গতি

মনে করো, তোমার স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। তুমি তোমার দুই বন্ধু রাতুল ও সিফাতকে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছো গ্রামের বাড়িতে। তোমরা ঠিক করেছ ট্রেনে যাবে। যথারীতি যাত্রার দিন তোমরা ট্রেনে উঠে বসলে এবং তার কিছুক্ষণ পরই ট্রেন চলতে শুরু করলো। ট্রেনে চুপচাপ বসে থাকতে রাতুলের বিরক্ত লাগায় সে তার প্রিয় বিষয় পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর রাতুল হুট করে সিফাতকে জিজ্ঞেস করে বসলো, “আচ্ছা সিফাত, বলতো আমরা কি এখন গতিশীল নাকি স্থির”, সিফাত উত্তর দিল যে সেটা নির্ভর করছে আমরা কোন প্রসঙ্গ কাঠামো এর সাপেক্ষে বিবেচনা করছি। যদি আমি ট্রেনের অন্য যাত্রী বা তোর  সাপেক্ষে করি তবে সময়ের সাথে আমাদের দূরত্বের পরিবর্তন হচ্ছেনা, অর্থাৎ আমরা এখন স্থিতিতে রয়েছি, আর যদি ট্রেনের বাইরের কারো সাপেক্ষে বিবেচনা করি তবে, সময়ের সাথে আমাদের দূরত্বের পরিবর্তন হচ্ছে, অর্থাৎ আমরা গতিতে রয়েছি।

Speed

উপরের উদ্দীপকটি তোমরা একটু ভালো করে পড়লেই বুঝতে পারবে আসলে কোনো কিছু গতিশীল নাকি স্থির সেটা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের একটি প্রসঙ্গ বিন্দু বা মূলবিন্দু বিবেচনা করে নিতে হবে এবং পরবর্তীতে এই মূল বিন্দুর সাথে সময়ের সাপেক্ষে আমাদের আলোচ্য বস্তুটির অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে কি না সেটার উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারবো যে, সেটি স্থির নাকি গতিশীল।

শুধু কিন্তু গতিশীল বা স্থিতিশীল নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নয়, যে কারো বা কোনো কিছুর অবস্থান নির্ণয় করতে গেলেও আমাদের একটি প্রসঙ্গ বিন্দুর প্রয়োজন হয়। যেমন: আমি যদি এখন প্রশ্ন করি, রাতুল তার বাসার সাপেক্ষে কোন অবস্থানে আছে এবং তার গন্তব্য সাপেক্ষে কোন অবস্থানে আছে এবং দুটো কি এক কিনা।

আমরা বুঝতে পারলাম যে, রাতুলের বাসা ও গন্তব্যের সাপেক্ষে তার দূরত্ব কতটুকু। এখন আরেকটি প্রশ্ন হল যে, আমরা কি তার বাড়ি বা তার গন্তব্য থেকে যে কোন দিকে গেলেই রাতুলের অবস্থানে পৌঁছে যাবো? অবশ্যই না। তাহলে এক্ষেত্রে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট একটি দিকও উল্লেখ করতে হবে। যেমন: এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে বাসা থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে বা রাতুলের গন্তব্য থেকে ৬০ কিঃমিঃ উত্তরে গেলে রাতুলের অবস্থানে যাওয়া যাবে।

