লোক লোকান্তর

Picture3

লোক লোকান্তর

লেখক: আল মাহমুদ

আমার চেতনা যেন একটি শাদা সত্যিকার পাখি,
বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে;
মাথার ওপরে নিচে বনচারী বাতাসের তালে
দোলে বন্য পানলতা, সুগন্ধ পরাগে মাখামাখি
হয়ে আছে ঠোঁট তার। আর দুটি চোখের কোটরে
কাটা সুপারির রঙ
, পা সবুজ, নখ তীব্র লাল
যেন তার তন্ত্রে মন্ত্রে ভরে আছে চন্দনের ডাল
চোখ যে রাখতে নারি আত বন্য ঝোপের ওপরে।
তাকাতে পারি না আমি রূপে তার যেন এত ভয়

যখনি উজ্জ্বল হয় আমার এ চেতনার মণি,
মনে হয় কেটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে সমস্ত বাঁধুনি
সংসার সমাজ ধর্ম তুচ্ছ হয়ে যাবে লোকালয়।

লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি
আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।


মূলভাব:

এই পৃথিবীর সমাজ সংসারে আবদ্ধ হয়ে কবি আল মাহমুদ বিচ্ছিন্নতাবোধের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে মরে যাচ্ছিলেন। কবির মতে এই সমাজ এই লোকালয় থেকে বের হয়ে কেউ যদি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে পারত, তাহলেই হয়তো তারা তাদের জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেতে।

কবি ধারণা তিনি যদি গ্রাম বাংলার বুকে সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন তাহলে হয়তো সে প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে পেতেন আপন মনে। কবির খুবই ইচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে দুচোখ ভরে দেখার, মন ভরে উপভোগ করার।

প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখার জন্য কবি হয়ে উঠতে চায় পাখির মত সেই পাখি যে ভোরের আকাশে ওঠা সূর্যের সাথে সত্যের মত সাদা হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে চায়। সেই পাখিটি হলো কোভিদ চেতনার এক প্রতিমা, যা সবুজ অরণ্যে কোন এক গাছে বসবাস করে। সেই গাছের ফুলগুলো যেন ঝাল-মিষ্টি, লবঙ্গের মতো। সেই সম্পূর্ণ পাখিকে জুড়ে যেন কবি প্রকৃতিকে আঁকছে ।সেই পাখির উপর-নিচের ঠোঁট পানলতার মতো বাতাসে দোল খাচ্ছে। এই পাখি চন্দন গাছের ডালে অর্থাৎ কাঠ গাছে বসে এমন ভাবে ঠোট নাড়াচ্ছে, যা দেখে কবির মনে হচ্ছে পাখিটি যেন কাউকে কবিতা বলছে। এছাড়া এই পাখির ছোট্ট চোখটি দেখতে একদমই রং কাটা সুপারির মতো মনে হয়। তার পা দেখতে সবুজ আর নখ তীব্র লাল। কবি এই পাখির মধ্যে সম্পূর্ণ প্রকৃতিকে অনুভব করেছেন। কবি চায় সকলে যেন এই বেদনাময় প্রকৃতিকে নিজের মতো করে অনুভব করে। এই অভিপ্রায় নিয়েই কবির এই কবিতাটি লেখা।


কবি পরিচিতি:

আল মাহমুদ ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ই জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মির আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তাঁর পিতার নাম আবদুর রব মির ও মাতার নাম রওশন আরা মির। তিনি বাহ্মণবাড়িয়ায় মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। দীর্ঘদিন তিনি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ ও দৈনিক কর্ণফুলী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে তিনি বাংলা দেশ শিল্পকলা একাডেমিতে যোগদান করেন এবং পরিচালকের পদ থেকে অবসরে যান।

আধুনিক বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ অনন্য এক জগৎ তৈরি করেন। সেই জগৎ যন্ত্রণাদগ্ধ শহরজীবন নিয়ে নয়-স্নিগ্ধ-শ্যামল, প্রশান্ত গ্রামজীবন নিয়ে। গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির চিরায়ত রূপ নিজিস্ব কাব্যভাষা ও সংগঠনে শিল্পিত করে তোলেন কবি আল মাহমুদ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-কাব্যগ্রন্থ: ‘লোক-লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালি কাবিন’, ‘মায়াবি পর্দা দুলে উঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’; শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ: ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’; উপন্যাস : ‘ডাহুকী’, ‘কবি ও কোলাহল’, ‘নিশিন্দা নারী’, ‘আগুনের মেয়ে’ ইত্যাদি। ছোটগল্প : ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’, ‘গন্ধবণিক’।

তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।


সঠিক উত্তরে ক্লিক করো!


এবার কবিতাটি আরেকটু সহজভাবে বোঝার জন্য শব্দার্থ ও টীকাগুলো ঝালাই করে নেয়া যাক-

  • আমরা চেতনা চন্দনের ডালে- কবি তাঁর কাব্যবোধ ও কাব্যচেতনাকে সাদা এক সত্যিকার পাখির প্রতিমায় উপস্থাপন করেছেন। কবির এই চেতনা-পাখি বসে আছে সবুজ অরণ্যের কোনো এক চন্দনের ডালে। এই চন্দন সগন্ধি কাঠের গাছ। আর এর ফুল ঝাল-মিষ্টি লবঙ্গ। কবির কাব্যসত্তার মধুরতার সঙ্গে চন্দনের সম্পর্ক নিহিত।
  • মাথার ওপরে নিচে… হয়ে আছে ঠোঁট তার- চন্দনের ডালে বসে থাকা কবির চেতনা-পাখির ওপরে-নিচে বনচারী বাতাসের সঙ্গে দোল খায় পানলতা। প্রকৃতির এই রহস্যময়-সৌন্দর্যের মধ্যে সুগন্ধি পরাগে মাখামাখি হয়ে ওঠে কবির ঠোঁট, অস্তিত্বের স্বরূপ, কাব্যভাষা।
  • আরো দুটি চোখের কোটরে … ঝোপের ওপরে- কবির অস্তিত্ব জুড়ে চিরায়ত গ্রামবাংলা- দৃষ্টিতে কাটা সুপারির রং। এ যেন চিরায়ত বাংলার রূপ। যতদূর চোখ যায়, কেবল চোখে পড়ে বাংলার অফুরন্ত রং। তার পা সবুজ, নখ তীব্র লাল-এ যেন মাটি আর আকাশে মেলে ধরা কবির নিসর্গ-উপলব্ধির অনিন্দ্যপ্রকাশ। আর সেই সমবেত সৌন্দর্যের তন্ত্রে-মন্ত্রে, রহস্যময়তায় ভরে উঠেছে কবির দৃষ্টি ।
  • তাকাতে পারি না আমি…কবিতার আসন্ন বিজয়- সৃষ্টির প্রেরণায় কবি চিরকালই উদ্বুদ্ধ হন, উজ্জ্বল হয় তাঁর চেতনার মণি। পৃথিবীর কোনো বিধিবিধান, কোনো নিয়মকানুন, কোনো ধর্ম, কোনো সমাজ-সংস্কার বা লোকালয়ের অধীন তিনি আর তখন থাকেন না। তখন সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে চেতনার জগৎ, শব্দসৌধ। তাঁর সেই সৃষ্টির কুসুমাস্তীর্ণ নয়। বিচিত্র টানাপোড়েন ও জীবন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তাকে উত্তীর্ণ হতে হয় কবিতার সার্বভৌমত্বে এবং জয় হয় কবিতার ।

আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা লোক লোকান্তর কবিতাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।