চল বিদ্যুৎ

ইলেকট্রিসিটি বা চলবিদ্যুৎ ছাড়া আজকাল এক মুহূর্তও আমাদের জীবন ঠিকভাবে চলতে পারে না। আমাদের চারপাশের সব ধরনের যন্ত্রপাতি বা সাজ সরঞ্জাম চালানাের জন্য আমাদের ইলেকট্রিসিটির দরকার হয়। আগের অধ্যায়ে আমরা যে স্থির বিদ্যুতের কথা বলেছি সেই স্থির বিদ্যুৎ বা চার্জগুলাে যখন কোনাে পরিবাহকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় আমরা সেটাকেই চলবিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিসিটি বলি। এই অধ্যায়ে এই চলবিদ্যুৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়ােজনীয় রাশিগুলাে বর্ণনা করব এবং যে নিয়মে চলবিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় সেগুলাে জেনে নেব। এই নিয়মগুলাে ব্যবহার করে কীভাবে একটা সার্কিটে বিদ্যুৎ প্রবাহ বা পটেনশিয়াল পরিমাপ করা যায় সেটিও এই অধ্যায়ে আলােচনা করা হবে।

চলো বন্ধুরা, তাহলে শুরু করা যাক! অধ্যায়ের শুরুতে আমরা নিচের ভিডিও দুটি দেখে আসি।



পরিবাহী, অপরিবাহী এবং অর্ধপরিবাহী পদার্থ


বিভব পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের ভিডিওগুলো দেখে নাও।


রোধ

রােধ হচ্ছে বিদ্যুৎ প্রবাহের বাধা, তাই কোনাে পদার্থের দৈর্ঘ্য (L) যত বেশি হবে তার বাধা তত বেশি হবে অর্থাৎ রােধও বেশি হবে।

R ∝ L

আবার সরু একটা পথ দিয়ে যত সহজে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারবে, চওড়া একটা পথ দিয়ে তার থেকে অনেক সহজে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারবে অর্থাৎ প্রস্থচ্ছেদ (A) যত বেশি হবে রােধ তত কম হবে।

R ∝ 1/A

এই দুটি বিষয়কে আমরা যদি একসাথে আনুপাতিক না লিখে সমীকরণ হিসেবে লিখতে চাই তাহলে একটা ধুবক ρ ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ রােধ

R = ρ(L/A)

যেখানে ধ্রুবক ρ হচ্ছে

ρ = R(A/L)

একটা নির্দিষ্ট পদার্থের জন্য ρ হচ্ছে আপেক্ষিক রােধ এবং তাই এর একক হচ্ছে Ωm. কোনাে পদার্থ কতটুকু বিদ্যুৎ পরিবাহী সেটা বোঝানোর জন্য পরিবাহকত্ব বলে একটা রাশি σ তৈরি করা হয়েছে, যে পদার্থ যত বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহী তার পরিবাহকত্ব তত বেশি, যেটা আপেক্ষিক রােধ ρ এর ঠিক বিপরীত। σ = 1/ρ পরিবাহকত্ব σ এর একক হচ্ছে (Ωm)-1


তূল্য রোধ: শ্রেণি বর্তনী


এবারে কোনো বর্তনীতে একাধিক রোধ থাকলে সেগুলোকে কিভাবে একটি তুল্য রোধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় আমরা সেই বিষয়টি দেখে নেই। চিত্রের সার্কিটে দুটো রোধ লাগানো আছে, যেহেতু C ভূমিসংলগ্ন তাই তার বিভব শূন্য এবং A এর বিভব V। আমরা B এর বিভব কত জানি না, কিছু এটুকু জানি যে R1 এবং R2 দুটোর ভেতর দিয়েই সমনি। পরিমাণ বিদ্যুৎ I প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা এমনিতেই বলে দিতে পারি যে দুটো রােধের যােগফলটি হবে মােট রোধ R এবং বিদ্যুৎ প্রবাহ হবে I = V/R কিন্তু সেভাবে না লিখে আমরা বরং এটা প্রমাণ করে ফেলি।

