রাসায়নিক বন্ধন

রসায়ন ক্লাসে শিক্ষক সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন,” বলো তো, পানির রাসায়নিক সংকেত কী? “সবাই তখন একযোগে বলে উঠলো দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে পানি গঠিত হয় যার রাসায়নিক সংকেত হলো- H₂O। শিক্ষক আবার জিজ্ঞেস করলেন,” এবার বলো তো, পানিতে ঠিক কোন বন্ধনটি রয়েছে?” এবারে কেউই সঠিকভাবে বলতে পারলো না। শিক্ষক তখন বললেন,” প্রকৃতিতে যত প্রকারের যৌগ রয়েছে সবগুলোতেই কোনো না কোনো প্রকার রাসায়নিক বন্ধন রয়েছে। আজকের ক্লাসে আমরা জানবো এই রাসায়নিক বন্ধন সম্পর্কে।

যোজ্যতা ইলেকট্রন

রাসায়নিক বন্ধন সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে যোজ্যতা ইলেকট্রন কী! মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসের সর্বশেষ কক্ষপথে বিদ্যমান ইলেকট্রন সংখ্যাকে যোজ্যতা ইলেকট্রন বলে। আমরা জানি কোনো একটি পরমাণুর কক্ষপথগুলোকে K, L, M, N ইত্যাদি নামে বিবেচনা করা হয়। পরমাণুর ইলেক্ট্রন বিন্যাসে এই কক্ষপথগুলোর সর্বশেষ কক্ষপথে যতটি ইলেক্ট্রন তাই তার যোজ্যতা ইলেক্ট্রন।

Oxygen

অক্সিজেনের ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্বশেষ কক্ষপথে (L) ইলেকট্রন হল 6 টি। সুতরাং, এর যোজ্যতা ইলেকট্রন হলো 6।

যোজনী/ যোজ্যতা

যোজনী বা যোজ্যতা রসায়নের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মৌল বা যৌগমূলকের যোজনী জানা না থাকলে মৌল বা যৌগের সংকেত সঠিকভাবে লেখা যায় না। কোনো মৌলের একটি পরমাণু হাইড্রোজেন অথবা তার সমতুল্য অন্য কোন মৌলের যতসংখ্যক পরমাণুর সাথে সংযুক্ত হয় তা দ্বারা ঐ মৌলের যোজনী বিবেচনা করা হয়। যেমন- HCl এ ক্লোরিনের যোজনী 1। কারণ ক্লোরিনের একটি পরমাণুর সাথে হাইড্রোজেনের 1টি পরমাণু যুক্ত হয়েছে। পানিতে (H₂O) অক্সিজেনের যোজনী 2, কারণ একটি অক্সিজেন পরমাণু 2টি হাইড্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে অ্যামোনিয়াতে (NH₃) নাইট্রোজেনের যোজনী 3, মিথেনে (CH₄) এ কার্বনের যোজনী 4। পর্যায় সারণীর নিষ্ক্রিয় শ্রেণির মৌলসমূহ সাধারণত অন্য মৌলের সাথে যুক্ত হয় না, তাই এদের যোজ্যতা শূন্য ধরা হয়। গ্রুপ-1 এর মৌলসমূহের যোজনী সাধারণত 1 ও গ্রুপ-2 এর মৌলগুলোর যোজনী 2 হয়।
যোজনী সম্পর্কে জানার সময় আমাদেরকে এর সাথে সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনশীল যোজনী, সক্রিয় যোজনী সুপ্ত যোজনী সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

