জীবের পরিবেশ

টিফিনের ফাঁকে দুই বন্ধু আবির ও সামিন স্কুলের পাশের পুকুরটির ঘাটে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ আবির দেখলো একটি বক পুকুরটি থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে গেলো। তখন সামিন বললো, ” তৃতীয় স্তরের খাদক দ্বিতীয় স্তরের খাদককে খেয়ে ফেললো।” কৌতুহলী হয়ে আবির সামিনের কাছে বিষয়টি বিস্তারিত জানতে চাইলো।

Img1

সামিন তখন তাকে বিস্তারিত জানাতে শুরু করলো। সামিন ওকে জানায় যে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পশুপাখি, গাছপালা এরা বিভিন্ন মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বসবাস করে বসছে। আর এ মিথস্ক্রিয়ায় আন্তঃসম্পর্ক ঘটে, পৃথিবীর এরকম যে কোন অঞ্চলকেই বাস্তুতন্ত্র বলা যেতে পারে। এই বাস্তুতন্ত্রের রয়েছে বেশ কিছু উপাদান যেগুলো মূলত পরিবেশের মধ্যে একটি চমৎকার জীবনধারা পরিচালনা করতে সহায়তা করছে প্রতিনিয়তই। এগুলো সম্পর্কে তোমাকে ধারণা দেই চলো।

বাস্তুতন্ত্রের উপাদান

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


“বাস্তুতন্ত্রের একটা উদাহরণ বলি তোমাকে। এই যে পুকুরটি দেখছো আমাদের সামনের, এটি কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের বেশ ভালো একটি উদাহরণ।” আবির তখন সামিনকে বুঝিয়ে বলতে বললো। জলভাগের বাস্তুতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে পুকুরের বাস্তুতন্ত্র। জড় বা জীব উপাদান সবগুলোই দেখা যায় এই বাস্তুতন্ত্রে। নিচের ছবিটির মাধ্যমে বুঝিয়ে বলি তাহলে।

পুকুরের বাস্তুতন্ত্র

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


বাস্তুতন্ত্রের আরো অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। যেগুলো জানলে তুমি জীবের পরিবেশ সম্পর্কে আরো ধারণা পাবে। যেমন ধরো খাদ্যশিকল, খাদ্যজাল ইত্যাদি।

খাদ্যশিকল বা খাদ্যশৃঙ্খল (Food Chain)

উৎপাদক থেকে বিভিন্ন জীবস্তরের মধ্য দিয়ে খাদ্যশক্তির প্রবাহকে খাদ্য শিকল বা খাদ্যশৃঙ্খল বলে । একটা উদাহরণের সাহায্য বিষয়টি বোঝা যাক।

পুকুর বা বিলের প্রধান উৎপাদক হলো ফাইটোপ্ল্যাংকটন। এই ফাইটোপ্ল্যাংকটনকে জুপ্ল্যাংকটন সরাসরি খেয়ে নেয়। জুপ্ল্যাংকটনকে আবার ছোট মাছ যেমন- মলা, খলিশা ইত্যাদি খেয়ে ফেলে। আবার সর্বোচ্চ খাদক গজার, বোয়াল, চিতল এই ছোটমাছকে খেয়ে ফেলে৷

এভাবে যে খাদ্যশিকলটি তৈরি হয় সেটি অনেকটা এরকম:

ফাইটোপ্লাংকটন ⇾ জুয়োপ্লাংকটন ⇾ ছোট মাছ (মলা, তিতাপুটি)⇾ শোল বোয়াল

কয়েক ধরনের খাদ্যশিকল

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

খাদ্যজাল (Food Web)

প্রকৃতিতে যে কোন বাস্তুতন্ত্রে একাধিক খাদ্যশৃঙ্খল পরস্পর যুক্ত থাকে, যাকে খাদ্যজাল বলে। নিচের উদাহরণের সাহায্যে খাদ্যজাল সম্পর্কে জেনে নেই।

Food Web

উপরের চিত্রে দেখা যায় উৎপাদক শৈবাল জুপ্ল্যাংকটন এবং ছোট মাছকে সরাসরি খাদ্য সরবরাহ করে। জুপ্ল্যাংকটন কে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে ছোট এবং বড় মাছ উভয়ই। বড় মাছ আবার ছোট মাছকে খায়। বাজপাখি ছোট মাছ এবং বড় মাছের একই প্রজাতির একটু ছোট সদস্যদের সহজে খেতে পারে। এখানে বিভিন্ন ভাবে বেশ কয়েকটি খাদ্যশিকল তৈরি হয়। উপরের খাদ্যজালে পাঁচটি খাদ্যশিকল হলো:

