10 Minute School
Log in

তড়িৎরাসায়নিক কোষ ও তড়িৎ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া(Electro-chemical Cell and Electrolysis)

তড়িৎ এর সাহায্যে রাসায়নিক প্রক্রিয়া (Chemical Process by Electricity)

তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electro-chemical Cell)

যে কোষ তড়িৎ শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে, তাকে তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electro-chemical Cell) বলে। কোষের মধ্যে ধাতব দণ্ড বা গ্রাফাইট দন্ডের তড়িৎদ্বারে ইলেকট্রোড ব্যবহার করা হয়

রাসায়নিক কোষ কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ঃ

১. তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ (Electrolytic Cell):

যে কোষে বাইরের কোন উৎস থেকে তড়িৎ প্রবাহিত করে কোষের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয় সেই কোষকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ বলে।

২. গ্যালভানিক কোষ (Galvanic Cell):

যে কোষে রাসায়নিক পদার্থসমূহ কে বিক্রিয়া করিয়ে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করা হয় সেই কোষকে গ্যালভানিক কোষ বলে।

বিদ্যুৎ পরিবাহী (Conductor):

যে সকল পদার্থ বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে তাদেরকে বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ (Conductor)বলে। যেমনঃ ধাতু, গ্রাফাইট, গলিত লবণ, এসিড ও ক্ষারের দ্রবণ ইত্যাদি

বিদ্যুৎ পরিবাহী বিদ্যুৎ পরিবহনের কৌশলের উপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ পরিবাহী কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথাঃ ১. ইলেকট্রনীয় পরিবাহী এবং 

২. তড়িৎ বিশ্লেষ্য।

ইলেকট্রনীয় পরিবাহী (Electronic Conductor):

যেসব পদার্থের মধ্য দিয়ে ইলেক্ট্রন এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয় সেসব পরিবাহীকে ইলেকট্রনীয় পরিবাহী বলে। গ্রাফাইটের মধ্যে প্রচুর মুক্ত ইলেকট্রন থাকে বা নিঃসঙ্গ ইলেকট্রন থাকে এ সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে ইলেক্ট্রন এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়। সকল পরিবাহীকে ইলেকট্রনীয় পরিবাহী বলে। যেমনঃ লোহা, কপার, নিকেল ইত্যাদি।

তড়িৎ বিশ্লেষ্য (Electrolyte):

যেসব পদার্থ কঠিন অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে না কিন্তু গলিত বা দ্রবীভূত অবস্থায় এবং তার সাথে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায় তাদেরকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ (Electrolyte) বলে। তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ গলিত অবস্থায় আয়নিত থাকে। এই আয়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহন করে আয়নিক যৌগ পোলার সমযোজী যৌগ গলিত অবস্থায় তড়িৎ বিশ্লেষ্য পরিবাহী হয়। যেমন সোডিয়াম ক্লোরাইড(NaCl), কপার সালফেট(CuSO4) পানি(H2O), CH3COOH ইত্যাদি।

তড়িৎ বিশ্লেষ্য দুই প্রকারঃ  

১. তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য (Strong Electrolyte):

যেসকল তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণের গলিত অবস্থায় সম্পূর্ণ আয়নিত থাকে তাদেরকে তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য (Strong Electrolyte)বলে। যেমনঃ  সোডিয়াম ক্লোরাইডNaClকপার সালফেটCuSO4 H2SO4 ইত্যাদি। 

২. মৃদ্যু তড়িৎ বিশ্লেষ্য (Weak Electrolyte):

যেসকল তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণের খুব অল্প পরিমাণে আয়নিত অবস্থায় থাকে তাদেরকে মৃদু তড়িৎ বিশ্লেষ্য বলা হয়(Weak Electrolyte)। যেমনঃ H2O,  CH3COOH  ইত্যাদি।  

তড়িৎদ্বার (Electrode):

তড়িৎ রাসায়নিক কোষে বিগলিত তড়িৎ বিশ্লেষ্যের মধ্যে যে ইলেকট্রনীয় পরিবাহীর ধাতব দন্ড বা গ্রাফাইট প্রবেশ করানো হয় তাদেরকে তড়িৎদ্বার বলে। এই তড়িৎদ্বারে কোন পরমাণু আয়ন ইলেকট্রন ত্যাগ করার ফলে জারণ বিজারণ ঘটে। যে তড়িৎদ্বারে জারণ বিক্রিয়া ঘটে তাকে অ্যানোড তড়িৎদ্বার বলে। এবং যে তড়িৎদ্বারে বিজারণ বিক্রিয়া ঘটে তাকে ক্যাথোড তড়িৎদ্বার বলে।

তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis)

গলিত বা দ্রবীভূত অবস্থায় তড়িৎ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় উক্ত তড়িৎ বিশ্লেষ্য যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয় তাকে তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis)বলা হয়। 

গলিত সোডিয়াম ক্লোরাইডের তড়িৎ বিশ্লেষণের কৌশল (Techniques for Electrolysis of molten Sodium Chloride)

