পারিবারিক ও আত্মকর্মসংস্থানমুলক উদ্যোগের হিসাব

পারিবারিক হিসাব ব্যবস্থার ধারণা :

মানুষের সুখের ঠিকানা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের সুখের প্রত্যাশায় প্রতিটি মানুষ তার চিন্তা, কর্মে পরিবারের উন্নততর জীবন যাপনের চিন্তা ভাবনা করে। পরিবারকে সুন্দর ও সুষ্টভাবে পরিচালনার জন্য দরকার একটি পরিকল্পনা, আর এই পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে সঠিক হিসাব ব্যবস্থার প্রয়োগ। পরিবারের আয় ব্যয়ের মধ্যে যদি কোন পরিকল্পনা না থাকে তাহলে ঐ পরিবার কখনোই সুশৃঙ্খল ভাবে জীবন যাপন করতে পারবে না। পরিবারের আয় ব্যয়ের সঠিক হিসাব না থাকলে পরিবারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে ফলশ্রুতিতে পরিবারের সুখ শান্তি বিঘ্নিত হবে। তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত প্রতিটি পরিবারেরও আয়-ব্যয় হিসাব সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।

পরিবার যেহেতু কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয় তাই এর হিসাব ব্যবস্থা সংগত কারণেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত হবে না, মূলত পরিবার হচ্ছে একটি অমুনাফাভোগী চলমান প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত পরিবারেও আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়। অর্থাৎ এখানে আয় আছে এবং ব্যয়ও আছে। সুতরাং আয় ও ব্যয়ের পূর্ব পরিকল্পনা থাকা জরুরী। সুষ্ঠ ভাবে পরিবারকে পরিচালনা করতে হলে অর্থাৎ নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে সুখী জীবন যাপন করতে হলে পরিকল্পিত হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পারিবারিক হিসাব ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য :

পারিবারিক হিসাব ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা :

নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য সুষ্ঠু হিসাব ব্যবস্থা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে পারিবারিক হিসাব ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হলো।

পারিবারিক বাজেট :

বাজেট বলতে বুঝায় পরিকল্পনার সংখ্যাত্মক প্রকাশ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের আয় ও ব্যয়ের পূর্ব পরিকল্পনার সংখ্যাত্বক প্রকাশই হচেছ বাজেট। নির্দিষ্ট সময় বলতে কোন ধরা বাধা নিয়ম নেই। সাপ্তাহিক, মাসিক কিংবা বাৎসরিকও হতে পারে। পারিবারিক বাজেট বলতে বুঝায় পরিবার কেন্দ্রিক আয় ব্যয়ের ভবিষ্যত পরিকল্পনা। অর্থাৎ পরিবারের আয়ের উৎস এবং চাহিদার ভিত্তিতে ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করে যে পূর্বপরিকল্পনা করা হয় তাকেই পারিবারিক বাজেট বলা হয়। বাজেট প্রণয়ন করার মাধ্যমে পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ভিতর আনা হয় যাতে করে আয়ের অতিরিক্ত ব্যয়ের কোন সুযোগ না থাকে। নির্দিষ্ট কাঠামোর ভিতর অর্থাৎ বাজেটের মাধ্যমে পারিবারিক হিসাব নিকাশ পরিচালনা করতে পারলে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যেই সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবন যাপন করা সম্ভব।

পারিবারিক বাজেটের প্রস্তুত প্রণালী :

পারিবারিক বাজেট তৈরির জন্য কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। বাজেট তৈরি ও বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে যদি নির্ধারিত নিয়মনীতি মেনে বাজেট প্রস্তুত করা হয়। পদক্ষেপ গুলো নিম্নরুপ-

পারিবারিক বাজেটের নমুনা :

