10 Minute School
Log in

মৌলিক বল (Fundamental forces)

মৌলিক বল কি (What is Fundamental forces)

মনে করি টেবিলের ওপর একটি বই আছে। বইটিকে নড়াবার জন্য হাত দিয়ে বইটির ওপর ‘কোনো কিছু’ (something) প্রয়োগ করি। একটি ফুটবল গোলরক্ষকের দিকে ছুটে আসছে। গোলরক্ষক হাত দিয়ে ফুটবলের ওপর ‘কোনো কিছু’ প্রয়োগ করে ফুটবলকে থামিয়ে দিল। বইটিকে গতিশীল বা ফুটবলটি থামাবার জন্য এই যে ‘কোনো কিছু’ প্রয়োগ করা হলো এর নাম বল (Force)।

প্রকৃতিতে আমরা বিভিন্ন ধরনের বলের সঙ্গে পরিচিত হলেও এবং এদের বিভিন্ন নামকরণ থাকলেও সব বল কিন্তু মৌলিক বল( Fundamental Force) নয়। যে সকল বল মূল বা অকৃত্রিম অর্থাৎ অন্য কোনো বল থেকে উৎপন্ন হয় না বরং অন্যান্য বল এ সকল বলের প্রকাশ তাকে মৌলিক বল ( Fundamental Force) বলে।

মৌলিক বলের ধরন (Kinds of Fundamental forces)

মৌলিকতা অনুসারে প্রকৃতিতে চার ধরনের বল আছে। অন্য যে কোনো ধরনের বলকে এই চারটি বলের যে কোনো একটি বা একাধিক বল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। মৌলিক বলগুলো হলোঃ

১। মহাকর্ষ বল (Gravitational force)

২। তড়িৎ-চুম্বকীয় বল (Electromagnetic force)

৩। সবল নিউক্লীয় বল (Strong nuclear force)

৪। দূর্বল নিউক্লীয় বল (Weak nuclear force)

১। মহাকর্ষ বল (Gravitational force): ভরের কারণে মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ বল ক্রিয়াশীল রয়েছে। এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলা হয়। এই বলের পরিমাণ ক্রিয়াশীল বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং বস্তুদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে বস্তুদ্বয়ের মধ্যে এক প্রকার কণার পারস্পরিক বিনিময়ের দ্বারা এই মহাকর্ষ বল ক্রিয়াশীল হয়। এই ধরনের কণার নামকরণ করা হয়েছে গ্রাভিটন (Graviton)।

২। তড়িৎ-চুম্বকীয় বল (Electromagnetic force): দুটি আহিত বা চার্জিত বস্তুর মধ্যে এবং দুটি চুম্বক পদার্থের মধ্যে এক ধরনের বল ক্রিয়াশীল থাকে। এদেরকে যথাক্রমে কুলম্বের তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বল বলা হয়। তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বল আকর্ষণ (attractive) এবং বিকর্ষণ (repulsive) উভয় ধরনের হতে পারে। তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বল পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বস্তুত আপেক্ষিক গতিতে পরিভ্রমণরত দুটি আহিত কণার মধ্যে ক্রিয়াশীল বলই হচ্ছে তড়িৎ- চুম্বকীয় বল। যখন তড়িৎ আধান বা চার্জগুলো গতিশীল হয়, তখন তারা চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। আবার পরিবর্তী (varying) চৌম্বক ক্ষেত্র তড়িৎ ক্ষেত্রের উৎস হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন ফোটন নামক ভরহীন, চার্জহীন কণার পারস্পরিক বিনিময়ের দ্বারা এই বল কার্যকর হয়। স্থিতিস্থাপক বল, আণবিক গঠন, রাসায়নিক বিক্রিয়া ইত্যাদিতে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের প্রকাশ ঘটে।

৩। সবল নিউক্লীয় বল (Strong nuclear force):  একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এদেরকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় নিউক্লিয়ন (nucleon)। পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নিউক্লীয় উপাদানসমূহকে একত্রে আবদ্ধ রাখে যে শক্তিশালী বল তাকে সবল নিউক্লীয় বল বলে।

নিউক্লিয়াসের মধ্যে সমধর্মী ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটনগুলো খুব কাছাকাছি থাকায় এদের মধ্যে কুলম্বের বিকর্ষণ বল প্রবল হওয়া উচিত এবং নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নিউক্লিয়াসই স্থায়ী; কারণ নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান নিউক্লীয় বল নিউক্লিয়াসকে ভাঙ্গতে দেয় না। নিউক্লিয়নের মধ্যে যে মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করে তা এত নগণ্য যে এই বল কুলম্বের বিকর্ষণ বলকে প্রতিমিত (balance) করতে পারে না।

সুতরাং নিউক্লিয়াসে অবশ্যই অন্য এক ধরনের সবল বল কাজ করে যা নিউক্লিয়াসকে ধরে রাখে। এই বলকে বলা হয় সবল নিউক্লীয় বল। বিজ্ঞানীদের ধারণা যে নিউক্লিয়নের মধ্যে মেসন (meson) নামে এক প্রকার কণার পারস্পরিক বিনিময়ের দ্বারা এই বল ক্রিয়াশীল হয়। এই বল আকর্ষণধর্মী এবং নিউক্লিয়াসের বাইরে ক্রিয়াশীল নয়; অর্থাৎ স্বল্প পরিসরে (short range) এই বল ক্রিয়াশীল। এই বল আকর্ষণধর্মী ও চার্জ নিরপেক্ষ।

