জীবের প্রজনন

স্কুলের মাঠে খেলতে গিয়ে অতনু হঠাৎ তার শ্রেণি শিক্ষকের দেখা পায়। গতকালকের ক্লাসে অতনু অনুপস্থিত ছিলো। তাই সে তার শিক্ষককে গতকালকে পড়ানো “জীবের প্রজনন” অধ্যায়টি বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। শিক্ষক তখন অতনুকে বললো, “চলো আমরা হাঁটতে হাঁটতে পড়াটা শিখে নেই।”

প্রতিটি জীব প্রজাতি তার স্বরূপ বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এই প্রজনন জীবের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রজনন না হলে যেহেতু তার বংশধর টিকে থাকবে না তাই ক্ষুদ্র একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে বৃহদাকার জীব সকলেই প্রজনন করে থাকে। চলো একে একে জেনে নেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজনন সম্পর্কে।

উদ্ভিদের প্রজনন

ফুল হলো উদ্ভিদের বংশবিস্তারের জন্য বিশেষভাবে রূপান্তরিত বিটপ বা প্রজনন অঙ্গ। একটি আদর্শ ফুলের পাঁচটি স্তবক রয়েছে যাদের মধ্যে পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবক সরাসরি প্রজননে অংশ নেয়।

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাপ হলো যথাক্রমে পরাগায়ন ও নিষেক। চলো এগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

পরাগায়ন

শিক্ষক অতনুকে বললেন, “এই যে মাঠের পাশের ফুলগাছটি দেখছো এখানে কিন্তু পরাগায়ন হয় এবং এ পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদ তার প্রজননের পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ হয়।” অতনু তখন পরাগায়ন নিয়ে জানার আগ্রহ দেখালে শিক্ষক তাকে বলতে শুরু করলেন-
ফুলের পরাগধানী থেকে পরাগরেণু একই ফুলে অথবা একই জাতের অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়াকে পরাগায়ন বলে। ফুল ও বীজ উৎপাদনের জন্য পরাগায়ন আবশ্যক। পরাগায়ন দুই ধরনের, স্ব-পরাগায়ন এবং পর-পরাগায়ন।

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

পরাগায়নের মাধ্যম

Img5

পরাগায়নের কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মাধ্যমের দ্বারা হয়ে থাকে। যে মাধ্যম পরাগ বহন করে গর্ভমুণ্ড পর্যন্ত নিয়ে যায়, তাকে পরাগায়নের মাধ্যম বলে। বায়ু, পানি, কীট-পতঙ্গ, পাখি, বাদুড়, শামুক এমনকি মানুষ এ ধরনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। মধু খেতে অথবা সুন্দর রঙের আকর্ষণে প্রাণী ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। এ সময়ে ঐ ফুলের পরাগরেণু বাহকের গায়ে লেগে যায়। এই বাহকটি যখন অন্য ফুলে গিয়ে বসে তখন পরাগ পরবর্তী ফুলের গর্ভমুণ্ডে যায়। এভাবে পরাগায়ন ঘটে। জবা, কুমড়া, সরিষা ইত্যাদি পতঙ্গ পরাগী ফুল বড়, হালকা ও মধু-গ্রন্থিযুক্ত এবং পরাগরেণু ও গর্ভমুণ্ড আঠালো ও সুগন্ধযুক্ত হয়। বায়ুপরাগী ফুল হালকা ও মধুগ্রন্থিহীন। এসব ফুলে সুগন্ধ নেই। যেমন- ধান। পানিপরাগী ফুল আকারে ক্ষুদ্র এবং হালকা। সহজে পানিতেও ভাসতে পারে। যেমন- পাতাশেওলা।

পুং ও স্ত্রী গ্যামেটোফাইটের উৎপত্তি

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


উদ্ভিদদেহে নিষেক

পরাগায়নের ফলে পরিণত পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে পতিত হয়। এরপর পরাগনালিকা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে গর্ভদণ্ড ভেদ করে এবং কিছু তরল পদার্থ শোষণ করে স্ফীত হয়ে উঠে। এক সময় এ স্ফীত অগ্রভাগটি ফেটে পুংজনন কোষ দুটি ভ্রূণথলিতে মুক্ত হয়। এর একটি ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে জাইগােট তৈরি করে। অপর পুংজনন কোষটি গৌণ নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয়ে টিপ্লয়েড (3n) সস্য কোষের সৃষ্টি করে। প্রায় একই সময়ে দুটি পুংজনন কোষের একটি ডিম্বাণু এবং অপরটি গৌণ নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয়। এ ঘটনাকে দ্বি-নিষেক বলা হয়।