বিভিন্ন প্রকার গতি

রাতুল ট্রেনে গতি নিয়ে ভাবছিল। এমন সময় তার মোবাইলে কল আসে এবং সে মোবাইলে কথা শেষ করে যখনি ফোনটি রাখতে যাবে, তখনই ফোনটি তার হাত থেকে সোজা নিচে পড়ে যায়। সে খেয়াল করে যে, ফোনটি সরলরৈখিক গতিতে উপর থেকে নিচে পড়ে যায়। ফোনটি তোলে উপরের দিকে তাকাতেই বৈদ্যুতিক পাখার ঘূর্ণন দেখতে পায়। সে যখন এই দুটি গতি নিয়ে ভাবছিল ঠিক তখনই দেখতে পেল আরেকটি ট্রেন যাচ্ছে। তার নজর পড়লো ট্রেনের ঘূর্ণায়মান চাকার চলন এর উপর।সে খেয়াল করল চাকাটি যেমন একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, তা আবার সামনেও এগিয়ে যাচ্ছে। সে সময় সে দেখলো একটি মেয়ে দোলনায় দোল খাচ্ছে। সে খেয়াল করে দেখলো দোলনাটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর একটি তালে সামনে পিছনে যাচ্ছে, যেন একটি পর্যায় মেনে চললে। তার মনে পড়লো এটিকে পর্যায়বৃত্ত গতি বলে। রাতুল তার বন্ধু সিফাতকে এই গতি গুলোর কথা বলতেই শোয়েব তাকে সরল স্পন্দন গতিনিয়ে বললো।

স্কেলার রাশি ও ভেক্টর রাশি

সিফাত যখন রাতুলকে বিভিন্ন প্রকার গতি নিয়ে বলছিল, তখন তোমার চা খেতে ইচ্ছা হওয়ায় তুমি সবার জন্য চা কিনলে। এবার চা খেতে খেতে রাতুল বলে বসল যে আমাদের চারপাশের সব রাশি কে মান দিয়ে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায় না, বরং মানের পাশাপাশি দিকের প্রয়োজন হয়। যেমন আমরা যে চা খাচ্ছি, তার তাপমাত্রা শুধু মান দিয়েই পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায়। আমরা মেপে মান দিয়েই তাপমাত্রাকে প্রকাশ করতে পারছি। একইভাবে সময় বা ভর এর বেলায়ও শুধু মান দিয়েই পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায়। এ ধরণের রাশিগুলোকে স্কেলার রাশি বলে। কিন্তু কেউ যদি আমাদের বাসার সাপেক্ষে আমাদের কলেজের অবস্থান জানতে চায়, আর আমরা যদি শুধু বলি যে কলেজ 2km দূরে, তবে সে কিন্তু কলেজে যেতে পারবে না। যদিও সে কলেজর দূরত্ব জানে, কিন্তু কলেজ কোনদিকে 2km দূরে তা না জানায় সে যেতে পারবে না। এক্ষেত্রে মানের সাথে সাথে দিকেরও প্রয়োজন হয়। এ ধরণের রাশিগুলোকে ভেক্টর রাশি বলে। বেগ, সরণ, বল ভেক্টর রাশির উদাহরণ। স্কেলার রাশির ক্ষেত্রে এর মান পরিবর্তন করলে স্কেলার রাশির পরিবর্তন হয়। ভেক্টর রাশির ক্ষেত্রে এর মান বা দিক বা যেকোনো একটির পরিবর্তনে এর পরিবর্তন হয়।

আরো জানতে এ ভিডিওটি দেখে ফেলো:

দূরত্ব ও সরণ

স্কেলার ও ভেক্টর রাশি সম্পর্কে আরো বিস্তারিতভাবে বোঝাতে রাতুল খাতায় চিত্র আকে সিফাতকে দেখিয়ে বলল, “মনে করো, A বিন্দুতে তোর বাসা এবং B বিন্দুতে কলেজ। রাস্তা দিয়ে গেলে কলেজে যেতে 4 km দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। সুতরাং আমরা যেকোনো দিকে যে পরিমাণ পথ অতিক্রম করি, তাই দূরত্ব। আর আমাদের যাত্রার শুরুর বিন্দু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সরলরেখা বরাবর পথই সরণ। আর এক্ষেত্রে আবশ্যই দিকের উল্লেখ থাকতে হবে। যেমন এক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যদি আমরা বাসা থেকে কলেজে যাই, তবে আমাদের সরণ হবে বাসা থেকে উত্তর বা দক্ষিণদিকে 2 km।“

