বস্তুর উপর তাপের প্রভাব

সামনেই অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা। মে মাসের প্রচন্ড গরমে আনিসা আর আফরা বের হয়েছে নীলক্ষেতের উদ্দেশে, পুরনো কিছু পদার্থবিজ্ঞানের বই কিনতে। বাসে বসে দুইজন আলোচনা করা শুরু করলো এই তীব্র গরম নিয়ে। আনিসা বললো, “মে মাসেই তাপমাত্রার অবস্থা এমন হলে সামনের মাসগুলোতে না জানি কী হবে!” আফরা উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ঠিক বলছিস, তাপ বেড়ে অসহনীয় পর্যায় চলে যাবে।” এরপর আনিসা হেসে বললো, “তাপ আর তাপমাত্রা- দুটি ব্যাপার কিন্তু এক না। সামনে তো পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিবো আমরা, চল এই ব্যাপারে আলোচনা করি।”

Phy1

তাপ ও তাপমাত্রা

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


অভ্যন্তরীণ শক্তি

Phy2

অভ্যন্তরীণ শক্তি হলো মূলত বিভবশক্তি আর গতিশক্তির মিশ্রণ। ধরো, দুইটি পাত্রে পানি রাখা হয়েছে। এবং এই দুইটিকে পাত্রের মাঝখানে একটি নল দ্বারা এদের একসাথে করা হয়েছে। এবার ভেবে দেখো, যদি প্রথম পাত্রটির উচ্চতা ১২ মিটার এর দ্বিতীয়টির ৫ মিটার হয় তাহলে এদের মাঝে থাকা নল খুলে দিলে কী হবে?

নল খুলে দিলে প্রথম পাত্র বা যেই পাত্রের উচ্চতা বেশি, সেখান থেকে পানি গড়িয়ে কম উচ্চতার দ্বিতীয় পাত্রের দিকে প্রবাহিত হবে। এবং এমনটা ঘটতে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না দুই পাত্রের ই পানির উচ্চতা সমান না হয়ে যায়।

আবার ধরো, এখানে আমরা পানির পরিমাণকে তাপশক্তির সাথে আর পানির পৃষ্ঠদেশের উচ্চতার সাথে তুলনা করতে পারি। যতক্ষণ তাপমাত্রা সমান না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাপের প্রবাহ চলতে থাকে। এক্ষেত্রে বস্তুতে উপস্থিত তাপের পরিমাণ কোন প্রভাব ফেলে না।

এই পুরো ব্যাপারটি হলো তাপের সঞ্চালন আর অভ্যন্তরীণ শক্তির সাথে সম্পর্কিত।

পদার্থের তাপমাত্রিক ধর্ম

বাসে বসে বসে এই পর্যায়ে দুই বান্ধবীর গল্প বেশ জমেই উঠেছে। তারা দুইজন এই অসহ্য গরম আর ট্রাফিক জ্যামের কথা যেন এখন একেবারেই ভাবছে না। সম্পূর্ণ ভাবে পদার্থবিজ্ঞানের আলোচনার প্রতিই দুইজনের মনোনিবেশ।

এমন সময় তারা আলোচনা করছিল এই বিষয়ে যে পদার্থের কি শুধু অবস্থারই পরিবর্তন হয়? নাকি তাপমাত্রার পরিবর্তন হলে পদার্থের ধর্মের ও পরিবর্তন হয়? উত্তর হলো- হ্যাঁ, পদার্থের ধর্মের পরিবর্তন হয়। পদার্থের তাপমাত্রিক ধর্মের ক্ষেত্রেও একি হচ্ছে ব্যাপারটি।

যেমন একটু আগেই জ্বর নিয়ে একটা উদাহরণ জেনেছো তোমরা। থার্মোমিটারে পদার্থের তাপমাত্রিক ধর্ম ব্যবহার করে আমরা তাপমাত্রা মাপতে পারি। এইখানে পারদ হচ্ছে তাপমাত্রিক পদার্থ আর পারদের প্রসারণ হচ্ছে তাপমাত্রিক ধর্ম। পদার্থের তাপমাত্রিক ধর্মের ব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে থার্মোকাপল। এক্ষেত্রে দুইটি ভিন্ন ধাতু ব্যবহার করে খুব সহজেই -200°C থেকে 1000°C পর্যন্ত তাপমাত্রা মাপা যায় বলে শিল্প কারখানায় থার্মোকাপলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

তাপমাত্রা পরিমাপ

(>) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


উপরে যেই পরিমাপের স্কেলগুলো সম্পর্কে তোমরা জানলে, এই স্কেলগুলোর মাঝে কিন্তু আবার পারস্পারিক সম্পর্ক রয়েছে। আনিসা আর আফরা সেগুলো নিয়েই আবারো আলোচনা করছিল।

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত


এবার নিচের সত্য/ মিথ্যাগুলো যাচাই করে নাও


অনেক ট্রাফিক জ্যাম পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা দুই বান্ধুবী নীলক্ষেতে পৌঁছালো। তারা নানান দোকান ঘুরে প্রয়োজনীয় বই পত্র কিনে আবার নিজ নিজ বাসায় ফিরে গেল।

