সাম্যাবস্থার ধারণা

“জীবনে ব্যালেন্স করে চলতে শিখো”। মানুষ মাত্রই তাকে কারো না কারো থেকে একথাটি শুনতেই হবে। আমাদের জীবনের প্রায় পুরোটাই এই ব্যালেন্স করতে করতেই কেটে যায়। সবাই ভালো ব্যাংক ব্যালান্স চায়, ব্যালেন্স ডায়েট করতে চায়, কাজ এবং বিশ্রামের মাঝে ব্যালেন্স চায়।

আবার এই ব্যালেন্স নষ্ট করার উপাদান ও আমাদের আশে পাশে কম নেই। ধরো, তুমি ব্যালেন্স ডায়েট করার চেষ্টা করছো, একদিন কোন আত্মীয় এর বাড়িতে গিয়ে এতো পরিমাণ মিষ্টি খেলে যে তোমার ব্যালেন্স ডায়েটের বারোটা বেজে গেল।

যাই হোক, এই ব্যালেন্সড থাকাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সাম্যাবস্থা’। আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতেও কিন্তু সাম্যাবস্থা থাকে। যখন কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে তখন আমরা বলি যে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তবে আশার কথা যে, এই সাম্যাবস্থা ঠিক করার উদ্যোগ প্রকৃতি নিজেই নিয়ে নেয়। আবার কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরে যখন আক্রমণ করে, আমাদের শরীরের শ্বেত কণিকারা শরীরকে সাম্যাবস্থায় আনতে প্রাণপণ লড়াই করে যায়।

এমনিভাবে রসায়নেও কিন্তু সাম্যাবস্থা আছে। রসায়নে সাম্যাবস্থা? এটা আবার কিভাবে? তাহলে শুনো, এটা হলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা। বলতে পারো যে, বিক্রিয়ার আবার কি হলো যে তাকে সাম্যাবস্থায় থাকতে হবে? আচ্ছা, ব্যাপারটা হলো বিক্রিয়া বলতে আমরা সাধারনত বুঝি যে, কিছু বিক্রিয়ক দিয়ে দিলাম, কিছু রাসায়নিক কর্মকান্ড হলো, এরপর উৎপাদ পাওয়া গেল। এ ধরনের বিক্রিয়া হলো একমুখী বিক্রিয়া। অন্যভাবে বললে সম্মুখমুখী বিক্রিয়া।

কিন্তু এ রকম বিক্রিয়া খুব বেশি হয়না বা বলা যায় খুব কাছাকাছি হতে পারে। কারন ১০০% বিশুদ্ধ উৎপাদ কখনোই পাওয়া যায় না। এটা কি করে সম্ভব? আমরা তো দেখি যে, বিক্রিয়া শেষ হয়ে বসে থাকে। আমরা খালি চোখে এটিই দেখি যে, বিক্রিয়ক উৎপাদে পরিণত হয়ে গেছে। মামলা শেষ। কিন্তু বাস্তবে বিক্রিয়া কখনোই শেষ হয় না। আমরা খালি চোখে তা দেখতে পাই না। এটা কিভাবে সম্ভব? আরে! আমরা যদি জীবনে সাম্যাবস্থা চাইতে পারি তবে বিক্রিয়া চাইলে দোষ কি?

কোন একটি বিক্রিয়া যখন শুরু হয় তখন বিক্রিয়ার শুরুতে বিক্রিয়কগুলোর ঘনমাত্রা অনেক বেশি থাকে। এরপর বিক্রিয়া সম্মুখদিকে অগ্রসর হয় বা সম্মুখমুখী বিক্রিয়া শুরু হয়। তখন বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা কমতে থাকে এবং উৎপাদের ঘনমাত্রা বাড়তে থাকে। উৎপাদের ঘনমাত্রা একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর পর উৎপাদ আবার বিক্রিয়কে পরিণত হয়। এ বিক্রিয়াকে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়া বলে।