দ্রুতি ও বেগ এবং ত্বরণ ও মন্দন

দুরত্ব ও সরণ এর কথা বলা শেষ হতেই এবার শোয়েব প্রশ্ন করে বসল যে একটি গতিশীল বস্তু কত দ্রুত যাচ্ছে তা কীভাবে বোঝা যাবে?
রাতুল জবাব দিল বেগ বা দ্রুতির মাধ্যমে। এ দুটির মুল পার্থক্য জিজ্ঞেস করতেই রাতুল বললো যে, এদের মধ্যে দ্রুতি স্কেলার রাশি ও বেগ ভেক্টর রাশি। মূলত কোনো বস্তুর সময়ের সাপেক্ষে দূরত্ব পরিবর্তনের হারকে দ্রুতি এবং সময়ের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট দিকে সরণ পরিবর্তনের হারকে বেগ বলে। তবে দিক যদি নির্দিষ্ট থাকে, তবে ঐদিকে বেগের মানই দ্রুতি। তাই এক্ষেত্রে বেগ ও দ্রুতির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই ও এক্ষেত্রে কেবল মান দিয়েই আমরা উত্তরটি দিতে পারি। এবার জেনে নাও বেগ বা দ্রুতি বলতে আসলে কী বোঝায়?

কিন্তু যদি রৈখিক না হয়ে অন্য কোনো ক্ষেত্রে হয়, তবে কিন্তু হিসেবটা পাল্টে যাবে। যেমন: যদি আমরা পাথরকে সুতা দিয়ে বেধে একই বেগ বা দ্রুতিতে ঘুরাতে থাকি, তবে সেটিকে সমদ্রুতি বললেও সেটিকে সমবেগে ঘুরছে সেটা বলা যাবে না। কারণ, এক্ষেত্রে পাথর ঘুরানোর ফলে প্রতি মুহূর্তে দিক পরিবর্তিত হচ্ছে। এবার যদি পাথরটি ছেরে দেয়া হয়, তবে সেটি একটি সরলরেখা বরাবর সোজা সমবেগ ও সমদ্রুতিতে ছুটে যাবে।

এসময় ট্রেনটি স্টেশনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর যখন ট্রেনটি চলতে শুরু করে, তখন স্খির অবস্থা থেকে একটি গাড়িও চলতে শুরু করে। সিফাত খেয়াল করে দেখলো গাড়িটি শুরু থেকেই একটি সমবেগে চলছে এবং ট্রেনটির গতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। শুরুতে গাড়িটি এগিয়ে থাকলেও, ট্রেনটি একসময় গাড়িটিকে অতিক্রম করে এবং এরপর সমবেগে চলতে থাকে। এটি দেখে রাতুল বলল যে গাড়িটি প্রথমে ট্রেনের থেকে বেশি বেগে চলায় তা ট্রেনের আগে ছিলো। পরবর্তীতে ত্বরণের জন্য বেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা গাড়িটিকে অতিক্রম করে। এবার চলো ত্বরণ সম্পর্কে আরেকটু জেনে নেই-
ধরো, ট্রেনটি যখন চলতে শুরু করে তার বেগ (আদিবেগ)= u
ট্রেনটি যখন গাড়িটিকে অতিক্রম করে তার বেগ (শেষবেগ)= v
অতিক্রান্ত সময় = t
ত্বরণ, a = (v-u)/t

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


গ্রাফ দুটির প্রথমটিতে সময়ের সাথে বেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি, ফলে ত্বরণ হয়নি। অন্যদিকে দ্বিতীয়টিতে সময়ের সাথে বেগের পরিবর্তন হয়েছে, ফলে ত্বরণ হয়েছে।
এবার ট্রেনটি যখন আরেকটি স্টেশনের কাছে পৌছালো, তখন আবার বেগ কমে ধীরে ধীরে থেমে গেল। এক্ষেত্রেও কিন্তু ত্বরণ হয়েছে, যেহেতু বেগের পরিবর্তন হয়েছে। তবে এটাকে আমরা মন্দন বলে থাকি। এবার তোমরা গ্রাফটি দেখে বলো তো, এর কোন অংশে কোনটি হয়েছে।

