তাপমাত্রা পরিমাপের নীতি, তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র ও ব্যবহার

তাপ


হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

ধরো, তোমার কাছে পানিভর্তি একটি পাত্র আছে। এই অবস্থায় পানির অণুগুলো নড়াচড়া করতে পারে। অর্থাৎ পানির অণুগুলোর নিজস্ব গতিশক্তি রয়েছে। তাপ হচ্ছে সবগুলো পানির অণুর মোট গতিশক্তির পরিমাপ। অর্থাৎ তাপ হচ্ছে এক প্রকার শক্তি। তুমি যখন একটি মোমবাতি জ্বালাও, তখন তাপশক্তি আলোকশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আবার, তুমি যখন বাড়িতে টিউবলাইট জ্বালাও, তখন আলোকশক্তির কিছুটা অংশ তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ তাপ এক বা একাধিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে এবং এক বা একাধিক শক্তি তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। তাপ যেহেতু একটি শক্তি, তাই তাপ শক্তিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ করা যায়। যেমন, রান্না করার কাজে, স্টীম ইঞ্জিন তৈরীতে, রেফ্রিজারেটর তৈরীতে তাপ শক্তিকে কাজে লাগান হয়।

একক: তাপ যেহেতু একটি শক্তি, তাই শক্তির একক ও তাপের একক একই। অর্থাৎ শক্তির একক জুল (J)।


তাপমাত্রা


তোমার কাছে যে এক পাত্র পানি আছে, তার প্রতিটি অণু ভিন্ন গতিশক্তিসম্পন্ন (যা একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে অবস্থান করে)। তাপমাত্রা হচ্ছে পদার্থের অণুগুলোর গতিশক্তির গড় পরিমাপ। তুমি একটি থার্মোমিটার দিয়ে মেপে দেখলে পানির তাপমাত্রা ১০°C। এখানে ১০°C মানে পানির অণুগুলোর মোট শক্তির একটি গড় ধারণা। যখন আমরা কোন পদার্থের সবগুলো অণুর শক্তির একটি গড় পরিমাপ করি, তখন আমরা পদার্থটির তাপমাত্রা পাই।

 

ধরো, তোমাকে দুইটি বস্তু A ও Bদেয়া হল। A এর তাপের পরিমাণ 200 J এবং B এর তাপের পরিমাণ 300 J। এখন বস্তু দুইটিকে যদি পরস্পরের সংস্পর্শে আনা হয়, তাহলে, তাপের প্রবাহ কোনদিকে হবে? A থেকে B এর দিকে? নাকি B থেকে A এর দিকে?

হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

এর উত্তর জানার জন্য আমাদের A ও B এর তাপমাত্রা জানতে হবে। কারণ, তাপের প্রবাহ তাপশক্তির উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তাপমাত্রার উপর।

এখন যদি তোমাকে বলে দেয়া হয় যে, A বস্তুর তাপমাত্রা ২০°C এবং B বস্তুর তাপমাত্রা ৩০°C, তাহলে তুমি সহজেই বলে দিতে পারবে যে, বেশি তাপমাত্রার বস্তু অর্থাৎ B বস্তু থেকে কম তাপমাত্রার বস্তু অর্থাৎ A বস্তুতে তাপের প্রবাহ হবে। তাপের প্রবাহ ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত বস্তু দুটির তাপমাত্রা সমান হয়।

যদি বলি, A বস্তুর তাপমাত্রা ৩০°C এবং B বস্তুর তাপমাত্রা ২০°C হলে তাপের প্রবাহ কেমন হবে?
তাহলে A বস্তু থেকে তাপ B বস্তুতে যাবে, যদিও A বস্তুর তাপশক্তি, B বস্তুর তাপশক্তি অপেক্ষা কম।