যদি ধরে নিই B এর বিভব VB তাহলে প্রথম রােধ R1, এর জন্য লিখতে পারি:

I = (V – VB)/R1

আবার দ্বিতীয় রোধ R2 এর জন্য লিখতে পারি

I = (VB – 0)/R2 = VB/R2

কাজেই,

I = (V – VB)/R1 = VB/R2

(V – VB)R2 = VBR1

VB(R1 + R2) = VR2

VB = (R2/(R1 + R2)) V

কাজেই, I = VB/R2 = V/(R1 +R2)

আমরা R1 এবং R2 এই দুটি রোধকে একটি রোধ R = R1 +R2 হিসেবে কল্পনা করতে পারি:

I = V/R

যদি এখানে দুটি না হয়ে তিন-চারটি বা আরাে বেশি রােধ থাকত তাহলেও আমরা দেখাতে পারতাম যে সেগুলােকে সম্মিলিতভাবে একটি রােধ R কল্পনা করতে পারি যেটি সবগুলাে রােধের যােগফলের সমান। এটাকে তুল্য রােধ বলে। অর্থাৎ যখন কোনাে সার্কিটে R1, R2, R3.. এ রকম অনেকগুলাে রােধ পরপর থাকে (শ্রেণি বর্তনী) তখন তাদের তুল্য রােধ

R = R1 + R2 + R3 … Rn

চলো শেষবারের মত নিজেকে ঝালাই করে নেই!


তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power)

আমরা যখন বিভব বা পটেনশিয়াল আলােচনা করছিলাম তখন দেখেছি পটেনশিয়াল প্রয়ােগ করে চার্জকে সরানাে হলে কাজ করা হয় বা শক্তি ক্ষয় হয়। তাই যদি একটা সার্কিটে V বিভব প্রয়ােগ করে Q চার্জকে সরানাে হয় তাহলে কাজের পরিমাণ বা শক্তি প্রয়ােগের পরিমাণ W = VQ Joule
ক্ষমতা P হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে কাজ করার ক্ষমতা, কাজেই যদি t সময়ে Q চার্জ সরানাে হয়ে থাকে তাহলে
P = W/t = VQ/t = VI Watt
যদি একটা রােধ R এর ওপর এটা ব্যবহার করি তাহলে ও’মের সূত্র ব্যবহার করে লিখতে পারি

যেহেতু, V = RI

P = I2R

কিংবা, I = V/R

কাজেই, P = (V/R)2 R = V2/R

একটি রােধের ভেতর যদি t সময় বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয় তাহলে তার ভেতর Pt শক্তি দেওয়া হয়। এই শক্তিটি কোথায় যায়? তােমরা যখন সার্কিটে একটি রােধ ব্যবহার করবে তখন দেখবে তার ভেতর দিয়ে যথেষ্ট বিদ্যুৎ প্রবাহ করলে সব সময়ই সেটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অর্থাৎ শক্তিটুকু তাপশক্তি হিসেবে বের হয়ে আসে। ফিলামেন্ট দেওয়া বাল্বগুলাের প্রচলন ধীরে ধীরে কমে আসছে, কারণ এটা দিয়ে আলাে তৈরি করার জন্য ফিলামেন্টকে উত্তপ্ত করতে হয়, বিদ্যুৎ শক্তির বড় অংশ তাপ হিসেবে খরচ হয়ে যায় বলে এখানে শক্তির অপচয় হয়। এই ধরনের বাগুলাে হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই দেখা যায় এখানে কী পরিমাণ তাপশক্তি তৈরি হয় এবং এই তাপশক্তি তৈরি হয় প্রতি সেকেন্ডে I2R কিংবা V2/R হিসেবে।