একটি কাচ বা চিনা মাটির পাত্রে গলিত সোডিয়াম ক্লোরাইড নেওয়া হয়। গলিত সোডিয়াম ক্লোরাইড এর মধ্যে সোডিয়াম আয়ন(Na)+ ও ক্লোরাইড আয়ন(Cl) থাকে। গলিত সোডিয়াম ক্লোরাইডের মধ্যে দুটি ধাতব দন্ড বা গ্রাফাইট দন্ড প্রবেশ করানো হয়। এ দন্ড দুটির ১ টিকে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তে এবং অপরটিকে ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করলে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত ধনাত্মক তড়িৎদ্বার বা অ্যানোড ঋণাত্মক আধানযুক্ত Cl আয়ন কে আকর্ষণ করবে অন্যদিকে ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোড ধনাত্মক আধানযুক্ত Na+ আয়ন কে আকর্ষণ করবে। ক্লোরিন আয়ন Cl অ্যানোডে ইলেকট্রন ত্যাগ করে ক্লোরিন গ্যাস এ পরিণত হয়।

অ্যানোডে জারণ বিক্রিয়াঃ

Cl12Cl2+e

অন্যদিকে সোডিয়াম Na+ ক্যাথোড থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ধাতব ও সোডিয়াম এ পরিণত হয়।  

ক্যাথোডে বিজারণ বিক্রিয়াঃ 

Na+e→Na

একটি কাচ বা চিনা মাটির পাত্র নেই। গাঢ় NaCl, Na+Cl, OH,H+ আয়ন বিদ্যমান। 

এবার দুটি গ্রাফাইট দন্ড নেই। একটি ক্যাথোড (-) আরেকটি অ্যানোড (+) এবার দুটিকে তারের মাধ্যমে ব্যাটারির সাথে যুক্ত করি এখন ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ হলে ক্লোরিন ও OH অ্যানোড এর দিকে যাবে কিন্তু ক্লোরিন এর ঘনমাত্রা হাইড্রোক্সাইড থেকে বেশি হওয়ায় এটি আগে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ক্লোরিন গ্যাস উৎপন্ন করবে। আবার H+ ও OHও সোডিয়াম আয়ন দুটি ক্যাথোড এর দিকে যাবে কিন্তু হাইড্রোক্সাইড সক্রিয়তা সিরিজের নিচের দিকে থাকায় আগে ইলেকট্রন গ্রহণ করে হাইড্রোজেন H2 গ্যাস উৎপন্ন করবে।

অ্যানোড এ বিক্রিয়াঃ

2Cl– 2e=Cl2 জারণ বিক্রিয়া

ক্যাথোড এ বিক্রিয়াঃ

2H++2e=H2 বিজারণ বিক্রিয়া

পাত্রে Na+ ও OH থেকে যায় ফলে Na+ ও OH একত্রে করে NaOH ক্ষার উৎপন্ন করে।

Electro-chemical-Cell-electrolysis

Electro-chemical-Cell-electrolysis

বিশুদ্ধ পানি সামান্য পরিমাণে বিদ্যুৎ পরিবহন করে। বিশুদ্ধ পানির বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি করার জন্য এতে অল্প পরিমাণে এসিড যোগ করা হয়। এরপর একটি পাত্রে এসিড মিশ্রিত পানি নিয়ে পাত্রটিকে দুইটি টেস্ট টিউবের মাধ্যমে খাড়া করে রাখা হয়। টেস্টটিউব দুটির মধ্যে প্লাটিনাম এর পাত তড়িৎদ্বার হিসেবে প্রবেশ করানো হয়। অ্যানোডকে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সাথে এবং ক্যাথোডকে ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করে পূর্ণ করা হয়।

এর ফলে পানির বিয়োজন শুরু হয় তড়িৎদ্বার এর অ্যানোড আয়ন ইলেকট্রন ত্যাগ করে জারিত হয় এবং অ্যানোডে অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। অপরদিকে ক্যাথোড থেকে হাইড্রোজেন আয়ন হাইড্রোক্সাইড ইলেকট্রন গ্রহণ করে বিজারিত হয় এবং ক্যাথোডে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। পানির তড়িৎ বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় অ্যানোডে যে পরিমাণ অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। ক্যাথোডে তার থেকে দ্বিগুন পরিমান হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। 

ক্যাথোড এ বিক্রিয়াঃ 

4H++4e→2H2 বিজারণ বিক্রিয়া

অ্যানোড এ বিক্রিয়াঃ 

4OH+O2+2H2O+4e জারণ বিক্রিয়া

যেহেতু একটি পূর্ণ বর্তনী তৈরি না হলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় না এবং বিশুদ্ধ পানি তড়িৎ অপরিবাহীর মত আচরণ করে তাই বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বাড়াতে সালফিউরিক এসিড ব্যবহার করা হয়।

ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন এর চার্জ মুক্ত হওয়ার প্রবণতা (The Tendency of Cation and Anion to be Free of Charge)

