10 Minute School
Log in

পদার্থের অবস্থা

পদার্থ (Matter)

যার ভর আয়তন আছে, একটি নির্দিষ্ট স্থান দখল করে এবং চাপ প্রয়োগে বাধাদান করে তাকে পদার্থ বলে। উদাহরণ: বাতাস, পানি, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি। 

বৈশিষ্ট্য

পদার্থ ভর,ওজন, আয়তন, ঘনত্ব, সংসক্তি, স্থিতিস্থাপকতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে। 

  • ভর: ভর বলতে কোনো বস্তু যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত তার পরিমাণকে বোঝায়। ভর এর একক গ্রাম বা কেজি। 
  • ওজন: কোন বস্তুকে পৃথিবী কত বল দ্বারা নিজের দিকে আকর্ষণ করছে তার পরিমাণকে ওজন বলে। ওজন এর একক নিউটন।  
  • আয়তন: কোন বস্তু যে যায়গা জুড়ে অবস্থান করে তাকে সে বস্তুর আয়তন বলে। 
  • ঘনত্ব: কোন বস্তুর একক আয়তনের ভরকে এর ঘনত্ব বলে। 

পদার্থের অবস্থা (States Of Matter)

পদার্থ সাধারণত ৩টি অবস্থায় থাকতে পারে যথা: কঠিন, তরল এবং বায়বীয়

  • কঠিন পদার্থ: কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন ও নির্দিষ্ট আকার এবং দৃঢ়তা আছে। এর অণুসমূহ পরস্পরের অতি সন্নিকটে অবস্থান করে। অর্থাৎ, এদের আন্তঃআণবিক দূরত্ব খুবই কম। এ কারণে এদের মধ্যে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ শক্তি সবচেয়ে বেশি থাকে। যেমন: বালু, পাথর, লবণ ইত্যাদি।
  • তরল পদার্থ: তরল পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন আছে কিন্তু নির্দিষ্ট আকার নেই। এ কারণে এদের যে পাত্রে রাখা হয় তার আকার ধারণ করে । তরল পদার্থের অণুসমূহ পরস্পরের কাছাকাছি থাকে, তবে তাদের মধ্যকার আন্তঃআণবিক আকর্ষণ শক্তি কঠিন পদার্থের মত প্রবল নয়। উদাহরণ: পানি, পেট্রোল, কেরোসিন, ভোজ্য তেল প্রভৃতি।
  • গ্যাসীয় পদার্থ বা বায়বীয় পদার্থ: গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন ও নির্দিষ্ট আকার নেই। গ্যাসীয় পদার্থের অণুসমূহের আন্তঃআণবিক দূরত্ব পদার্থের তিন অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তাই আন্তঃআণবিক আকর্ষণ শক্তি সবচেয়ে কম। ফলে তারা প্রায় সম্পূর্ণ মুক্তভাবে চলাচল করে। উদাহরণ: নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, মিথেন ইত্যাদি।
    • পানি একমাত্র পদার্থ যা প্রকৃতিতে কঠিন (বরফ), তরল (পানি) এবং বায়বীয় (জলীয়বাষ্প) তিন অবস্থাতেই পাওয়া যায়। মেরু অঞ্চলের  বরফ, নদী, সমুদ্রের পানি তরল, বায়ুর জলীয় বাষ্প বায়বীয়। 

প্লাজমা অবস্থা

প্লাজমা পদার্থের অণুসমূহ পরস্পরের কাছাকাছি থাকে, তবে তাদের মধ্যকার আন্তঃআণবিক আকর্ষণ শক্তি কঠিন পদার্থের মত প্রবল নয়। বজ্রপাতের সময় যে বৈদ্যুতিক ঝলক দেখা যায় তা প্লাজমা। প্লাজমা অবস্থায় পদার্থের বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা থাকে। উদাহরণ- বৈদ্যুতিক স্পার্ক, ফ্লুরােসেন্ট বাতি, নিয়ন আলো ইত্যাদি।

মিশ্রণ

দুই বা ততোধিক পদার্থকে যে কোনো অনুপাতে একত্রে মিশালে যদি তারা নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখে পাশাপাশি অবস্থান করে, তবে উক্ত সমাবেশকে মিশ্রণ বলা হয়। 

বায়ু একটি মিশ্র পদার্থ কারণ বায়ুতে উপাদান মৌলসমূহ যেমন: নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, আর্গন, হাইড্রোজেন ইত্যাদি নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখে পাশাপাশি অবস্থান করে।