সত্য মিথ্যা যাচাই করো




বিক্রিয়ার শুরুতে কিন্তু সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার গতি অনেক বেশি থাকে। এরপর আস্তে আস্তে এ গতি কমতে থাকে এবং পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার গতি বাড়তে থাকে। একসময় সম্মুখমুখী ও পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার গতি সমান হয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলে রাসায়নিক সাম্যাবস্থা। আর এইভাবে বিক্রিয়ক থেকে উৎপাদ আবার উৎপাদ থেকে বিক্রিয়কে পরিণত হওয়াকে উভয়মুখী বিক্রিয়া বলে।

যেমনঃ H I বিক্রিয়া করে HI (হাইড্রোজেন আয়োডাইড) উৎপন্ন করে।

H₂ + I₂  ⇄ HI

প্রথমে H₂ I₂ বিক্রিয়া করে বা জোড়া লেগে HI উৎপন্ন করে। এটি সম্মুখমুখী বিক্রিয়া। আবার HI বিক্রিয়া করে বা ভেঙ্গে গিয়ে H₂ I₂ উৎপন্ন করে। এটি পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়া। এ দুটি যখন একসাথে হয় তখন তাকে বলে উভয়মুখী বিক্রিয়া।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসায়নিক সাম্যাবস্থা কি তাহলে উভয়মুখী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রেই হয়? উত্তর হলো “হ্যাঁ”। শুধুমাত্র উভয়মুখী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রেই সাম্যাবস্থা প্রযোজ্য।


সঠিক উত্তর গুলো বের করো


হাইলাইট করা শব্দের উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো। 

এখন আমরা রাসায়নিক সাম্যাবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করবো। প্রথমেই আসি সাম্যাবস্থার প্রকারভেদ নিয়ে। বিক্রিয়ক এবং উৎপাদের ভৌত অবস্থার উপর ভিত্তি করে রাসায়নিক সাম্যাবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, একটি হলো, সমসত্ব সাম্যবস্থা এবং অন্যটি অসমসত্ব সাম্যাবস্থা আরেকটি প্রকারভেদ হলো সাম্যাবস্থার উপর নিয়ামকের প্রভাবের উপর ভিত্তি করে। তারা হলো: স্থির সাম্যাবস্থা এবং গতিশীল সাম্যাবস্থা।

রাসায়নিক সাম্যাবস্থার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একটি হলো বিক্রিয়ার গতি এবং অন্যটি হলো ঘনমাত্রা।

ঘনমাত্রা হলো মোলসংখ্যা এবং আয়তনের একটি অনুপাত। অন্যভাবে বললে, মোলসংখ্যাকে আয়তন দিয়ে ভাগ করলে ঘনমাত্রা পাওয়া যায়। ঘনমাত্রাকে S দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

এরপর আসি বিক্রিয়ার গতিতে, সাধারনত কোন বস্তুর গতি বলতে আমরা বুঝি বস্তুটি একক সময়ে কতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেছে। যেমন: কোন বস্তু যদি ১ সেকেন্ডে ৫ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে, তবে তার গতি হবে ৫ মিটার/সেকেন্ড। এখন প্রশ্ন হলো বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে গতি আমরা কি করে মাপবো? বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা ঘনমাত্রার পরিবর্তন দেখে গতি বুঝতে পারি। বিক্রিয়া যখন শুরু হয় তখন বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা কমতে থাকে এবং উৎপাদের ঘনমাত্রা বাড়তে থাকে।


সঠিক উত্তর গুলোতে টিক চিহ্ন দাও




রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বের করার কিন্তু একটা সূত্র আছে। সূত্রটি হলো:

বিক্রিয়ার গতি = ঘনমাত্রার পরিবর্তন/সময়

একটি উদাহরণ দেখা যাক, কোন একটি বিক্রিয়ার শুরুতে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা ছিল 1 mol/L। 10s পরে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা 0.5 mol/L হলে বিক্রিয়াটির গতি কত?