তড়িৎ রাসায়নিক সারির যেকোনো দুটি মৌলের মধ্যে যে আয়নটি নিচে অবস্থিত সেটি আগে চার্জমুক্ত হবে যেমনঃ Na+ও H+মধ্যে  H+ সারির নিচে হওয়ায় আগে চার্জ মুক্ত হবে। অ্যানায়ন এর ক্ষেত্রেও একই যেটা নিচে অবস্থিত সেটি আগে চার্জমুক্ত হবে।

ক্যাটায়ন অ্যানায়ন
Li+

K+

Na+

Mg2+

Al3+

Zn3+

Fe2+

Sn2+

Pb2+

H+

Cu2+

Ag2+

Au3+

NO3

SO42-

Cl

Br

I

OH

চিত্রঃ তড়িৎ রাসায়নিক সারণী 

১. দ্রবণে একের অধিক ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন থাকলে চার্জ মুক্ত হওয়ার প্রবণতার চেয়ে ঘনমাত্রার প্রভাব বেশি কার্যকরী। যে আয়নের ঘনমাত্রা বেশি সে আগে চার্জ মুক্ত হবে।

২. কোনটি আগে চার্জ মুক্ত হবে তা অনেক সময় তড়িৎদ্বারের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।

তড়িৎ বিশ্লেষণ এর ব্যবহার (Uses of Electrolysis Process)

১. অনেক  মূল্যবান যৌগ উৎপাদন।

২. আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন।

৩. অবিশুদ্ধ ধাতুকে বিশুদ্ধ ধাতুতে পরিনত করা

৪. ধাতুর ক্ষয় রোধ করতে।

৫. ধাতুর উপর মরিচা পড়া  ঠেকাতে।

৬. এক ধাতুর উপর অন্য কোনো ধাতুর প্রলেপ দিতে।

তড়িৎ বিশ্লেষণ এর প্রয়োগ ( Application of Electrolysis Process)

ধাতু বিশুদ্ধকরণ (Metal Refining)

Electrolysis Process example

আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন এর পর প্রাপ্ত ধাতুতে যথেষ্ট পরিমাণে ভেজাল মিশ্রিত থাকে। এ সকল ধাতু বিশুদ্ধ করতে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি কার্যকর। কপার, জিংক, অ্যালুমিনিয়াম ধাতু বিশুদ্ধ করনের জন্য তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

যে ভেজাল মিশ্রিত ধাতু থেকে অপসারণ করে আমরা বিশুদ্ধ ধাতু তৈরি করতে চাই সেই ভেজাল মিশ্রিত ধাতুকে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করা হয়। যে ধাতুকে বিশুদ্ধ করতে চাই ঐ ধাতুর একটি বিশুদ্ধ দন্ড ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করা হয়।

এরপর তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে ভেজাল মিশ্রিত ও বিশুদ্ধ ধাতুর আয়ন দ্রবণে চলে যায় এবং দ্রবন থেকে ওই ধাতব আয়ন বিশুদ্ধ লেগে যায় ফলে ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত বিশুদ্ধ ধাতব দন্ড মোটা হতে থাকে তড়িৎ বিশ্লেষণ চলাকালে একদিকে ভেজাল মিশ্রিত ও বিশুদ্ধ ধাতুর ক্ষয় হতে থাকে অন্যদিকে বিশুদ্ধ ধাতব দন্ড মোটা হতে থাকে।  

ইলেকট্রোপ্লেটিং (Electroplating)

তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি ধাতুর উপর অন্য একটি ধাতুর প্রলেপ দেওয়া কে ইলেকট্রোপ্লেটিং বলে (Electroplating)ধাতুর উজ্জ্বলতা সৃষ্টির জন্য অথবা ক্ষয় রোধ করতে ইলেকট্রোপ্লেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়

চলো দেখে নেই কিভাবে ইলেকট্রোপ্লেটিং করা হয়। যে ধাতুর উপর প্রলেপ দিতে হবে তার লবণের দ্রবণে ঐ  ধাতুর তৈরি একটি দন্ড নিমজ্জিত করে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সঙ্গে সংযোগ দেয়া হয়।

এবার যেটির উপর প্রলেপ দেয়া হবে সেটিকে ঐ দ্রবণে নিমজ্জিত করে ব্যাটারির ক্যাথোডের(ঋণাত্মক) প্রান্ত যুক্ত করে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করা হয়।

Electroplating

ফলে দ্রবণে উপস্থিত লবণের ক্যাটায়ন ক্যাথোডে আকৃষ্ট হয় অর্থাৎ অ্যানোড থেকে যত পরিমাণ ইলেকট্রন ত্যাগ হচ্ছে ঠিক ততো পরিমাণ ইলেকট্রন ক্যাথোডে জমা হবে। এই ইলেকট্রন আদান প্রদানের মাধ্যমে ইলেকট্রোপ্লেটিং করা হয়। লোহা বা সিলভারের বেল্টের ঘড়ি গুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় অনেক দিন হয়ে গেলেও কিছু কিছু ঘড়ির বেল্টের চকচকে অবস্থা কমে না। অর্থাৎ আগে যা ছিল ঠিক কিছুদিন পর তাই থাকে এর কারণ হলো ঐ বেল্ট এর উপর নিকেল বা ক্রোমিয়ামের হালকা একটি প্রলেপ দেয়া হয়েছিল।