৪। দুর্বল নিউক্লীয় বল (Weak nuclear force):  যে স্বল্প পাল্লার ও স্বল্প মানের বল নিউক্লিয়াসের মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে ক্রিয়া করে নিউক্লিয়াসে অস্থিতিশীলতার উদ্ভব ঘটায় তাকে দুর্বল নিউক্লীয় বল বলে। প্রকৃতিতে বেশ কিছু মৌলিক পদার্থ (elements) রয়েছে যাদের নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেঙ্গে যায় (যেমন ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম ইত্যাদি)। এই সমস্ত নিউক্লিয়াসকে বলা হয় তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস। তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে তিন ধরনের রশ্মি বা কণা নির্গত হয় যাদেরকে বলা হয় আলফা-রশ্মি (\alpha-rays), বিটা-রশ্মি (\beta-rays) এবং গামা-রশ্মি (\gamma-rays)।

তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে যখন বিটা কণা নির্গত হয় তখন একই সঙ্গে শক্তিও নির্গত হয়। কিন্তু পরীক্ষালব্ধ ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, নিউক্লিয়াস থেকে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা বিটা কণার গতিশক্তির চেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীদের মাঝে প্রশ্ন ওঠে যে \beta-কণা যদি শক্তির সামান্য অংশ বহন করে, তবে অবশিষ্ট শক্তি যায় কোথায়?

1930 সালে ডব্লিউ. পাউলি (W. Pauli) প্রস্তাব করেন যে অবশিষ্ট শক্তি অন্য এক ধরনের কণা বহন করে যা \beta-কণার সঙ্গেই নির্গত হয়। এই কণাকে বলা হয় নিউট্রিনো (neutrino)। এই \beta-কণা এবং নিউট্রিনো কণার নির্গমন চতুর্থ একটি মৌলিক বলের কারণে ঘটে যাকে বলা হয় দুর্বল নিউক্লীয় বল। এই বল সবল নিউক্লীয় বা তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের তুলনায় খুবই দুর্বল। এই বলের কারণে অনেক নিউক্লিয়াসের ভাঙ্গন প্রক্রিয়া সংঘটিত হয় এবং নিউক্লিয়াস হতে \beta  ক্ষয় হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন বোসন নামক এক প্রকার কণার বিনিময়ের দ্বারা এই বল কার্যকর হয়।

মৌলিক বলসমূহের তীব্রতার তুলনা (Comparison of intensities of fundamental forces)

চারটি মৌলিক বলের পরিমাপের আপেক্ষিক সবলতা তুলনা করলে দেখা যায় যে সবচেয়ে শক্তিশালী বল হচ্ছে সবল নিউক্লীয় বল এবং সবচেয়ে দুর্বল বল হলো মহাকর্ষ বল।

সবল এবং দুর্বল উভয় ধরনের নিউক্লীয় বলের ক্রিয়ার পাল্লা (range) খুবই স্বল্প পাল্লাবিশিষ্ট (short range)। এগুলো নিউক্লিয়াসের পৃষ্ঠের বাইরে ক্রিয়াশীল হয় না। পক্ষান্তরে মহাকর্ষ এবং তড়িৎচুম্বকীয় বলের পাল্লা প্রায় অসীম।

চারটি মৌলিক বলের আপেক্ষিক সবলতা সম্বন্ধে ধারণা লাভের জন্য নিচের সারণিটি লক্ষ কর।

মৌলিক বলসমূহের তুলনা( Comparison among the Fundamental Forces)

মহাকর্ষ বল তড়িৎ চৌম্বক বল সবল নিউক্লীয় বল দুর্বল নিউক্লীয় বল
পাল্লা

আপেক্ষিক সবলতা

অসীম

1

অসীম

10^{39}

10^{-15} m

10^{41}

10^{-16} m

10^{30}

 

বলের একীভূতকরণ (Unification of forces)

চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পূর্বে তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বলকে স্বতন্ত্র মৌলিক বল হিসেবে বিবেচনা করা হত। উনিশ শতকের অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বলের মধ্যে একটা সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (J. C. Maxwell) কর্তৃক আবিষ্কৃত তড়িৎ-চুম্বকীয় তত্ত্বের মাধ্যমে এই দুই বলের মধ্যে সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সালাম, ওয়াইনবার্গ এবং গ্লাসো অনেক গবেষণার মাধ্যমে বলের একীভূতকরণ তত্ত্বের অপরিসীম উন্নতি সাধন করেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের মধ্যে মাত্র কয়েক বছর আগে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে অতীতের তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বল একীভূত হয়ে রূপ নিয়েছে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের এবং হালে দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের একীভূত তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে হয়ত একদিন সকল মৌলিক বলের সমন্বয়ে মহা একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব (grand unified field theory) আবিষ্কৃত হবে। তা হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্যের অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কৃত হবে।