একটি সার্থক বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নির্ভর করে পরিবারের আর্থ সামাজিক অবস্থার উপর। পরিবারের গঠন, আকৃতি, পরিবারের আয়, সদস্যের রুচিবোধ সামাজিক পরিচিতি ইত্যাদি উপাদান গুলো সক্রিয়ভাবে বাজেট প্রণয়নের সময় বিবেচনায় রাখতে হয়। তাছাড়া প্রতিটি পরিবারের বাজেট একরকম এবং একই মানে তৈরি করা সম্ভব হবে না। মোট কথা হলো আয় ব্যয়ের ভারসাম্য থেকেই একটি পারিবারিক বাজেট তৈরি হয়। ব্যয়ের খাতওয়ারী বণ্টন নির্ভর করবে পারিবারিক কাঠামোর উপর। যেমন- খাদ্য খাতে শতকরা ২০%-২৫% বস্ত্রখাতে ৫%-১০% বাসস্থান খাতে ৩০%-৪০% শিক্ষাখাত ১০%-১৫%, যানবাহন ১৫%-২০% খরচ করা যেতে পারে

পারিবারিক আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতকরণ :

পারিবারিক যে সমস্ত লেনদেনগুলো সংঘটিত হয় সেগুলো বিভিন্ন হিসাব বহিতে লিপিবদ্ধ করা হয়। বিচ্ছিনড়বভাবে লিপিবদ্ধকৃত লেনদেন থেকে পরিবারের আর্থিক বুনিয়াদ এবং আয়-ব্যয়ে কোন চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবারের আর্থিক বুনিয়াদ এবং আয় ব্যয়ের চিত্র পাওয়ার জন্য আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা অপরিহার্য। আর্থিক বিবরণীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের আয় ব্যয়ের চিত্র এবং আর্থিক অবস্থার বিবরণী তৈরির মাধ্যমে আর্থিক বুনিয়াদ কতখানি শক্তিশালী তথা পারিবারিক সম্পদ ও দায়ের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে। পারিবারিক আর্থিক বিবরণীর ধাপসমূহ হলো-

১। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব :
২। আয় ব্যয় বিবরণী :

৩। আর্থিক অবস্থার বিবরণী :

প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের একটি নমুনা ছক নিম্নে দেয়া হলো:

প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের বৈশিষ্ট্য:

১। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব নগদান বই এর মত।
২। এই হিসাবের বাম পার্শ্বে প্রারম্ভিক নগদ তহবিল ও ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে শুরু হয় এবং ডান পার্শ্বে সমাপনী নগদ তহবিল ও ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে শেষ হয়।
৩। এই হিসাবের বাম পার্শ্বে সকল প্রকার প্রাপ্তি এবং ডান পার্শ্বে সকল প্রকার পরিশোধ লিখা হয়।
৪। এই হিসাবের বিভিন্ন প্রাপ্তি ও পরিশোধ লেখার সময় কোন সময় কাল বিবেচনায় আনা হয় না অর্থাৎ চলতি, পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল কালের হিসাব সমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়।
৫। বর্তমান বছরের কোন বকেয়া আয় বা বকেয়া ব্যয়ের লেনদেন এ হিসাবে অর্ন্তভুক্ত হয় না।
৬। এ হিসাবের বাম দিক সর্বদাই বড় হয়। কারণ নগদ প্রাপ্ত টাকার চেয়ে নগদ প্রদান কখনো বেশি হতে পারে না।
৭। স্থায়ী সম্পদের অবচয় সংক্রান্ত লেনদেন এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
৮। এ হিসাব হতে নগদ প্রবাহ জানা যায়।

প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব হতে আয় ব্যয় বিবরণী প্রস্তুত প্রণালী:

