষ্টি করেছেন। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন ‘নির্জনতম কবি’ বলে। উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক সৃজন, আলো-আধারের ব্যবহার, রঙের ব্যবহার এবং অনুভবের বিচিত্র মাত্রার ব্যবহারে তার কবিতা লাভ করেছে অসাধারণত্ব। তাঁর নিসর্গবিষয়ক কবিতা বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতাকে তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। জীবনানন্দের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘ঝড়া পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘ বেলা অবেলা কালবেলা’, ‘রূপসী বাংলা’। ‘কবিতার কথা’ তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ এবং ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’ তাঁর বিখ্যাত দুটি উপন্যাস। জীবনান্দ দাশ ১৯৫৪ সালের ২২শে আক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।


ঝটপট সঠিক উত্তরে ক্লিক করো!


এবার এই কবিতাটিকে আরেকটু ভালোভাবে বোঝার জন্য শব্দার্থ ও টীকাগুলো ঝালাই করে নেয়া যাক-

  • এই পৃথিবীতে….সুন্দর করুণ– কবির চোখে সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, মমতারসে সিক্ত, সহানুভূতিতে আর্দ্র ও বিষণ্ন দেশ বাংলাদেশ।
  • নাটা- লতাকবঞ্চ; গোলাকার ক্ষুদ্র ফর বা তার বীজ।
  • সেখানে ভোরের… জাগিছে অরুণ-  বাংলার প্রভাতের সৌন্দর্য ও রহস্যময়তা আঁকতে গিয়ে ভোরে মেঘের আড়াল থেকে গাঢ় লাল সূর্যের আলো বিচ্ছুরণ যেন ধারণ করেছে করমচা বা করমচা ফুলের রং।
  • বারুণী- বরুণানী। বরুণের স্ত্রী। জলের দেবী।
  • সেখানে বারুণী থাকে.. অবিকল জল- জলে পরিপূর্ণ এদেদেশের অসংখ্য নদী-নালা স্রোত ধারার প্রাণৈশ্বর্য ও সৌন্দর্যের রূপ আঁকা হয়েছে এই পঙ্ক্তি দুটির মধ্যে।
  • সেইখানে শঙ্গচিল… অস্ফুট, তরুণ-  বাংলাদেশ প্রাণী আর প্রকৃতির ঐক্য ও সংহতিতে একাকার। পানের বনে হাওয়ায় যে চঞ্চলতা জেগে ওঠে সেই চঞ্চলতা সম্প্রসারিত হয় দূর আকাশের শঙ্খচিলে। আর মিষ্টি ম্রিয়মাণ তরুণ ধানের গন্ধের মতো লক্ষ্মীপেঁচাও মিলেমিশে থাকে প্রকৃতির পরিবেষ্টনীতে।
  • বিশালাক্ষী- যে রমণীর চোখ আয়ত বা টানাটানা। আয়তলোচনা সুন্দরী নারী।
  • সুদর্শন- এক ধরনের পোকা।
  • বিশালাক্ষী দিয়েছিল বর-  এখানে আয়তলোচনা দেবী দুর্গার কথা বলা হয়েছে।
  • আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে কবিতাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।