বৈদ্যুতিক শক্তি শুধু যে একটি রােধে তাপশক্তি হিসেবে খরচ হয় তা নয়, সেটি ফ্যান, ফ্রিজ, টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার ইত্যাদি নানা ধরনের যন্ত্রপাতিতে নানা ধরনের কাজ করার সময় শক্তি সরবরাহ করে থাকে। কোনাে একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রে প্রতি সেকেন্ডে কী পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি খরচ। হচ্ছে সেটি খুব সহজেই VI থেকে বের করতে পারব। প্রত্যেক বাসায় বিদ্যুৎ মিটার থাকে, সেটি কত পটেনশিয়ালে (V) কত বিদ্যুৎ প্রবাহ (I) করছে সেটি মাপতে থাকে, সেখান থেকে একটি বাসায়। প্রতি সেকেন্ডে কী পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি (P = VI) সরবরাহ করছে সেটি জানতে পারে। এর সাথে মােট সময় গুণ করে ব্যবহৃত মােট বৈদ্যুতিক শক্তি বের করা হয়। বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যয়ের প্রচলিত একক হচ্ছে কিলােওয়াট-ঘণ্টা (kw-h)। এই একককে বাের্ড অব ট্রেড (BOT) ইউনিট বা সংক্ষপে। ইউনিট বলে। আমরা যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোেধ করি তা এই এককেই হিসাব করা হয়।


বিদ্যুতের নিরাপদ ব্যবহার (Safe Use of Electricity)

 

বিদ্যুতের নিরাপদ ব্যবহার করার জন্য নিচের কয়েকটা বিষয় জানা থাকা প্রয়োজন:


বাসাবাড়িতে তড়িৎ বর্তনীর নকশা

একটি বাসায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য একটি সার্কিট কেমন হতে পারে সেটি চিত্রে দেখানাে হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সাপ্লাই ক্যাবল দিয়ে সেটি একটি বাসায় সরবরাহ করা হয়। এর মাঝে একটি লাইভ অন্যটি নিউট্রাল। লাইভ লাইনটির উচ্চ বিভব, নিউট্রালটি শূন্য বিভব। চিত্রে লাইভ লাইনটি লাল রং এবং নিউট্রাল লাইনটি নীল রং দিয়ে দেখানাে হয়েছে। সেটি প্রথমে একটি বৈদ্যুতিক মিটারের ভেতরে দিয়ে যায়, বাসায় কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে সেটি এই মিটারে রেকর্ড করা হয়। মিটারের পর এটি কনজিউমার ইউনিটি দিয়ে বাসার ভেতরে বিতরণ করা হয়।

চিত্রে 5A, 15A এবং 30A এর তিনটি সার্কিট ব্রেকার বা ফিউজ দেখানো হয়েছে৷ এই তিনটি সার্কিট ব্রেকারই মেইন সুইচের সাথে সংযুক্ত। মেইন সুইচটি দিয়ে যেকোনাে সময় পুরাে বাসার বিদ্যুৎ প্রবাহ কেটে দেওয়া সম্ভব। চিত্রটিতে 5A এর সার্কিট ব্রেকার থেকে লাইট এবং ফ্যানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। 15A থেকে বাসায় বৈদ্যুতিক চুলার সাথে সংযুক্ত। 30A সার্কিট ব্রেকারটি দিয়ে বাসার প্ল্যাগ পয়েন্টগুলাে যুক্ত করা হয়েছে। তােমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ এই অংশটুকু একটি রিংয়ের মতাে ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহ সব সময়ই দুটি ভিন্ন পথে হতে পারে। এই অংশটিতে নিরাপত্তার জন্য ভূমির সংযােগ (সবুজ রং) আলাদাভাবে দেখানাে হয়েছে।


ঝটপট নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। 


আশা করছি স্মার্টবুকটি পড়ার পর তোমরা তড়িৎ সম্পর্কে তোমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছো এবং পড়ার পর স্মার্টবুকটি তোমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলো না কিন্তু!