সুতরাং, বিক্রিয়ার গতি = (1-0.5)/(10-0) = 0.05 mol/L.s 

বিক্রিয়ার গতি তাহলে কিভাবে বের করতে হয় তা জানা গেল। এর একক হলো ‘ঘনমাত্রার একক / সময়ের একক’ যেমন: (mol/L) / s।

বিক্রিয়কের প্রাথমিক ঘনমাত্রা 20 mol/L । 20s পরে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা 10 mol/L হলে বিক্রিয়াটির গতি কত?

(সঠিক উত্তরটিতে ক্লীক করো)


এতোক্ষন আমরা বিক্রিয়ার গতি এবং ঘনমাত্রা নিয়ে আলোচনা করলাম। এখন আলোচনা করবো তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে। বিক্রিয়ার গতি এবং ঘনমাত্রা কিন্তু একে অপরের সমানুপাতিক।

বিক্রিয়ার গতি ∝ ঘনমাত্রা

ঘনমাত্রা বাড়লে বিক্রিয়ার গতি বাড়ে, আবার ঘনমাত্রা কমলে বিক্রিয়ার গতি কমে। এর গাণিতিক প্রকাশ হলো:

-\(\frac{dc}{dt}\) ∝ C

এখানে C হলো বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা। \(\frac{dc}{dt}\) হলো বিক্রিয়ার গতি। অনুপাতটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ। dC = ঘনমাত্রার পরিবর্তন, dt = সময়ের পরিবর্তন। তাহলে, \(\frac{dc}{dt}\) হলো “ঘনমাত্রার পরিবর্তন/সময়ের পরিবর্তন” বা বিক্রিয়ার গতি। তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, বিক্রিয়ার গতির আগ নেগেটিভ চিহ্ন কেন বসেছে? আমরা জানি যে, সময়ের সাথে সাথে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে এবং ‘dC = শেষ ঘনমাত্রা – প্রাথমিক ঘনমাত্রা’। তার মান dC এর মান সবসময় নেগেটিভ হবে। কিন্তু বিক্রিয়ার গতি কখনো নেগেটিভ হতে পারে না। সবসময়ই পজিটিভ হতে হবে। তাই বিক্রিয়ার গতি সামনে নেগেটিভ চিহ্ন দেয়া হয়। যাতে এই নেগেটিভ আর dC থেকে প্রাপ্ত নেগেটিভ মান মিলে পজিটিভ হতে পারে।



বিক্রিয়ার গতি ও ঘনমাত্রা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। নিচের লেখচিত্র দেখলে বুঝতে পারবে।

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


সঠিক শব্দটি টেনে নিয়ে শূন্যস্থানে বসিয়ে দিতে ভুলো না 


আরেকটি প্রশ্ন তোমাদের মনে ঘুরতে পারে। তা হলো, রাসায়নিক সাম্যাবস্থার বিক্রিয়ক এবং উৎপাদের ঘনমাত্রার কী হয়? তারা কি সমান থাকে? নাকি কম-বেশি হয়?

কী মনে হচ্ছে তোমাদের? আচ্ছা সহজ করেই বলি। বিক্রিয়ক ও উৎপাদের ঘনমাত্রা সমান হওয়ার কোন প্রয়োজন সাম্যাবস্থায় নেই। যেটা প্রয়োজন তা হলো বিক্রিয়ার গতি সমান হওয়া। ঘনমাত্রা সমান হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।

নিচের লেখচিত্র থেকে আমরা ব্যাপারটা দেখতে পারি।

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


রাসায়নিক সাম্যাবস্থা পুরোটা পড়ার পর অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে পারে। আবার নাও ঘুরতে পারে!
যাই হোক নিচের বলা না বলা প্রশ্ন উত্তর গুলো দেখলে অনেক কিছু পরিস্কার হবে আশা করি।

ড্রপ ডাউনেগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও নিচে কিছু প্রশ্নের উত্তর


সত্য মিথ্যা যাচাই করো





আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে আমরা “সাম্যাবস্থার ধারণা” সম্পর্কে ভালো ধারণা পেয়েছি। বন্ধুরা, আজ এ পর্যন্তই। ভালো থেকো সবাই। সময়ের সঠিক ব্যবহার করবে আর 10 Minute School এর সাথেই থাকবে। তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।