১) শৈবাল‌⇾ ছোট মাছ⇾ বাজপাখি

২) শৈবাল⇾ জুপ্ল্যাংকটন⇾ বড় মাছ⇾ বাজপাখি

৩) শৈবাল⇾ ছোট মাছ⇾ বড় মাছ⇾ বাজপাখি

৪) শৈবাল⇾ জুপ্ল্যাংকটন⇾ ছোট মাছ⇾ বড় মাছ⇾ বাজপাখি

৫) শৈবাল⇾ জুপ্ল্যাংকটন⇾ ছোট মাছ⇾ বাজপাখি


ট্রফিক লেভেলের মধ্যে শক্তির সম্পর্ক

খাদ্যশিকলের প্রতিটি স্তরকে ট্রফিক লেভেল বলে। উৎপাদক থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের খাদকদের এক একটি ট্রফিক লেভেল বলা যায়। সর্বনিম্ন ট্রফিক লেভেলে সূর্য থেকে যে শক্তি গৃহীত হয়,পরবর্তীতে প্রতিটি ট্রফিক লেভেলে তার কিছু অংশ তাপ হিসেবে বেরিয়ে যায়। সাধারণত যে কোন বাস্তুতন্ত্রে কোন একটি ট্রফিক লেভেল এ যতটুকু শক্তি থাকে তার প্রায় 10% ঠিক উপরের ট্রফিক লেভেল সঞ্চারিত হতে পারে। বাকি 90% তাপ হিসেবে পরিবেশে বিমুক্ত হয় কিংবা আংশিক ভাবে অব্যবহৃত থেকে যায়। প্রতিটি ট্রফিক লেভেলে শক্তির এ ক্রমহ্রাসমান অবস্থাই শক্তির সাথে ট্রফিক লেভেলের সম্পর্ক নিরূপণ করে।

Trophic Level




এবারে চলো তোমাকে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে চমৎকার কিছু তথ্য জানাই।

জীববৈচিত্র্য

জড় ও জীব নিয়ে গঠিত আমাদের বিশাল এ পরিবেশের মধ্যে রয়েছে নানরকম বৈচিত্র্য। প্রজাতিভেদে কিংবা অনেক সময় একই প্রজাতির বিভিন্ন জীবদের মধ্যেও দেখা যায় অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য। এই বৈচিত্র্যগুলোর সম্মেলনেই গড়ে ওঠে জীববৈচিত্র্য।

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের প্রভাব

পরিবেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক জীব যাদের প্রত্যেকটি কোন না কোন ভূমিকা পালন করে পরিবেশকে টিকিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর। কোন একটি বিশেষ প্রজাতির বিলুপ্তি পরিবেশের জন্যে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ দেখলেই বিষয়টি বুঝতে পারবে ভালোভাবে।

১. যুক্তরাষ্ট্রের চেসাপিক উপকূলে অসংখ্য ঝিনুক ছিলো যেগুলো তিন দিনে পুরো এলাকার পানি বিশুদ্ধ করতে পারতো। সময়ের পরিব্যপ্তিতে শতকরা 99 ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ফলে ঐ উপকূলের পানিতে অক্সিজেন পরিমাণ কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঝিনুকের পানি বিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি নিচের ছবিটি থেকে দেখে নিতে পারো।

Poribesh1

২. ফসলি জমিতে নানারকম কীটপতঙ্গ থাকে। ব্যাঙ সেগুলোকে খেয়ে ফসলকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।

৩. একজোড়া ইঁদুর বিনা বাঁধায় বংশবিস্তার করলে বছর শেষে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮০টি তে। পেঁচা, ঈগল, চিল এবং বাজপাখি এই ইঁদুর শিকার করে এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৪. শকুন, চিল, কাক প্রকৃতির জঞ্জাল সাফ না করলে জীবাণুতে পৃথিবী সয়লাব হয়ে যেতো।

আর এভাবেই বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীববৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে৷


বিভিন্ন জীবের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া, আন্তঃনির্ভরশীলতা ও পরিবেশের ভারসাম্যতা

পরিবেশে থাকা প্রত্যেকটি জীব পারস্পরিক সহযোগীতা ও নির্ভরশীলতার মাধ্যমে বেড়ে উঠে। সম্পর্কযুক্ত এসকল জীবগুলোকে বলে সহাবস্থানকারী বা Symbionts. এদের মধ্যে যে ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটে তাকে মিথস্ক্রিয়া বলে। সহাবস্হানকারী এ জীবসমূহ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। ওডামের মতে, আন্তঃনির্ভরশীলতা আবার দু’ভাবে হতে পারে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আন্তঃক্রিয়া। নিচের ছবিটির সাহায্যে আন্তঃনির্ভরশীলতার আদ্যোপান্ত জেনে নেই।

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


আমাদের চারপাশের গাছপালা, নদ-নদী, পশুপাখি সবকিছু মিলেই আমাদের পরিবেশ। বাস্তুতন্ত্রের মাধ্যমে পরিবেশের উপাদানগুলো একে অন্যের সহায়তায় টিকে আছে যুগের পর যুগ। মনে রাখতে হবে মানুষ ছাড়া জীববৈচিত্র্য টিকে থাকতে পারবে কিন্তু জীববৈচিত্র্য ছাড়া মানুষ টিকে থাকতে পারবে না। তাই মানুষের উচিত এর জীববৈচিত্র্যের সঠিক দেখাশোনা করার মাধ্যমে খুব সুন্দর একটি আগামী প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাওয়া। আশা করি আমার সাথে তুমিও একমত হবে আবির। আবির বললো, “একদম। কেননা এই পরিবেশ কিংবা জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকলে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদাগুলো অনায়াসে পূরণ হবে।”

স্মার্টবুকটি থেকে যা শিখলে ঝালিয়ে নাও কুইজগুলোর মাধ্যমে


আশা করি আবির ও সামিনের কথোপকথনের মাধ্যমে তোমরা জীবের পরিবেশ সম্পর্কে দারুণ সব ধারণা পেয়েছো। স্মার্টবুকটি ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করে জানিয়ে দিও তোমার বন্ধুকেও।