তাপমাত্রার পরিমাপ


মি. সেলসিয়াস একদিন ল্যাবে বসে কাজ করছেন। তার দুই বন্ধু মি. কেলভিন ও মি.ফারেনহাইট তার সাথে দেখা করতে এলেন। তিন বন্ধু গল্প করতে করতে ঠিক করলেন যে তারা তাপমাত্রা পরিমাপ করার জন্য যন্ত্র বানাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনজন তিনটি সমআকৃতির কাচনলে কিছুটা পারদ ভরলেন এবং তিনটি পাত্রে কিছু বরফ নিয়ে কাজে লেগে পড়লেন।

 

এবার তারা তাদের কাচনলগুলো বরফে ডুবালেন এবং পাত্রের নিচে তাপ দেয়া শুরু করলেন।তারা লক্ষ্য করলেন, পারদের উচ্চতা কিছুটা বেড়ে এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে এবং বরফ গলতে শুরু করেছে। মি. সেলসিয়াস পারদের ঐ উচ্চতায় কাচনলের গায়ে 0 লিখে দাগাঙ্কিত করেন।একই ভাবে মি. কেলভিন ঐ উচ্চতাকে 273 ও মি.ফারেনহাইট ঐ উচ্চতাকে 32 লিখে দাগাঙ্কিত করেন। একসময় বরফের টুকরাগুলো গলে পানি হয়ে যায়।

সম্পূর্ণ বরফ গলে পানি হয়ে যাবার পর তারা লক্ষ্য করলেন যে, কাচনলে পারদের উচ্চতা বাড়ছে।অর্থাৎ পানির তাপমাত্রা বাড়ছে। পারদের উচ্চতা বাড়তে বাড়তে একসময় স্থির হয়ে যায় এবং তারা লক্ষ্য করেন যে, পাত্রের পানি বাষ্প হতে শুরু করেছে। মি. সেলসিয়াস পারদের ঐ উচ্চতায় কাচনলের গায়ে 100 লিখে দাগাঙ্কিত করেন।একই ভাবে মি. কেলভিন ঐ উচ্চতাকে 373 ও মি.ফারেনহাইট ঐ উচ্চতাকে 212 লিখে দাগাঙ্কিত করেন।

লক্ষ্য করে দেখ, মি. সেলসিয়াস তার স্কেলের সর্বনিম্ন বিন্দুকে 0 ও সর্বোচ্চ বিন্দুকে 100 ধরেছেন। তিনি সর্বোচ্চ বিন্দু ও সর্বনিম্ন বিন্দুর দূরত্বকে 100 টি সমান ভাগে ভাগ করেন। অর্থাৎ তার স্কেলের ভাগসংখ্যা 100 এবং প্রতি ঘরের মান 1।

একইভাবে মি. কেলভিন তার স্কেলের সর্বনিম্ন বিন্দুকে 273 ও সর্বোচ্চ বিন্দুকে 373 ধরেছেন।তার স্কেলের ভাগসংখ্যা 100 এবং প্রতি ঘরের মান 1। এবং মি.ফারেনহাইট তার স্কেলের সর্বনিম্ন বিন্দুকে 32 ও সর্বোচ্চ বিন্দুকে 212 ধরেছেন।তার স্কেলের ভাগসংখ্যা 180 এবং প্রতি ঘরের মান 1।

এখানে মি. সেলসিয়াস ও মি. কেলভিনের স্কেলের ভাগসংখ্যা একই। তাই সেলসিয়াস স্কেলের ১ ঘর কেলভিন স্কেলের ১ ঘরের সমান। কিন্তু ফারেনহাইট স্কেলের ভাগসংখ্যা ভিন্ন হওয়ার কারণে ফারেনহাইট স্কেলের ১ ঘর সেলসিয়াস বা কেলভিন স্কেলের সমান হবেনা।

আমরা জানি,

তিনটি নলেরই সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বিন্দুর দূরত্ব একই।

