ঐকতান

Picture3

ঐকতান

লেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত- না নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপিরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।

সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে অক্ষয় উৎসাহে-
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি।

জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।
আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি
আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি,

এই স্বরসাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক- রয়ে গেছে ফাঁক।
প্রকৃতির ঐকতানস্রোতে
নানা কবি ঢালে গান নানা দিক হতে;
তাদের সবার সাথে আছে মোর এইখানে যোগ-
সঙ্গ পাই সবাকার, লাভ করি আনন্দের ভোগ,

পাই নে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার,
বাধা হয়ে আছে মোর বেড়াগুলি জীবনযাত্রার।

চাষি খেতে চালাইছে হাল,
তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল-
বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার
তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।

অতি ক্ষুদ্র অংশে তার সম্মানের চিরনির্বাসনে
সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে।

মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গনের ধারে,
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।

জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।

তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা
আমার সুরের অপূর্ণতা।

আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।

কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।

এসো কবি অখ্যাতজনের
নির্বাক মনের।

মর্মের বেদনা যত করিয়া উদ্ধার-
প্রাণহীন এ দেশেতে গানহীন যেথা চারি ধার,
অবজ্ঞার তাপে শুষ্ক নিরানন্দ সেই মরুভূমি
রসে পূর্ণ করি দাও তুমি।

অন্তরে যে উৎস তার আছে আপনারি
তাই তুমি দাও তো উদ্‌বারি।

সাহিত্যের ঐকতানসংগীতসভায়
একতারা যাহাদের তারাও সম্মান যেন পায়-

মূক যারা দুঃখে সুখে,
নতশির স্তব্ধ যারা বিশ্বের সম্মুখে,
ওগো গুণী,
কাছে থেকে দূরে যারা তাহাদের বাণী যেন শুনি।


মূলভাব:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেশি দূর লেখাপড়া করেননি। বিলেতে গিয়েছিলেন পড়াশোনা করার জন্য, কিন্তু পরবর্তীতে পড়াশোনা সম্পন্ন না করেই দেশে ফিরে আসেন। ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে তিনি সবসময় উঁচু পর্যায়ের মানুষের সাথে চলাচল করতেন। কিন্তু তিনি কখনোই কামার-কুমোর , জেলে, তাঁতী কারো সাথেই মন খুলে কথা বলতে পারেননি। তাদের সুখ দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি তিনি দেখতে পারেননি কামার- কুমোর, জেলে, তাঁতিরা তাদের মনের মধ্যে কত কষ্ট নিয়ে জীবনযাপন করে। রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বকবি” উপাধি পেয়েছিলেন। কিন্তু কবির মতে তিনি এই উপাধি যোগ্য নয়‌। বিশ্বকবি মানে যে সম্পূর্ণ বিশ্বকে জানে, সম্পূর্ণ বিশ্বকে নিয়ে যিনি লেখেন। কিন্তু তিনি তো সম্পূর্ণ বিশ্বকে জানেন না।শুধুমাত্র ভ্রমণের বই পড়ে যে সকল জ্ঞান তিনি অর্জন করেছেন তাই সে তার কবিতা, গল্প, কাব্যে প্রকাশ করেছেন। তাই কবি তার নিজের জ্ঞানকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করেন। তার এই জ্ঞান সীমিত, তার ঐ ঘরের জানালা দিয়ে দেখা পর্যন্তই এর সীমা। মাঝেমধ্যে সব বাধা ভেঙ্গে ওপারে চাষার ঘরে উঠান পর্যন্ত কবি গিয়েছিল, কিন্তু সে চৌকাট পেরিয়ে ঘরে ঢোকার সাহস তার হয়নি। তাই সে আহ্বান জানায় সেই সব কবিদের যারা তার এই অপূর্ণতাকে পূরণ করবে। তাই কবি প্রার্থনা করেন যে সকল কবির কবিতা যেন তার সেইসব অসম্পূর্ণতাকে পূরণ করতে সমর্থন হয় এবং তাদের কবিতা যেন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।তিনি বলেছেন, তার কবিতা বিচিত্র পথে অগ্রসর হলেও জীবনের সকল স্তরের পৌঁছাতে পারেনি। ফলে জীবনের শেষ দুয়ারে এসে কবি অনাগত ভবিষ্যতের সেই সব মহৎ কবিদের আবির্ভাব প্রত্যাশা করেছেন, যিনি শ্রমজীবী মানুষের আশীর্বাদ হয়ে সত্য ও কর্মের মধ্যে সৃষ্টি করবে আত্মীয়তার বন্ধন। কবি আরো বলেছেন, ক্ষুদ্র জীবনের সঙ্গে বৃহৎ মানব-জীবনধারার ঐকতান সৃষ্টি না করতে পারলে শিল্পীর গানের পসরা তথা সৃষ্টিসম্ভার যে কৃত্রিমতার পর্যবেশিত হয়ে ব্যর্থ হয়ে যায়, কবিতায় এই আত্মোপলব্ধি প্রকাশ ঘটেছে।


ঝটপট সঠিক উত্তরে ক্লিক করে ফেলো!


কন্টেন্ট ক্রেডিট:
হারুন স্যার
সরকারী বিজ্ঞান কলেজ