পদার্থের গঠন

পানি খাওয়ার সময় অসাবধানতাবশত হঠাৎ করে ঝিলিকের হাত থেকে গ্লাস পড়ে যায়। সে খেয়াল করলো গ্লাসটি ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট টুকরো পদার্থের সৃষ্টি হয়েছে। সে তখন ভাবতে লাগলো, আচ্ছা আমাদের চারপাশের সব বস্তুই কি এভাবেই সৃষ্টি হয়? বিষয়টি সে তার শ্রেণি শিক্ষকের কাছে জানতে চায়। তখন শিক্ষক তাকে বলতে শুরু করলেন।

Image1

আমাদের চারপাশে প্রতিটি বস্তুরই রয়েছে নিজস্ব আণবিক গঠন। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণুর সমন্বয়ে যে অণু গঠিত হয় সেগুলো পরবর্তীতে আস্তে আস্তে বিভিন্ন রকম পদার্থ বা যৌগ গঠন করে। আর এসব নিয়েই গড়ে উঠে আমাদের পরিবেশ। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন বস্তুর গঠন উদঘাটন করার চেষ্টা করছে। আর এর মাধ্যমেই আস্তে আস্তে মানুষ পদার্থের গঠনের ক্ষেত্রে নানা তথ্য আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়।

তুমি হয়তো খেয়াল করেছো যখন গ্লাসটি ভেঙে গিয়েছিল তখন এটি অনেকগুলো ছোট ছোট কাঁচের কণায় পরিণত হয়েছে। ঠিক এভাবেই সকল পদার্থই ছোট ছোট কণার সমন্বয়ে গঠিত হয়। সাধারণত এরা যৌগিক অবস্থায় থাকে। যখন ছোট ছোট কণায় পরিণত হয় সেটা হলো এর মৌলিক অবস্থা। এই মৌলকে আরো ছোট ছোট কণায় ভাগ করা যায় বলে একসময় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে ঐ ছোট কণাগুলো হলো ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের সমন্বয়ে গঠিত হয়।

মৌলের প্রতীক ও সংকেত

আমরা পিরিয়ডিক টেবিল এর নাম শুনেছি? না শুনলেও এখন শুনে নেই পিরিয়ডিক টেবিল বা পর্যায় সারণী তে সব মৌলকে তার প্রোটন নাম্বার অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। প্রতিটি মৌলের আলাদা নাম রয়েছে এবং আলাদা বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ দিয়ে তা প্রকাশ করা হয়।

Periodic Table

কোন মৌলের ইংরেজি বা ল্যাটিন নামের সংক্ষিপ্ত রূপকে প্রতীক বলে। প্রত্যেকটি মৌলকে সংক্ষেপে প্রকাশ করতে তাদের আলাদা আলাদা প্রতীক ব্যবহৃত হয়। যেমন- হাইড্রোজেন মৌলটিকে “H” প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয়। আর এই হাইড্রোজেন অণুকে প্রকাশ করতে “H₂” সংকেতটি ব্যবহার করা হয়। নিচের ছকটি থেকে দেখে নাও কয়েকটি মৌলের প্রতীক ও সংকেত।

Table


পরমাণুর ভেতরের কণা

পরমাণু হলো মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যার মধ্যে মৌলের গুনাগুন থাকে। এই পরমাণু তিনটি কণা দিয়ে গঠিত। এগুলো হলো ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন।

Electron

উপরের চিত্রে কতগুলো নীল এবং হলুদ বল একসাথে রয়েছে। এরা আসলে প্রোটন ও নিউট্রন এবং এদেরকে নিয়েই পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। তোমরা অবশ্যই দেখতে পারছো, নিউক্লিয়াসের বাইরে কতগুলো লাইনে আরো কিছু হলুদ বল ঘুরাঘুরি করছে, এর হলো ইলেকট্রন। চলো জেনে নেই এই তিনটি কণিকার সম্পর্কে।

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


“ঝিলিক, তুমি তো এতক্ষণ পরমাণু ও এর কণিকাগুলো সম্পর্কে ধারণা পেয়েছো। চলো এবার আমরা পারমাণবিক সংখ্যা ও ভরসংখ্যা নিয়ে জেনে নেই।”


আমরা খুব সহজেই ভর সংখ্যা এবং পারমাণবিক সংখ্যার সাহায্যে কোন পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা বের করতে পারি। যেমন- Al পরমাণুর কথা ভাবা যাক!

