জ্যোতির্বিজ্ঞান

এক রাতে আনাম আর তার বন্ধু রেজওয়ান ছাদে বসে আকাশের তারা গুলো দেখছিলো। রাতের আকাশটি ছিলো বেশ পরিষ্কার। তারাগুলো বেশ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ রেজওয়ান আনামকে প্রশ্ন করে বসে, “আমি যা দেখছি তুমি কি তা দেখছো আনাম?”
অনেকক্ষন চিন্তা করে আনাম রেজওয়ানকে পাল্টা প্রশ্ন করল, “রেজওয়ান, তুমি যা দেখছো তুমি কি নিশ্চিত সেগুলোর আদৌ অস্তিত্ব রয়েছে?” এবার রেজওয়ান একটু নড়েচড়ে বসলো। “এর মানে কি?”

আনাম বলল, “এমনও তো হতে পারে যে তুমি যে তারাটিকে খুব সুন্দরভাবে মিটমিট ভাবে জ্বলতে দেখছো তার কোনো অস্তিত্বই নেই”। রেজওয়ান বলল, “ঠাট্টা করছো নাকি? ব্যাপারটি একটু ভৌতিক হয়ে গল না?”

বন্ধুরা এক বিশাল রহস্যে ঘেরা আমাদের এই মহাবিশ্ব। এর সৃষ্টি থেকে শুরু থেকে বিবর্তন সবকিছুই রহস্যে ঘেরা। আপাতদৃষ্টিতে আনামের কথাগুলোকে নিছকই ঠাট্টা মনে হলেও মহাবিশ্বের বিশালময়তা কিন্তু ব্যাপারটিকে সত্য করে তুলেছে। গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, তারা, উল্কা, ধুমকেতু, পালসার, কোয়েসার, ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, এলিয়েন! কি নেই মহাকাশে? কত অজানা রহস্যে ঘেরা তথ্য মহাকাশের গভীরে লুকিয়ে আছে কে জানে?

জ্যোতির্বিজ্ঞান


মোবাইল স্ক্রিনে swipe করে জেনে নাও যেভাবে আসল আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞান


জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত কয়েকটি তথ্য



বিগ ব্যাং- এবং যেভাবে সৃষ্টি হলো আমাদের মহাবিশ্ব


মহাবিশ্বের শুরু কবে থেকে? কিভাবে সৃষ্টি হল বিশাল এই মহাবিশ্ব? অধিকাংশ বিজ্ঞানী অনন্তকালের মহাবিশ্বের ধারণাকে বাতিল করে দেন তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) এর দ্বিতীয় সূত্রের কারণে। এই সূত্র বলে প্রতিটি প্রক্রিয়াতে বিশৃংখলা (Entropy) সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে। মহাবিশ্ব যদি অনন্ত কাল ধরে থাকত তাহলে এখনকার রূপে নিশ্চয়ই থাকত না। তাছাড়া সূর্য এবং নক্ষত্রগুলো মহাবিশ্বের সঞ্চিত কার্যকর শক্তি ক্রমাগত শোষণ করে একমুখি প্রক্রিয়ায় জ্বলছে, মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে বিরাজ করলে বহু আগেই এই নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যাবার কথা। কিন্তু আসলে তা হচ্ছে না। মহাবিশ্বের উৎপত্তির উৎস হিসেবে যে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) কথা বলা হয়ে থাকে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে ৩টি পর্যবেক্ষণলব্ধ কারণ বলা হয়,

১. আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্পসারিত হচ্ছে।

২. দ্বিতীয়টি হচ্ছে মহাবিশ্বের সবদিকে ছড়িয়ে থাকা একটি সমসত্ত্ব তাপীয় বিকিরণের অস্তিত্ব যা আসলে মহাবিস্ফোরণের মুহূর্তে উদ্ভুত প্রচন্ড তাপের ভগ্নাবশেষকে ব্যাখ্যা করে।