পদার্থের গঠনের উপর ভিত্তি করে পদার্থকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: মৌলিক পদার্থ ও যৌগিক পদার্থ। 

মৌলিক পদার্থ

যেসব পদার্থকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করলে ওই পদার্থ ছাড়া অন্য কোনো পদার্থ পাওয়া যায় না তাদেরকে মৌলিক পদার্থ বলা হয়। যেমন: হাইড্রোজেন (H₂) অণুকে ভাঙলে শুধু হাইড্রোজেনের দুটি পরামাণু পাওয়া যায়, তাই হাইড্রোজেন (H) একটি মৌলিক পদার্থ। পানির (H₂O) একটি অণুকে ভাঙলে হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণু ও অক্সিজেনের একটি পরমাণু পাওয়া যায়, তাই এটি মৌলিক পদার্থ নয়। 

  • এ পর্যন্ত মোট ১১৮টি মৌল চিহ্নিত হয়েছে যার মধ্যে ৯৮টি প্রকৃতিতে পাওয়া যায়, বাকি ২০টি কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়। 
  • মৌলিক পদার্থ সাধারণত চার ধরনের হয়: 
  1. ধাতু: তাপ ও বিদ্যুৎ সুপরিবাহী মৌলকে ধাতু বলে। সাধারণত ধাতুসমূহ চকচকে ও কঠিন অবস্থায় থাকে। এদেরকে বল প্রয়োগে করে বিভিন্ন আকার দেওয়া যায়। ধাতুসমূহ এক বা একাধিক ইলেকট্রন ত্যাগ করে ধনাত্মক আয়নে পরিণত হতে পারে। উদাহরণ: কপার,  অ্যালুমিনিয়াম, সিলভার, লোহা ইত্যাদি।  
  2. অধাতু: এরা প্রধানত তাপ ও বিদ্যুৎ অপরিবাহী। অধাতুসমূহ এক বা একাধিক ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আয়নে পরিণত হতে পারে। উদাহরণ: ফ্লোরিন, সালফার , অক্সিজেন ইত্যাদি। 
  3. উপধাতু: এরা কখনো ধাতু আবার কখনো কখনো অধাতুর মত আচরণ করে। উদাহরণ: বোরন, সিলিকন, আর্সেনিক, জার্মেনিয়াম, বিসমাথ, অ্যান্টিমনি, পোলোনিয়াম, টেলুরিয়াম ইত্যাদি। 
  4. নিষ্ক্রিয় মৌল: নিষ্ক্রিয় মৌল বলতে পর্যায় সারণির 18 তম শ্রেণীর মৌলগুলোকে বোঝায়। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এরা নিষ্ক্রিয় থাকে বলে এদের নিষ্ক্রিয় মৌল বলে। মোট নিষ্ক্রিয় মৌলের সংখ্যা ৭টি। এগুলো হলো: হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপটন, জেনন, রেডন ও ওগানেসন।

যৌগিক পদার্থ: 

যে সকল পদার্থকে বিশ্লেষণ করলে দুই বা ততােধিক ভিন্ন ধর্ম বিশিষ্ট মৌলিক পদার্থ পাওয়া যায় তাদেরকে যৌগিক পদার্থ বলে। যেমন: পানির (H₂O) একটি অণুকে ভাঙলে হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণু ও অক্সিজেনের একটি পরমাণু পাওয়া যায়। তাই পানি একটি যৌগিক পদার্থ।

উদ্বায়ী পদার্থ

যে সকল পদার্থকে তাপ দিলে সরাসরি বাষ্পে পরিণত হয়, তাদেরকে উদ্বায়ী পদার্থ বলে। উদাহরণ: কপূর, ন্যাপথলিন, আইয়োডিন, নিশাদল ইত্যাদি।

  • গলনাঙ্ক (Melting point): কোনো পদার্থকে কঠিন অবস্থা থেকে তরল অবস্থায় রূপান্তর করতে যে তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, তাকে সে পদার্থের গলনাঙ্ক বলে। উদাহরণ: বরফের গলনাঙ্ক ০° সেন্টিগ্রেড।
  • স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point): যে তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট চাপে কোনো তরল পদার্থ ফুটতে থাকে, তাকে সেই পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক বলে। পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০°সেন্টিগ্রেড।