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


এবার নিচের সত্য/ মিথ্যা গুলো যাচাই করে নাও


রাদারফোর্ড পরমাণু মডেল

1911 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষাটির মাধ্যমে পরমাণুর গঠন সম্পর্কিত একটি মডেল প্রদান করেন।

Rutherford

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

বোর পরমাণু মডেল

1913 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী বোর রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে একটি পরমাণু মডেল প্রদান করেন যা বোর পরমাণু মডেল নামে পরিচিত। এই পরমাণু মডেলের মূল প্রস্তাবনা হলো তিনটি। চলো জেনে নেই।

Bore

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


চলো এবারে বোর পরমাণু মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলোও জেনে নেওয়া যাক!


রাদারফোর্ড পরমাণু মডেল বোর পরমাণু মডেল
নিউক্লিয়াসের বাইরে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনের কক্ষপথ নিয়ে রাদারফোর্ড কোন ধারাণা দেন নি। বোর মডেল অনুসারে, নিউক্লিয়াসের বাইরে কতগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথে ইলেকট্রন ঘুরতে থাকে এবং ঐ কক্ষপথ গুলোকে শক্তিস্তর (n) বলে।
এই মডেল অনুসারে,নিউক্লিয়াসের চারিদিকে ইলেকট্রনের ঘূর্ণনের সময় তার শক্তি কমতে থাকে এবং নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে গতিপথ ছোট হয়ে একসময় ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসের সাথে মিশে যাবে। বাস্তবে তা ঘটে না। বোর মডেল অনুসারে, ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের চারিদিকে কতোগুলো নির্দিষ্ট শক্তির বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরবে এবং ঘুরার সময় তা কোনো শক্তি শোষণ ও বিকিরণ করবে না।
রাদারফোর্ড মডেলের সাহায্যে পরমাণুর বর্ণালি ব্যাখ্যা করা যায় না। বোর এর মতবাদ অনুসারে হাইড্রোজেন বর্ণালি ব্যাখ্যা করা যায়।

পরমাণুর শক্তিস্তরে ইলেকট্রন বিন্যাস

বোর পরমাণু মডেল থেকে আশা করি শক্তিস্তর সম্পর্কে ধারনা পেয়ে গিয়েছ। এ মডেলে যে শক্তিস্তরের কথা বলা হয়েছে তাকে প্রধান শক্তিস্তর বলে। শক্তিস্তরকে n দ্বারা প্রকাশ করা হয়। প্রতিটি প্রধান শক্তিস্তরে সাধারণত সর্বোচ্চ ইলেকট্রন ধারন ক্ষমতা হচ্ছে 2n2। ইলেক্ট্রন শক্তিস্তরের এর যেখানে অবস্থান করবে তাকে অরবিটাল বা উপশক্তিস্তর বলে। উপশক্তিস্তরকে l দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এর মান 0 থেকে (n-1) পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপশক্তিস্তরগুলোকে s, p, d, f ইত্যাদি নামে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। উপশক্তিস্তর l এর মান নির্ভর করে n এর মানের উপর। যেমন- n=2 হলে, l = 0 থেকে (2-1) = 0,1 হবে অর্থাৎ অরবিটাল হবে দুটি- 2s, 2p।


প্রতিটি অরবিটালে ইলেকট্রন সংখ্যা হচ্ছে 2(2l+1)। আমরা জানি, প্রতিটি পূর্ণ শক্তিস্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা হচ্ছে 2n2 এবং তোমরা দেখবে সবগুলো অরবিটালের ইলেকট্রনগুলো সংখ্যা যোগ করলে আমরা 2n2 পেয়ে যাবো।