পদার্থের তাপীয় প্রসারণ

এবার, বাসায় ফিরে আনিসা তার নতুন কেনা পদার্থবিজ্ঞান বই থেকে পদার্থের তাপীয় প্রসারণ সম্পর্কে পড়া শুরু করেছে। তোমরা তো আগেই জেনেছিলে পদার্থের তিনটি অবস্থা সম্পর্কে। তাপীয় প্রসারণ এই তিনটি অবস্থারই ঘটে থাকে কিন্তু।

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

ধরো, কোনো বস্তুর আদি তাপমাত্রা, আদি দৈর্ঘ্য এবং আদি আয়তন যথাক্রমে T1, L1, V1 এবং তাপ প্রয়োগে প্রসারণের ফলে নতুন তাপমাত্রা, দৈর্ঘ্য এবং আয়তন হলো T2, L2, V2 ।

তাহলে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন প্রসারণ সহগ হবে-

(>) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


এবার এই সহগগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জেনে নেয়া যাক:

ড্রপডাউনগুলোতে ক্লিক করে দেখে নাও বিস্তারিত

বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এসকল প্রসারণ সহগের ব্যবহার দেখতে পাই। যেমন: রেললাইনের পাত বসানোর সময় মাঝে ফাঁকা রাখার ঘটনাটি যা তোমরা উপরে জেনেছো।

তরল পদার্থের প্রসারণ

তোমরা এবারে ভেবে দেখো। তরল পদার্থের প্রসারণের ব্যাপারটি কী সাধারণ ভাবেই ঘটছে? নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো ব্যাপারও থাকে?
তরল পদার্থের প্রসারণ কঠিন পদার্থের প্রসারণের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। যেহেতু তরল পদার্থের নিজস্ব কোন আকার নেই, শুধু আয়তন আছে, তাই তরল পদার্থের প্রসারণ বলতে কেবলমাত্র তরলের আয়তন প্রসারণকেই বোঝায়।

তরল পদার্থের প্রসারণের বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে থার্মোমিটার। থার্মোমিটারে দেহের তাপে পারদ প্রসারিত হয়, যা থেকে আমরা দেহের তাপমাত্রা মাপতে পারি।
তরল পদার্থের প্রসারণের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা লাগবে, আমরা যেই প্রসারণ দেখছি, সেটা আদতে আপাত প্রসারণ। এর কারণ, যেহেতু তরল পদার্থকে কোন পাত্রে রাখা লাগে, কাজেই উত্তপ্ত করা হলে তরলের পাশাপাশি, পাত্রেরও প্রসারণও ঘটে। কিন্তু তরল পদার্থের প্রসারণ সহগ, কঠিন পদার্থের প্রসারণ সহগ অপেক্ষা বেশি বলে, আপাত প্রসারণ চোখে পরে। যদি কঠিন পদার্থের প্রসারণ সহগ, তরলের প্রসারণ সহগ অপেক্ষা বেশি হত, তাহলে, তরলের প্রসারণ হওয়া সত্ত্বেও আপাত সংকোচন দেখা যেত। কাজেই তরলের প্রসারণ পরিমাপের জন্য আমাদের আপাত প্রসারণের পাশাপাশি পাত্রের প্রসারণের কথাও মাথায় রেখে হিসাব করা লাগে।

প্রকৃত ও আপাত প্রসারণ

এই পর্যায়ে আনিসা চিন্তা করছে, প্রকৃত প্রসারণ এবং আপাত প্রসারণের মূল পার্থক্যটি কী? এর পার্থক্যটি নির্ণয় কীভাবে করা যায়?

bottle

তরল পদার্থকে উত্তপ্ত করা হলে তরলের সাথে পাত্রেরও প্রসারণ হয়। এজন্য এক্ষেত্রে তরলের প্রসারণ একটু অন্যভাবে বের করে নিতে হয়।
একটু আগেই আমরা জানলাম, এখন পাত্রের প্রসারণ বিবেচনায় না রেখে তরলের প্রসারণ হিসাব করলে, তাকে আমরা বলবো আপাত প্রসারণ। আর পাত্রের প্রসারণ বিবেচনায় রেখে তরলের প্রসারণ পরিমাপ করলে আমরা তরলের প্রকৃত প্রসারণ পাবো।

একটি পাত্রে যদি A দাগ পর্যন্ত তরল নিয়ে উত্তপ্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে, প্রথমে তরল B বিন্দুতে নেমে এসে কিছুক্ষণ পর C বিন্দুতে পৌঁছায়। তরলের আপাত প্রসারণ, পাত্রের প্রসারণের জন্য এই ঘটনা ঘটে। তরলের প্রকৃত প্রসারণ VL হবে পাত্রের প্রসারণ VB এবং তরলের আপাত প্রসারণ Vɑ এর যোগফলের সমান। অর্থাৎ,
Vₗ = Vɑ + VB
অথবা
Vɑ = Vₗ – VB

গ্যাসের প্রসারণ সম্পর্কে জানতে চলে যাও পরবর্তী পৃষ্ঠায়