অষ্টক ও দুই এর নিয়ম

বন্ধন গঠনের দুটি নিয়ম হলো অষ্টক ও দুই এর নিয়ম। তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এই দুটি নিয়মের কাজ কী! চলো সেটাই এখন জেনে নেই। প্রকৃতিতে বিদ্যমান প্রতিটি মৌল নিকটবর্তী নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে চায়। রাসায়নিক বন্ধন গঠনের মূল কারণও এটিই। হিলিয়ামের সর্বশেষ শক্তিস্তরে 2টি এবং অবশিষ্ট নিষ্ক্রিয় মৌলগুলোর ইলেক্ট্রন বিন্যাসে সর্বশেষ স্তরে 8টি করে ইলেকট্রন বিদ্যমান থাকে। বিভিন্ন মৌলের পরমাণুসমূহ নিজেদের মধ্যে ইলেকট্রন আদান-প্রদান এবং শেয়ারের মাধ্যমে পরমাণুসমূহের শেষ শক্তিস্তরে 2টি অথবা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে 8টি ইলেকট্রনের বিন্যাস লাভ করে। এভাবে He- এর বিন্যাস লাভ করাকে দুই এর নিয়ম এবং যোজ্যতা স্তরে 8টি ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করাকে অষ্টক নিয়ম বলে। যেমন- মিথেন (CH₄) অণুতে কেন্দ্রীয় পরমাণু কার্বনের সর্বশেষ শক্তিস্তরে 8টি ইলেকট্রন বিদ্যমান। যেখানে 4টি ইলেকট্রন কার্বনের বাকি 4টি ইলেকট্রন হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে আসে। এভাবে সর্বশেষ শক্তিস্তরে 8টি ইলেক্ট্রন ধারণ করে মিথেন অষ্টক নিয়ম পালন করেছে।

ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন

এবার সত্য/ মিথ্যা যাচাই করে নাও


আয়নিক বন্ধন

ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে গঠিত ক্যাটায়ন (ধনাত্মক আয়ন) এবং অ্যানায়নসমূহ (ঋণাত্মক আয়ন) যে আকর্ষণ বল দ্বারা যৌগের অণুতে আবদ্ধ থাকে তাকে আয়নিক বন্ধন বলে। যে যৌগে আয়নিক বন্ধন থাকে তাকে আয়নিক যৌগ বলে। NaF, KCl, MgO- এগুলো হলো আয়নিক যৌগের উদাহরণ।

Sodium

আমরা জানি, দুটি ভিন্নধর্মী পরমাণুর মাধ্যমে গঠিত হয় আয়নিক যৌগ যেখানে থাকে ধাতু ও অধাতু। আয়নিক বন্ধন সাধারণত পর্যায় সারণির Group- 1, 2- এর ধাতু এবং Group- 16, 17- এর অধাতুর মধ্যে ঘটে থাকে। পর্যায় সারণির মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত ধাতুসমূহের শেষ শক্তিস্তরে অধিকসংখ্যক ইলেকট্রন থাকার কারণে, ইলেকট্রন দান বা গ্রহণের জন্য অধিক শক্তির প্রয়োজন হয় যার ফলে সাধারণত এরা তিন বা চার সংখ্যক ইলেকট্রন গ্রহণ বা বর্জনে উৎসাহী হয় না। তবে Group- 13 ও 15 এবং মাঝের ডি ব্লক মৌলগুলোয়ও আয়নিক বন্ধন হয়ে থাকে।
উপরের চিত্রে Group- 1 এর সোডিয়াম ধাতু ইলেকট্রন বর্জন করে ক্যাটায়ন এবং Group- 17 এর ফ্লোরিন দানকৃত ইলেকট্রন গ্রহণ করে অ্যানায়নে পরিণত হয়। তারপর ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন কাছাকাছি এসে আয়নিক বন্ধন গঠন করেছে।

সমযোজী বন্ধন

সর্বশেষ শক্তিস্তরে স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের জন্য ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে যে বন্ধন গঠিত হয়, তাকে সমযোজী বন্ধন বলে। সাধারণত দুটি অধাতব পরমাণুর মধ্যে সমযোজী বন্ধন ঘটে থাকে। সমযোজী বন্ধনে গঠিত মৌলিক অণুকে (যেমন- H2) সমযোজী অণু এবং যৌগকে সমযোজী যৌগ (যেমন- CO2, NH₃, CH₄) বলে। তোমাদেরকে যে পানির (H₂O) মধ্যে বিদ্যমান বন্ধন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো; এই পানির মধ্যেও থাকে সমযোজী বন্ধন।