প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব হতে আয় ব্যয় বিবরণী প্রস্তুত করার নিয়মাবলী নিম্নে বর্ণনা করা হলো।
১। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের ডেবিট দিকের মুনাফা জাতীয় প্রাপ্তিগুলো আয় ব্যয় বিবরণীর আয়ের দিকে এবং ক্রেডিট দিকের মুনাফা জাতীয় ব্যয়সমূহ আয়-ব্যয় বিবরণীর ব্যয়ের দিকে লিখতে হবে।
২। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের প্রারম্ভিক ও সমাপনী উদ্বৃত্ত আয় ব্যয় বিবরণীতে দেখাতে হয় না।
৩। মূলধন জাতীয় প্রাপ্তি ও প্রদান আয় ব্যয় বিবরণীতে থাকবে না।
৪। মুনাফা জাতীয় প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব আয় ব্যয় বিবরণীতে হিসাবভুক্ত হবে।
৫। শুধুমাত্র চলতি সালের মুনাফা জাতীয় আয় ও ব্যয়, আয় ব্যয় বিবরণীতে হিসাবভুক্ত হবে।
৬। বিগত ও পরবর্তী সালের কোন আয়-ব্যয় আয়-ব্যয় বিবরণীতে আসবে না।
৭। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবে প্রদর্শিত কোন প্রকার সম্পদ ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত দফাসমূহ আয় ব্যয় বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
৮। চলতি বছরের প্রাপ্য আয় ও বকেয়া ব্যয় আয়-ব্যয় বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হবে।
৯। স্থায়ী সম্পদের অবচয় আয়-ব্যয় বিবরণীর ব্যয়ের দিকে বসবে।

প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব হতে আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত প্রণালী :

পারিবারিক হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক অবস্থার বিবরণী তৈরির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে পরিবারের সম্পদ, দায় ও পারিবারিক তহবিল সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।

প্রস্তুত প্রণালী :

১। পরিবারের প্রারম্ভিক সম্পদ থেকে প্রারম্ভিক দায় বাদ দিয়ে পারিবারিক তহবিল নির্ণয় করতে হবে।
২। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের মূলধন জাতীয় প্রাপ্তিগুলো আর্থিক অবস্থার বিবরণী দায়ের পাশে এবং মূলধন জাতীয় ব্যয়গুলো সম্পদের পাশে লিখতে হবে।
৩। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের সমাপনী নগদ ও ব্যাংক জমার উদ্বৃত্ত আর্থিক অবস্থার বিবরণীর সম্পদের দিকে লিখতে হবে।
৪। সম্পদের অবচয় আর্থিক অবস্থার বিবরণী সম্পদের দিকে সংশ্লিষ্ট সম্পদ থেকে বাদ দিয়ে দেখাতে হবে।
৫। যাবতীয় অগ্রিম আয় আর্থিক অবস্থার বিবরণী দায়ের দিকে এবং অগ্রিম ব্যয় আর্থিক অবস্থার বিবরণীর সম্পদের দিকে লিখতে হবে।
৬। বিশদ আয়-ব্যয় বিবরণীর আয় উদ্বৃত্ত আর্থিক অবস্থার বিবরণী দায়ের দিকে পারিবারিক তহবিলের সাথে যোগ এবং ঘাটতি পারিবারিক তহবিল থেকে বাদ দিয়ে দেখাতে হবে।
৭। প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাবের প্রারম্ভিক নগদ ও ব্যাংক জমার উদ্বৃত্ত আসবে না। উক্ত উদ্বৃত্তসমূহ পারিবারিক তহবিল নির্ণয়ে ব্যবহৃত হবে।

উদাহরণ ১

জনাব ওসমান গণির ১ জানুয়ারী ২০১২ তারিখে সম্পদ ও দায় দেনার পরিমাণ ছিল- বাড়ি ২০,০০,০০০; আসবাবপত্র ২০,০০০; তৈজসপত্র ১৩,০০০ এবং গৃহ নির্মাণ ঋণ ১৫,০০,০০০ টাকা। উক্ত বছরে তার প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব নিম্নরূপ:

চলো দেখি এবার কেমন শিখলে তোমরা!

 

তাহলে পারিবারিক ও আত্মকর্মসংস্থানমুলক উদ্যোগের হিসাব অধ্যায়টি তোমরা বুঝেই ফেললে, এবার স্মার্টবুকটি তোমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে ফেলো!