পদার্থের পরিবর্তন

পদার্থের পরিবর্তন মূলত দুই ধরনের হতে পারে। যথা: ১) ভৌত পরিবর্তন ২) রাসায়নিক পরিবর্তন 

ভৌত পরিবর্তন

যে পরিবর্তনের ফলে শুধু পদার্থের বাহ্যিক আকার বা অবস্থার পরিবর্তন হয় কিন্তু তা কোনো নতুন পদার্থে পরিণত হয় না, তাকে ভৌত পরিবর্তন বলে। উদাহরণ- পানিকে বরফ ও বাষ্পে পরিণত করা, লোহাকে চুম্বকে পরিণত করা, চিনিকে পানিতে দ্রবীভূত করা। 

রাসায়নিক পরিবর্তন

যে পরিবর্তনের ফলে এক বা একাধিক বস্তু প্রত্যেকে তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম বিশিষ্ট এক বা একাধিক নতুন বস্তুতে পরিণত হয়, তাকে রাসায়নিক পরিবর্তন বলে। সাধারণত তাপ,চাপ অথবা পদার্থের সংস্পর্শে এলে পদার্থের এ পরিবর্তন ঘটে।

রাসায়নিক পরিবর্তনে যে নতুন পদার্থ সৃষ্টি হয় তার অণুতে অবস্থিত মৌলগুলো পূর্বের পদার্থ থেকেই আসে। উদাহরণ- পানি এবং অক্সিজেনের সংযোগে লোহায় মরিচা ধরা, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সমন্বয়ে পানি তৈরি হওয়া, দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানো। 

    • সবচেয়ে হালকা মৌল এবং সবচেয়ে হালকা মৌলিক গ্যাস হাইড্রোজেন (H)। 
    • সবচেয়ে ভারী মৌলিক গ্যাস রেডন (Rn)
    • সবচেয়ে ভারী মৌল ইউরেনিয়াম (U)
  • ঘনত্ব: বস্তুর একক আয়তনের ভরকে তার উপাদানের ঘনত্ব বলে। ঘনত্বের একক কিলোগ্রাম/ঘন মিটার (kgm-3) অথবা গ্রাম/ঘন সেন্টিমিটার (g/cc) 
  • চাপ: কোনো পৃষ্ঠের একক ক্ষেত্রফলের উপর লম্বভাবে প্রযুক্ত মোট বলের মানকে চাপ বলে। চাপের একক নিউটন/বর্গমিটার (Nm^{-2}), একে প্যাসকেল বলা হয়।
  • প্লবতা: কোনো বস্তু সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো স্থির তরল বা বায়বীয় পদার্থে নিমজ্জিত করলে তরল বা বায়বীয় পদার্থের চাপের জন্য বস্তুটি উপরের দিকে যে লব্ধি বল অনুভব করে তাকে প্লবতা বা বলে । প্লবতার একক নিউটন।
  • আর্কিমিডিসের নীতি: বস্তুকে কোনো স্থির তরল বা বায়বীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণ ডুবালে বস্তুটি কিছু ওজন হারায়, এই হারানো ওজন বস্তুটি দ্বারা অপসারিত তরল পদার্থের ওজনের সমান। 
  • কোনো বস্তুর ওজন এবং 4°C তাপমাত্রায় সমপরিমাণ পানির ওজনের অনুপাতকে বস্তুর উপাদানের আপেক্ষিক গুরুত্ব বলে।
  • পানির সর্বোচ্চ ঘনত্ব 4°C তাপমাত্রায় হয় কিন্তু পানি বরফে পরিণত হয় 0°C তাপমাত্রায়। 
  • তরল পৃষ্ঠ সর্বদা সংকুচিত হয়ে সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফলে আসতে চায়, তরলের মধ্যে যে বলের প্রভাবে এ ধর্ম প্রকাশ পায় তাকে তলটান বা পৃষ্ঠটান বলে। এর একক নিউটন/মিটার (Nm-1)। তাপমাত্রা বাড়লে তরলের পৃষ্ঠটান হ্রাস পায় এবং তাপমাত্রা কমলে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত পানির ফোঁটা বা বৃষ্টির ফোঁটা গোলাকার হয় পৃষ্ঠটানের জন্য। এছাড়া এর প্রভাবে বালুর উপর দিয়ে হাঁটলে পৃষ্ঠটান বা সারফেস টেনশনের দরুণ বালু নিজ স্থানে চলে আসে এবং পদচিহ্ন মুছে যায়।