(+) চিহ্নিত স্থানে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত

গতির সূত্রাবলি


ত্বরণ থেকে আমরা পেলাম, a = (v-u) / t
এবার, যদি ট্রেনের জন্য আদিবেগ, ত্বরণ ও অতিক্রান্ত সময়ের মান জানা থাকে, তবে তা থেকে আমরা সহজেই শেষবেগ বের করে নিতে পারব.

v = u + at … … … … (1)

আরেকটি বিষয় আমাদের জেনে রাখা উচিত যে একটি গাড়ি যদি সমবেগে না চলে, তবে তার চলার পথে বেগ কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। তাই বেগ বলতে আমরা গড়বেগ কে বুঝিয়ে থাকি-

এবার ধরো, ট্রেনের শেষবেগ, আদিবেগ ও ত্বরণ জেনে গেছো। এবার অতিক্রান্ত দূরত্ব বের করতে চাচ্ছো, তবে কী করবে?

গড়বেগ, V =(u+v)/2

এ সূত্রে v এর মান বসিয়ে পাই,

অতিক্রান্ত দূরত্ব, s = ut + 1/2 at²

আবার অন্যটি যদি হয় যে আদিবেগ, ত্বরণ এবং অতিক্রান্ত দূরত্ব জানা কিন্তু অতিক্রান্ত সময়ের মান জানা নেই, তবে

v = u + at
v² = u² + 2aut + a²t²
v² = u² + 2a(ut + 1/2 at²)
v² = u² + 2as

এ সূত্র ব্যবহার করে সহজেই বের করে নিতে পারব।

যদি সময়ের সাথে ত্বরণ বৃদ্ধি বা হ্রাসের হার সমান থাকে,তাকে সমত্বরণ বলে। সমত্বরণের উদাহরণ খুবই কম। অভিকর্ষজ ত্বরণ সমত্বরণের একটি উদাহরণ।

পড়ন্ত বস্তুর সূত্র

কথা বলতে বলতেই তাদের ট্রেনটি গ্রমে এসে গেল। তারা ট্রেন থেকে নেমে তাদের বাড়ি গেল। এরপর গ্রামে আনন্দেই সময় কাটাতে লাগল। একদিন তারা গাছে ঢিল ছুড়ে আম পাড়ছিল। এসময় সিফাত খেয়াল করে দেখল ঢিলগুলো উপরের দিকে একটি উচ্চতা পর্যন্ত উঠে এরপর একটু যেন স্থির থেকে নিচে নেমে আসছে। মনে কর, এটা দেখে সে তোমাকে প্রশ্ন করল যে গতির যে সূত্রগুলো আমরা জানলাম সেগুলো এই ক্ষেত্রে কাজে লাগবে কি না। এবার তুমি একটু ভেবে উত্তরটি দেয়ার চেষ্টা করতো।

চেষ্টা করে দেখেছো কি? এবার চলো উত্তরটি জেনে নিই-

উত্তরটি হচ্ছে যে বস্তুটি যদি মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তু হয়, তবে কাজে লাগবে। আর এক্ষেত্রে ত্বরণের মান হবে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান।

অভিকর্ষজ ত্বরণ,g হলে, সূত্রগুলোকে লিখা যায়,

v = u + gt
‌‌‌s = ut + 1/2 gt²
v² = u² + 2gs

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তু দেখে তিনটি সূত্র বের করেন। যেগুলো হচ্ছে,


গতি অধ্যায়ের এই স্মার্টবুকটি তোমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলো না!