৩. তৃতীয়টি হলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক মৌল এবং যৌগের তুলনামূলক আধিক্য যাদের সৃষ্টি হয়েছে মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী অতি উত্তপ্ত ঘনীভূত পর্যায়ে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে।
মহাবিশ্বের প্রসারণ সম্পর্কে একটি খুব সহজ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধর, তুমি ফুঁ দিয়ে একটি বেলুনকে ফোলাচ্ছো যার গায়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট ছোপ। যখন বেলুনটি ফুলতে থাকে তখন বেলুনের গায়ে ঐ ছোপগুলোর মাঝের দূরত্বও প্রসারিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে ঐ ছোপগুলোকে আমরা ছায়াপথ হিসেবে ধরে নিতে পারি। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে এই উদাহরণে বেলুনের পৃষ্ঠই শুধু আমাদের প্রসারমান মহাবিশ্বে, বেলুনের ভেতরের আয়তনটুকু নয়। আমাদের মহাবিশ্বের ক্রমাগত প্রসারণের ব্যাপারটাও অনেকটা ঐ রকমই।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি বিশেষ তত্ত্ব বিগব্যাং। এই তত্ত্ব অনুসারে ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি বছর আগের কোন এক সময় একটি বিশাল বস্তুপিণ্ডের বিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী জর্জ লেমেটার (Georges Lemaître) এই তত্ত্ব প্রথম প্রকাশ করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে জর্জ লেমেটার এ তত্ত্ব প্রকাশ করলেও এই তত্ত্বকে বিস্তৃত করেন জর্জ গ্যামো। এখন লেমেটারের মতে সৃষ্টির একদম শুরুতে মহাবিশ্বের সকল বস্তু আন্তঃআকর্ষণে পুঞ্জীভূত হয় এবং একটি বৃহৎ পরমাণুতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা একে নামকরণ করেছেন মহাপরমাণু (Supper Atom)। এই পরমাণুটি পরে বিস্ফোরিত হয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। এই মতবাদকে সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেন এডুইন হাবল (Edwin Hubble)

বিগ ব্যাং-এর পরের ১ সেকেন্ডে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, তা সময় অনুসারে নিচে তুলে ধরা হলো-

মোবাইল স্ক্রিনের ডানে ও বামে swipe করে ব্যবহার করো এই স্মার্টবুকটি। পুরো স্ক্রিন জুড়ে দেখার জন্য স্লাইডের নিচে পাবে আলাদা একটি বাটন।

ধারণা করা হয় বিগব্যাং-এর ৩ সেকেণ্ড থেকে ১০০,০০০ বৎসরের মধ্যে সৃষ্ট কণাগুলো শীতল হয়ে উঠে। এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন মিলিত হয়ে তৈরি হয় হাইড্রোজন ও হিলিয়াম পরমাণু। এ ছাড়া এই দুটি পদার্থের সাথে ছিল প্রচুর ইলেক্ট্রন প্লাজমা। সব মিলিয়ে যে বিপুল বস্তুকণার সমাবেশ ঘটেছিল, সেগুলো প্রচণ্ড গতিতে বিগ ব্যাং-এর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। এই সময় এই সকল কণিকাও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ক্রমে ক্রমে এগুলো শীতল হতে থাকলো এবং এদের ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে-কাছাকাছি চলে এসেছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তুপুঞ্জ পৃথক পৃথক দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পত্তন ঘটেছিল গ্যালাক্সি‘র (Galaxy)। আমাদের সৌরজগতও এরূপ একটি গ্যালাক্সির ভিতরে অবস্থান করছে। এই গ্যালাক্সির নাম ছায়াপথ (Milky Way)।

হাবলের সূত্র


বিজ্ঞানী এডুইন হাবল তার মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ মতবাদের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তার মতে, বিগ ব্যাং থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে।
১৯২৯ সালে এডুইন হাবল পরীক্ষা করে দেখলেন যে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বাইরের সমস্ত ছায়াপথ ক্রমশ আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এই সরে যাওয়ার গতিবেগ ঐ ছায়াপথগুলির থেকে আমাদের দূরত্বের সমানুপাতিক। অর্থাৎ একটা ছায়াপথ আমাদের থেকে যত বেশি দূরে, তার সরে যাওয়ার গতিবেগও ততই বেশি। তার মানে আমাদের মহাবিশ্ব প্রকৃতপক্ষেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তার মতবাদ অনুসারে-

১) গভীর মহাকাশে যে সব বস্তু দেখা যায় তা পৃথিবীর সাপেক্ষে এবং একে অপরের সাপেক্ষে একটি আপেক্ষিক বেগে চলে
২) আর এই বেগ পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বের সমানুপাতিক।
হাবলের এই নীতি অনুসারে,
\(v=Hd\)
এখানে H একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা হাবলের ধ্রুবক নামে পরিচিত। এর সঠিক মান এখনও নির্ণয় করা সম্ভব হয় নি। H এর যুক্তিসঙ্গত একটি মান হল \(72kms^{-1}\) /MPs \((1MPs=3.084×10^{19} km)\)।

বলে রাখা ভালো যে হাব্‌লের এই পরীক্ষাই প্রকৃতপক্ষে ‘বিগ ব্যাং’ মডেলের স্বপক্ষে অন্য‌তম যুক্তি। কারণ বিজ্ঞানীরা যখন জানলেন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল, তখনই তাঁরা বুঝলেন যে অতীতে আমাদের এই বিশ্বজগৎ তা হলে অবশ্য‌ই আয়তনে ছোট ছিল এবং এই অতীতেরই কোনো একটা সময়ে হলে আমাদের মহাবিশ্ব ছিল এক চরম তাপমাত্রা ও অসীম ঘনত্বের অবস্থায়। সেখান থেকে শুরু হয়েছিল তার সম্প্রসারণ।