Image6

নতুন স্পোরোফাইট গঠন

জাইগোট (2n) হলো স্পোরোফাইটের প্রথম কোষ। এর প্রথম বিভাজনে দুটি কোষ সৃষ্টি হয়। একই সাথে সস্যের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। জাইগোটের বিভাজন অনুপ্রস্থে ঘটে। ডিম্বকরন্ধ্রের দিকের কোষকে ভিত্তি কোষ এবং ভ্রূণথলীয় কেন্দ্রের দিকের কোষটিকে এপিক্যাল কোষ বলা হয়। একই সাথে এ কোষ দুটির বিভাজন চলতে থাকে। ধীরে ধীরে এপিক্যাল কোষটি একটি ভ্রূণে পরিণত হয়। একই সাথে ভিত্তি কোষ ভ্রূণধারক গঠন করে। ক্রমশ বীজপত্র, ভ্রূণমূল এবং ভ্রূণকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে গৌণ নিউক্লিয়াসটি সস্যটিস্যু উৎপন্ন করে। সস্যকোষগুলো ট্রিপ্লয়েড অর্থাৎ এর নিউক্লিয়াসে 3n সংখ্যক ক্রোমোজোম থাকে। পরিণত ডিম্বকটি সস্য ও ভ্রূণসহ বীজে পরিণত হয়। এ বীজ অঙ্কুরিত হয়ে একটি পূর্ণ স্পোরোফাইটের সৃষ্টি করে। ডিম্বক থেকে পরবর্তীতে বীজ হয় এবং গর্ভাশয় থেকে ফলের সৃষ্টি হয়।

এবার নিচের কুইজগুলো দিয়ে যাচাই করে নাও


প্রাণীর প্রজনন ও নিষেক

অতনু বললো, “আচ্ছা শিক্ষক, প্রাণিদেহে কীভাবে প্রজনন হয়? ” শিক্ষক তখন বললেন, শোনো তাহলে।
উদ্ভিদের মত প্রাণিজগতের প্রতিটি সদস্য তাদের বংশবৃদ্ধির জন্যে প্রজননে অংশ নেয়। প্রাণিজগতে দুই ধরনের প্রজনন দেখা যায়- অযৌন প্রজনন এবং যৌন প্রজনন। নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীদের মধ্যে সাধারণত অযৌন প্রজনন ঘটে এবং উচ্চশ্রেণির প্রাণীদের ক্ষেত্রে নিষেকের মাধ্যমে যৌন প্রজনন হয়। নির্দিষ্ট প্রজাতির পুরুষ ও স্ত্রী জনন কোষের নিউক্লিয়াসের পরস্পর একীভবনকে নিষেক বলে। যৌন প্রজননক্ষম প্রাণীদের জন্য নিষেক অপরিহার্য। শুক্রাণু যখন সক্রিয়ভাবে ডিম্বানুতে প্রবেশ করে এবং এদের নিউক্লিয়াস দুটি পরস্পর একীভূত হয় তখন এ নিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নিষেক দুই ধরনের হয়- বহিঃনিষেক অন্তঃনিষেক

মানব প্রজননে হরমোনের ভূমিকা

নিষেকের মাধ্যমে যে জাইগোট সৃষ্টি হয় তা ক্রমান্বয়ে বিভাজিত হয়ে মানব ভ্রুণ থেকে পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুতে পরিণত হয়। মানবদেহের বৃদ্ধির জন্যে হরমোন ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখে। হরমোন হল নালিবিহীন বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (Endocrine Gland) থেকে ক্ষরিত এক ধরনের জৈব রাসায়নিক পদার্থ যা মানবদেহের বিভিন্ন বিপাকীয় ও শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি স্বল্পমাত্রায় নিঃসৃত এ পদার্থগুলো দেহের নানাবিধ রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করে। কয়েকটি বিশেষ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হরমোনগুলোর কাজ দেখে নেওয়া যাক।

Horomone


ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


ভ্রুণের বিকাশ

স্বামী ও স্ত্রীর দৈহিক মিলনের মাধ্যমে স্বামীর শুক্রাণু স্ত্রীর ডিম্বাণুতে প্রবেশ করে এবং নিষেক সম্পন্ন হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণু ধীরে ধীরে ডিম্বনালি বেয়ে জরায়ুর দিকে অগ্রসর হয়। এ সময়ে নিষিক্ত ডিম্বাণুর কোষ বিভাজন বা ক্লিভেজ চলতে থাকে। কোষ বিভাজনের শেষ পর্যায়ে ভ্রুণ ডিম্বনালি থেকে জরায়ুতে পৌঁছায়। এ অবস্থায় ভ্রুণকে ব্লাস্টোসিস্ট বলে। ব্লাস্টোসিস্ট এর পরবর্তী পর্যায়গুলো সম্পন্ন হওয়ার জন্য ভ্রুণকে জরায়ুর প্রাচীর সংলগ্ন হতে হয়। জরায়ুর প্রাচীরে ভ্রুণের সংযুক্তিকে ভ্রুণ সংস্থাপন বা গর্ভধারণ বলে। ভ্রুণটি জরায়ুর অন্তর্গাত্রে সংস্থাপনের পর শিশু হিসেবে ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত সময়কালকে গর্ভাবস্থা বলে। সাধারণত 38-40 সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভাবস্থা বিদ্যমান থাকে।

Image3


ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

প্রজনন সংক্রান্ত রোগ- এইডস



এভাবে অতনু তার শ্রেণি শিক্ষক থেকে জীবের প্রজনন বিষয়টি জেনে নিলো। তোমরাও এতক্ষণে জানতে পেরেছো নিশ্চয়ই? স্মার্টবুকটি ভালো লাগলে শেয়ার করে দিও কিন্তু।