রক্তে আমার অনাদি অস্থি

Picture3

রক্তে আমার অনাদি অস্থি

লেখক: দিলওয়ার

পদ্মা তোমার যৌবন চাই যমুনা তোমার প্রেম
সুরমা তোমার কাজল বুকের
পলিতে গলিত হেম।
পদ্মা যমুনা সুরমা মেঘনা
গঙ্গা কর্ণফুলী, তোমাদের বুকে আমি আঁকি নিরবধি
গণমানবের তুলি!
কত বিচিত্র জীবনের রং
চারদিকে করে খেলা,
মুগ্ধ মরণ বাঁকে বাঁকে ঘুরে
কাটায় মারণ বেলা!
রেখেছি আমার প্রাণ স্বপ্নকে বঙ্গোপসাগরেই,
ভয়াল ঘূর্ণি সে আমার ক্রোধ উপমা যে তার নেই!
এই ক্রোধ জ্বলে আমার স্বজন
গনমানবের বুকে-
যখন বোঝাই প্রাণের জাহাজ নরদানবের মুখে!
পদ্মা সুরমা মেঘনা যমুনা
অশেষ নদী ও ঢেউ
রক্তে আমার অনাদি অস্থি,
বিদেশে জানে না কেউ!

মূলভাব:

কবি দিলওয়ার এই কবিতার মাধ্যমে সাগরদুহিতা ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের বন্দনা করেছেন। কবি গণশিল্পী হয়ে নিজের কিছু অভিপ্রায় প্রকাশ করতে চায়। কবির মতে আবহমান ছুটে চলা নদীর মতোই কবি নিজের অস্তিত্বে ধারণ করে আছে এই জাতিসত্তার অস্থি। তাই কবি পদ্মা নদীর মত সাহস, যমুনা নদীর মত মায়া ও সুরমা নদীর মতো সোনার পলিমাটি দিয়ে তৈরি শিল্প অস্ত্র চায়। এই অস্ত্র দিয়েই কবি ছবি এঁকেছেন তাদের অস্তিত্বকে যা তিনি সকলের মাঝে তুলে ধরবেন।

আমাদের চারিদিকে যেমন নানান রঙের সমারোহ রয়েছে তেমনি রয়েছে মৃত্যু।আর এই মৃত্যু আমাদের এতটা ভীত করে যে আমরা কেউ স্বপ্ন দেখার সাহস পাই না। কিন্তু কবি সেই ভয় কে জয় করেছে তার সাহস দিয়ে। মতে তার এই ভয় কে জয় করার পর তার স্বপ্নকে বঙ্গোপসাগরে রেখে এসেছে, যেন সেটা তার দুর্বলতা হয়ে কাজ না করে। এই এই স্বপ্ন থেকে দূরে থাকার শক্তি সাগরের ঘূর্ণায়মান ভয়াল জলরাশির মত তার ক্রোধকে শক্তিমান করবে যা তাকে তার স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাবে। কবি মনে করেন কোভিদ মতোএই ক্রোধ সকল বাঙালির বুকে জ্বলে ওঠে, যখন আমরা নিজেদের সম্পদ বিদেশী শত্রুদের মুখে দিয়ে দেই। এটা দেখে আমাদের শরীরের রক্ত উঠে যায়, অস্থি ফেটে যায়। কিন্তু বিদেশীরা কেউ এটা জানতে পারে না।


কবি পরিচিতি

দিলওয়ার ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের পহেলা জানুয়ারি সিলেট শহরসংলগ্ন সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী ভার্থখলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম দিলওয়ার খান। কবি-জীবনের শুরু থেকেই তিনি জনমনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে পারিবারিক ‘খান’ পদবি বর্জন করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মোহাম্মদ হাসান খান, জননী রহিমুন্নেসা। দিলওয়ার সাধারণ্যে ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। পেশা জীবনে প্রথমে দুমাস শিক্ষকতা করলেও ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘দৈনিক সাংবাদ’ পত্রিকায় এবং ১৯৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক গণকণ্ঠে’ সহকারী সম্পাদক হিসেবে তিনি কাজ করেন। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে ওই পেশা তাঁকে পরিত্যাগ করতে হয়।

তিনি ছিলেন মূলত সার্বক্ষণিক কবি, লেখক ও ছড়াকার। তাঁর কবিতার মূলসুর দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি আস্থা ও দায়বদ্ধতা। গণমানবের মুক্তি তাঁর লক্ষ্য; বিভেদমুক্ত কল্যাণী পৃথিবীর তিনি স্বাপ্নিক। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জিজ্ঞাসা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ‘ঐকতান’, ‘উদ্ভিন্ন উল্লাস’, ‘স্বনিষ্ঠ সনেট’, ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’, ‘সপৃথিবী রইবে সজীব’, ‘দুই মেরু দুই ডানা’, ‘অনতীত পঙ্ক্তিমালা’ তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ : ‘বাংলাদেশ জন্ম না নিলে’। ছড়াগ্রন্থ: দিলওয়ারের শতছড়া’, ‘ছড়ায় অ আ ক খ’। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ‘একুশে পদক’।

কবি দিলওয়ার ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ই অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।


সঠিক উত্তরে ক্লিক করো!


এবার এই কবিতাটি আরেকটু সহজভাবে বোঝার জন্য শব্দার্থ ও টীকাগুলো ঝালাই করে নেয়া যাক-

শব্দার্থ ও টীকা

  • হেম- সূবর্ণ। সোনা।
  • পলিতে গলিতে হেম- গলিত সোনা মেশানো পলিমাটি।
  • গণমানব- প্রান্তিক জনগণ।
  • গণমানবের তুলি- শিল্পী-জনতার তুলি। কবি এখানে গণমানবের শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় জ্ঞাপন করেছেন।
  • মারণ বেলা- হনন কাল। বিনাশ কাল।
  • ঘূর্ণি- ঘূর্ণ্যমান জলরাশি। আবর্তিত জলরাশি।
  • প্রাণের জাহাজ- এখানে জনতা ও জনসম্পদ বোঝাতে ‘প্রাণের জাহাজ’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে।
  • নরদানব- নরপশু। মানুষরূপী দানব। এখানে বিদেশি নরপিচাশদের বোঝানো হয়েছে।
  • অশেষ নদী ও ঢেউ- আবহমান ছুটে চলা নদী ও ঢেউ।
  • রক্তে আমার অনাদি অস্থি- জাতিসত্তার শোণিত এবং অস্থি যে কবি নিজের অস্তিত্বে ধারণ কওে আছেন, এখানে সে-কথাই আলংকারিক ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।

আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা রক্তে আমার অনাদি অস্থি কবিতাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।