Table1


পরমাণুতে ইলেকট্রন বিন্যাসের নীতি

অরবিটালের মধ্যে কোনটির শক্তি কম আর কোনটির শক্তি বেশি তা অরবিটাল দুটির প্রধান শক্তিস্তর এর মান (n) এবং উপশক্তিস্তরের মানের (l) যোগফল এর উপর নির্ভর করে। যে অরবিটালের (n+l) এর মান কম সে অরবিটালের শক্তি কম এবং সেই অরবিটালে ইলেকট্রন সেখানে আগে প্রবেশ করবে। এ সম্পর্কে একটি নীতি রয়েছে যা আউফবাউ নীতি নামে পরিচিত। নীতিটি হলো- “পরমাণুতে ইলেকট্রন বিভিন্ন অরবিটালে তাদের শক্তির উচ্চক্রম অনুসারে প্রবেশ করে। অর্থাৎ, ইলেকট্রনসমূহ প্রথমে নিম্নশক্তির অরবিটাল পূর্ণ করে পরে ক্রমান্বয়ে উচ্চশক্তির অরবিটালে স্থান গ্রহণ করে ইলেকট্রন বিন্যাস সম্পন্ন করে।”

3d অরবিটালের জন্যে n=3, l = 2 অতএব n+l এর মান 3+2= 5। আবার 4s অরবিটালের জন্য n=4, l= 0 অতএব n+l এর মান 4+0=0। কাজেই 3d অরবিটালের চেয়ে 4s অরবিটাল কম শক্তি সম্পন্ন। তাই ইলেকট্রন প্রথমে 4s অরবিটালে প্রবেশ করবে। যদি দুটি অরবিটালের (n+l) এর মান সমান হয় তাহলে যে অরবিটালটিতে n এর মান কম সেই অরবিটালের শক্তি কম হবে এবং সেখানে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে।

শক্তির ক্রমটি হলো- 1s <2s< 2p< 3s< 3p< 4s< 3d< 4p< 5s< 4d< 5p< 6s<4f< 5d< 6p< 7s< 5f< 6d< 7p< 8s শক্তির এ ক্রমটি মনে রাখার জন্য নিচের ছবিটির সাহায্য নেয়া যায়। Orbital


আমরা আগে দেখেছি যে, উপশক্তিস্তরগুলোতে ইলেক্ট্রনের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা হলো যথাক্রমে- s=2, p= 6, d= 10, f = 14। এই নীতি অনুসারে আমরা পর্যায় সারণীতে অবস্থিত মৌলগুলোর ইলেকট্রন বিন্যাস করতে পারি।
Ne (10)→ 1s² 2s² 2p⁶
Ca (20)→ 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 4s²

আইসোটোপের শতকরা হার থেকে মৌলের গড় আপেক্ষিক ভর নির্ণয়

প্রকৃতিতে যেসব মৌল পাওয়া যায় তাদের আইসোটোপ সমূহের আপেক্ষিক প্রাচুর্য ভিন্ন ধরনের। যেমন- ক্লোরিনের দুটি আইসোটোপের প্রাচুর্য যথাক্রমে 75% 25%। মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপের পারমাণবিক ভর ও শতকরা পরিমাণ থেকে মৌলের গড় পারমাণবিক ভর নির্ধারিত হয়।

ধরা যাক কোনো একটি মৌল A এর দুটি আইসোটোপ আছে। একটি আইসোটোপের ভর সংখ্যা p এবং প্রকৃতিতে প্রাপ্ত শতকরা পরিমাণ m। অপর আইসোটোপের ভর সংখ্যা q প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ঐ আইসোটোপের শতকরা পরিমাণ n হলে,
মৌল A এর আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর, = (p×m+q×n)/100

Img


তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ও তাদের ব্যবহার

যে সকল আইসোটোপ সমূহের নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেঙে আলফা রশ্মি, বিটা রশ্মি, গামা রশ্মি ইত্যাদি নির্গত করে তাদেরকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বলে। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সংখ্যা 3000 থেকে কিছুটা বেশি। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে, কৃষি ক্ষেত্রে ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।


এবার কী শিখলে তা যাচাই করে নাও


এভাবে ঝিলিক তার শিক্ষকের কাছ থেকে পদার্থের গঠন সম্পর্কে জেনে নিল। আশা করি তোমরা ঝিলিকের সাথে বিষয়টি বুঝতে পেরেছ। স্মার্টবুকটি শেয়ার করে জানিয়ে দাও তোমার বন্ধুদেরও!