bond

প্রথম চিত্রটির ক্ষেত্রে হিলিয়াম (He) পরমাণুর স্থায়ী দুই-এর বিন্যাস লাভ করার জন্য হাইড্রোজেনের ইলেকট্রন গ্রহণ বা বর্জন সম্ভব নয়। তাই পরমাণুদ্বয় পরস্পর ইলেকট্রন শেয়ার করে হিলিয়ামের স্থায়ী দুই- এর (duplet) বিন্যাস লাভ করেছে।
দ্বিতীয় চিত্রে একটি কার্বন পরমাণুর 4টি ইলেকট্রন ও দুটি অক্সিজেন পরমানু উভয়েই 2টি করে ইলেকট্রন শেয়ার করার মাধ্যমে CO2 সমযোজী যৌগ গঠন করেছে। এরা প্রত্যকেই ইলেকট্রন শেয়ারের ফলে নিয়নের যোজ্যতা স্তরের স্থায়ী অষ্টক (octet) বিন্যাস লাভ করেছে এবং এই অষ্টক লাভের মধ্যে দিয়ে সমযোজী যৌগ গঠিত হয়েছে। সাধারণত দুটি অধাতু মিলে সমযোজী বন্ধন তৈরি করে থাকে।

আয়নিক ও সমযোজী যৌগের পার্থক্য

আয়নিক যৌগ সমযোজী যৌগ
সাধারণ উষ্ণতায় আয়নিক যৌগগুলো কঠিন ও কেলাসাকার। সাধারণ উষ্ণতায় সমযোজী যৌগগুলো তরল ও গ্যাসীয় । কিন্তু কঠিন হলে তার প্রকৃতি হয় মোমের মতো নরম।
এই যৌগের অণু ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নের তড়িৎ আকর্ষণ দিয়ে তৈরি তার ফলে এদের অণুতে প্রকৃত কোনো বন্ধন থাকে না। এরা সাধারণত অধাতব পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন জোড় গঠন করে মৌল অণু বা যৌগিক অণু গঠন করে, তার ফলে এদের মধ্যে প্রকৃত বন্ধন থাকে।
আয়নিক যৌগগুলো গলিত বা দ্রবীভূত অবস্থায় আয়নে পরিণত হয় যার দ্বারা তড়িৎ পরিবহন করে। বিশুদ্ধ সমযোজী যৌগগুলো গলিত বা দ্রবীভূত অবস্থায় আয়নে পরিণত হয় না, যার ফলে তড়িৎ পরিবহন করে না।
আয়নিক যৌগের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক সাধারণত বেশি এবং যৌগগুলো অনুদ্বায়ী। সমযোজী যৌগগুলোর গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক সাধারণত কম এবং উদ্বায়ী প্রকৃতির।
এই যৌগগুলো সাধারণত পানিতে দ্রবণীয় কিন্তু জৈব দ্রাবকে অদ্রবণীয়। বিশুদ্ধ সমযোজী যৌগগুলো অজৈব দ্রাবকে দ্রবণীয় কিন্তু পানিতে অদ্রবণীয়।
আয়নিক যৌগ দ্বারা বন্ধনগুলো দৃঢ় নয় এবং কোনো অভিমুখ নেই। সমযোজী যৌগ দ্বারা গঠিত বন্ধন দৃঢ় প্রকৃতির এবং নির্দিষ্ট অভিমুখ আছে।

ধাতব বন্ধন

ধাতব পরমাণুসমূহ যে আকর্ষণ বল দ্বারা পরস্পরের সাথে আবদ্ধ থাকে তাকে ধাতব বন্ধন বলে।

Bond2

পর্যায় সারণির অন্যান্য মৌলেগুলোর তুলনায় ধাতব মৌলসমূহের ইলেকট্রন নিউক্লিয়াস থেকে দূরে থাকার কারণে নিউক্লিয়াসের সাথে ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল কম থাকে। তাই ধাতব কেলাসে এই পরমাণুগুলো তাদের সর্বশেষ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলো ত্যাগ করে আয়নে পরিণত হয় এবং সমগ্র ধাতবখণ্ডে মুক্তভাবে সঞ্চারণশীল থাকে। তখন কেলাসে বিদ্যমান ইলেকট্রনসমূহ তাদের মধ্যে স্থির বৈদ্যুতিক আকর্ষণে আকর্ষিত হয়। যে কারণে ধাতব আয়নগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না এবং একই কেলাসে অবস্থান করে। মূলত এভাবেই ধাতব বন্ধন গঠিত হয়ে থাকে।


এবার কুইজ দিয়ে ঝালাই করে নাও নিজেকে


আশা করি শিক্ষকের আলোচনায় এতক্ষণে তোমরা রাসায়নিক বন্ধন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পেরেছো। স্মার্টবুকটি ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করে দিও তোমার বন্ধুদের মাঝে।