অর্থাৎ, Lc = Lk = Lf

এখন, যেকোন বিন্দুতে আমরা যদি তাপমাত্রা পরিমাপ করতে চাই, তাহলে ঐ বিন্দু বরাবর তিনটি নলের পারদের উচ্চতা একই হবে।

অর্থাৎ,  Xc = Xk = Xf

এদের অনুপাত ও সমান হবে।

অর্থাৎ, \(\frac{\text{X} ?}{\text{L} ?}=\frac{\text{X}ₖ}{\text{L}ₖ}=\frac{\text{X}?}{\text{L}?}\)

বা, \(\frac{\text{C – 0}}{\text{100 – 0}}=\frac{\text{K – 273}}{\text{373 – 273}}= \frac{\text{F – 32}}{\text{212 – 32}}\) [বিন্দুতে সেলসিয়াস, কেলভিন ও ফারেনহাইট স্কেলের তাপমাত্রা যথাক্রমে C, K ও F ধরে]

বা, \(\frac{\text{C – 0}}{\text{100}}=\frac{\text{K – 273}}{\text{100}}= \frac{\text{F – 32}}{\text{180}}\)

বা, \(\frac{\text{C – 0}}{\text{5}}=\frac{\text{K – 273}}{\text{5}}= \frac{\text{F – 32}}{\text{9}}\)

এখন, তুমি যদি নিজের ইচ্ছামত একটি থার্মোমিটার বানাতে চাও,তাহলে তোমার স্কেল অনুযায়ী নিম্নস্থির বিন্দু (X ⁱᶜᵉ) ও ঊর্ধ্ব স্থির বিন্দু (X ˢᵗᵉᵃᵐ) হিসাব করে যেকোন সময় (X) তাপমাত্রা মাপতে পারবে।

তাহলে, তোমার থার্মোমিটারে যেকোন সময় তাপমাত্রা মাপার সমীকরণটি হবে,

\(\frac{\text{C – 0}}{\text{5}}=\frac{\text{K – 273}}{\text{5}}= \frac{\text{F – 32}}{\text{9}}=\frac{\text{X – Xⁱᶜᵉ}}{\text{Xˢᵗᵉᵃᵐ – Xⁱᶜᵉ }}\)

এই সমীকরণ থেকে এক স্কেলের তাপমাত্রা অন্য স্কেলের তাপমাত্রায় রূপান্তরিত করা যায়।


ড্রপ ডাউনগুলোতে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত।


এসো আবার গল্পে ফিরে যাই। তারা যখন বরফে তাপ দেয়া শুরু করেছিলেন, তখন বরফ তাপ গ্রহণ করে পানিতে এবং পানি তাপ গ্রহণ করে বাষ্পে পরিণত হয়। এই তাপ গ্রহণ করে বরফ দুইটি কাজ করে।

১। অবস্থার পরিবর্তন করে
২। তাপমাত্রার পরিবর্তন করে

বরফ যখন গলতে শুরু করে, তখন সেলসিয়াস স্কেলে এর তাপমাত্রা ধরা হল 0°C। সম্পূর্ণ বরফ গলে যাওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা 0°C এই স্থির থাকে।কিন্তু তখনও তাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল।তাহলে এই তাপ কোথায় গেল? এই তাপ খরচ হয়েছে পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন করতে অর্থাৎ সম্পূর্ণ বরফকে গলিয়ে পানিতে পরিণত করতে। যে তাপ বরফের অবস্থার পরিবর্তন করে একে পানিতে পরিণত করল, এই তাপকে বলা হয় সুপ্ততাপ। যখন সম্পূর্ণ বরফ গলে পানিতে পরিণত হয়, তখন প্রদত্ত তাপ পানির তাপমাত্রা বাড়াতে থাকে। যে তাপ পানির তাপমাত্রার পরিবর্তন করল, এই তাপকে বলা হয় আপেক্ষিক তাপ



ড্রপ ডাউনে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত।


মোবাইল স্ক্রিন (Swipe) করে দেখে নাও বিস্তারিত!